প্রেমের কারসাজি

 সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

যে-নিরাময় আর কেউ পারে না, তা প্রেম পারে। যে-যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব কেউ জিততে পারে না তা প্রেমেই সম্ভব। প্রেম হল অপার্থিব অত্যুজ্জ্বল রাসায়নিক।যার প্রয়োগে দেহের, মনের বিস্তৃতি ঘটে, ফলে ফুলে নবজীবন লাভ করে। চিরসবুজ মন হলদে উপত্যকায় গান গেয়ে ফেরে হাজারের পর হাজার বছর। প্রেম আনে বিশ্বাস।
ষোলোআনা জীবনের আঠারো আনাই হোল প্রেমের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস।সেই বিশ্বাসের প্রতি নেমকহারামি কিংবা বিশ্বাসঘাতকতাও বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল হয়ে আলোনা স্বাদে আমৃত্যু ক্ষতবিন্যাস করে। অবশ্য সেই বক্তব্যে পরে আসা যাবে।
প্রেম একথালা নিবেদন।জীবন ঘষে যৌবন থেকে বিধবা কিংবা লেখক কবি ঔপন্যাসিক সব জল্পনা কল্পনার আতিশয্যে অসংগতভাবে স্ফীত খায় হয়ে ওঠে প্রেমের যথার্থ তায়। প্রেম এক মন্ত্র—-যে মন্ত্রে একে অপরকে ঐক্যবদ্ধ রাখে।এক বিশেষ ছন্দে, এক বিশেষ ধারায় জলপ্রপাতের মতো আছড়ে পড়তে থাকে দু’জনার শারীরিক-‘মানসিক কন্ঠস্বর ‌।
যেন প্রবল পরিতৃপ্তির দৈনন্দিন পাগলপারা আলোড়ন। তালাবন্ধ থেকে সময় অসময়ের অবিরাম অস্বস্তিকর পরিবেশেও নিবিড় টলটলে অনুভবের-ধৈর্যের- প্রতীক্ষার সহবাস রচনা করে।
নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, সহনশীলতা এর অঙ্গ। ছাইচাপা আগুন ঠেলে বেরিয়ে আসা লক্ষহীরার দ্যুতি এর মধ্যে। কিংবা বলা যায়, এক অনাবিল স্রোত।যে স্রোতধারার সাথে অজস্র স্রোতধারা মিশে নদীর মতই গভীরতা বাড়ায়। কল্পনার সাথে মিশে সঙ্গম রচনা করে।সংযম, সত্য, একনিষ্ঠ, সৌহার্দ্য, ভক্তি, আতিথেয়তা সবই প্রেম প্রণয় থেকেই উদ্ভূত।
প্রেম আজকের নয়। প্রেম বহু বছরের টাইটানিক সংস্কৃতি।পুরান, কোরান, বাইবেল, জিপিটক পড়লেও প্রেমের উপাখ্যান পাব।প্রেমালাপ, প্রেমানুভুতি, প্রেম-প্রত্যাখ্যাত সবই ছিল, আছে এবং বোধকরি থাকবেও।
কৃষ্ণ রাধিকা, রোমিও জুলিয়েট, ওমর খৈয়াম সেই প্রেমেরই চিরাচরিত উপাখ্যান।—-no great river would reach the ocean without being fed by tributaries.
প্রেম অন্তর্নিহিত অনলের ইন্ধন যেন। পাঁচ মহাদেশের পঞ্চভূতের মাটি ও আগুন মেশা উদ্বিগ্ন অর্থমগ্ন আকাদেমি।
সে পরামর্শ চায়। ভ্রমণে, মননে, বাক্যে, আলাপে লক্ষ্যভেদের জন্য সর্বদা জলের মধ্যে প্রতিবিম্বিত মাছের চোখকে প্রফুল্লচিত্তে টার্গেট করে।কারণ, বর্তমান দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য অতীত দিয়ে সাজানো সমগ্র সত্ত্বার শিরোনামে।
প্রকৃতি প্রেম, বস্তু প্রেম থেকে অধ্যাত্মপ্রেম, সংস্কৃতি প্রেম, যৌনপ্রেম সবই নিরাকার। বাহ্যিক প্রাবল্যে ভরপুর। তবু প্রেম হল অন্নপূর্ণার ভাণ্ডার।বিজ্ঞান বলে প্রেম হৃদয়ানুভুতি নয়; মস্তিষ্কের অতুলনীয় সযত্ন অহংকার; পিটুইটারির খেলা আমরা বোকারা বলি প্রেম
সেই প্রেম একজন কবির মতোই কাব্য রচনা করে। বিশ্বাস- সংস্কার ছুঁয়ে জীবনকে ব্যস্ত রাখে।পরতে পরতে হাড় জিরজিরে হলে তবেই সে সুতোর মতো সরু হয়ে যায়। তবু প্রেম থামে না। এটাই জীবন বিধি। আবার প্রেম প্রত্যাখ্যাত মানুষজন বিশ্বাস ঘাতক, খুনী হয়েও দ্বিধা করে না।
রামায়ণের বনবাসপর্বে রাক্ষসী সুর্পণখা লক্ষনের দ্বারা প্রেম প্রত্যাখ্যাত হয়েই দাদা লাবনীকে দিয়ে প্রতিশোধে মেয়ে ওঠে। অথচ বনবাসপর্বে মহাভারতে লক্ষ্য করেছি রাক্ষুসী হিড়িম্বা মধ্যম পান্ডব ভীমের প্রেমে অনুরক্তা। অর্জুনের প্রতি চিত্রাঙ্গদার প্রেম। প্রেম পঞ্চভূত থেকে জন্মে আবার পঞ্চভূতেই বিলীন হয়। তবু সেই প্রেম যেখানে শেষ— সেখান থেকেই আবার শুরু।
প্রেম গল্প নয়। প্রেম ম্যাজিক- ফ্যান্টাসি বা প্রতীক রূপককে আড়াল করে না। প্রেম অননুকরনীয় ভাষাহীন নিজস্বতায় ভরপুর।বীজ থেকে ধীরে ধীরে পত্র পুষ্পে উন্মোচিত হতে থাকে। প্রেমের মূল আদর্শ হল মানুষের কল্যাণ। কাম-ক্রোধ-লোভ লালসা থেকে নিবৃত্তি ঘটায় প্রেম। আবার সেই প্রেম থেকেই মানুষ সংঘাতে লিপ্ত হয়।
প্রেমে পড়া মানুষ আঙুর ভেবে গলাধঃকরণ করে আগামী দিনে বিন্দাস কাটবে এই বিশ্বাসে রাজসিক থাকে।তবে প্রেম আর প্রেমের ভান এক নয়। প্রেম নিরাকার হলেও সত্যনিষ্ঠ এবং অদ্ভুত অনুভুতি সিঞ্চিত। প্রেমের অভিনয়ে শুধুই জ্যামিতিক সার্কাস। প্রেমে আনন্দ আছে, জ্বালা আছে, যাতনা আছে। ভালোবাসা ভালোবাসা/ ভালোবাসা কারে কয়/ সে কি কেবলই যাতনাময় ?
প্রেমের অধোগতিতে আদালত চত্বর মুখর এখন। বিষয়শপ্রেম, যৌন প্রেম, আরও অনেক প্রেম সর্বনাশা প্রতিক্রিয়ায়  হিংস্র নৃশংস আচরণে লিপ্ত হতেও কুণ্ঠা করেনা। ধর্ষণ, বলাৎকার, শ্লীলতাহানিও প্রেমের উল্টো পিঠ। জীবন-যাপন উপন্যাসের অন্তর্দাহকে জাগিয়ে তোলে। প্রেম অবগুণ্ঠন খুলে নগ্ন হয়ে যায়।
 প্রেম অলৌকিক কিংবা অতিপ্রাকৃতিক কোনটাই নয়। জীবনের সাথে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। রোদ জল বাতাস মেখে মৃদু কন্ঠে ফুলের সাথে ভাব জমায়। বিরাটাকার ক্ষতে প্রেম নীরবে ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদলশোভিনীরূপে ছোট বড় চঞ্চল এক সামাজিক মায়াবদ্ধ মেরুদন্ড হয়ে অন্ধকারেও আলো দেখায়।
       —– তুমি রবে নীরবে
প্রাকৃতিক নিয়মে আমরা সকলেই প্রেম অভিলাষী বা প্রেমবিলাসী-প্রেমবিপাশী নই। সেই প্রেমেরই কারসাজি তে আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত সততই বেঁচে আছি। অথচ, প্রেমের জ্বালায় কিংবা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলেই মানুষ হিঃস্র বা ট্যুর হয়ে ওঠে। তাকে জয় করা বা দমন করাই হল মনুষ্যত্ব।
চন্দ্রনাথ বসুর মতে” শুধু শুদ্ধান্তঃকরণে বিবাহ করিলে বিবাহ সিদ্ধ হয় না, শুধু হৃদয়ের মিলনকে বিবাহ বলে না। বিবাহ সামাজিক সুখদুঃখ নিয়ন্তা; অত এব— সমাজের সম্মতি লইয়া বিবাহ  সম্পন্ন করিতে হয়।” তবে প্রেম ওপ্রণয় সমাজের অনুকূল হোমওয়ার্ক আবশ্যক বলেই মনে হয় আমার—-
সত্যেন্দ্রনাথ পাইন। ৬আষাঢ় ১৪২২.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: