ফিরে দেখা // রণেশ রায়

12312

নয় নয় করেও ধীমান পৌঁছেছে পঁচাত্তরে। পঁচাত্তরের বুড়ো। সময় বয়ে চলেছে জীবনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। জীবনের ঘড়িটার পেন্ডুলাম আনন্দ নিরানন্দ আশা নিরাশা পাওয়া না পাওয়ার দোলায় দুলে চলে। দেওয়ালে টাঙানো সাবেকি ঘড়িটার পেন্ডুলামের মত। ব্যাটারির শক্তি ফুরিয়ে চলেছে। কখন দম বন্ধ হবে ঠিক নেই। শ্লথ হয়েছে চলন তার।

আজ মনটাও দোল খায় এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। তার বার্ধক্য ফিরে পেতে চায় শৈশব। যৌবন তাকে ডাকে। কৈশোরের ইশারা। ধীমান তার মনের এই গতিপথের ভাষা খোঁজে তার লেখা একটা কবিতায়। সে চায় স্মৃতির ডানা মেলে সময়ের উজান বেয়ে বিস্মৃতির আন্ধকার ভেদ করে অতীতকে পেতে:

আজ এই বারবেলায়  

ধূসর এ জীবনের আঙিনায়

কুয়াশাঘন ঘোর  অস্থিরতায়

কোন সে আঁধার আমায়  ঘেরে!

জীবন মৃত্যুর মোহনায়

আলো আঁধারের ধাঁধা,  

বিরস রজনীর  এ খেলায়

অনিশ্চয়তার ধোঁয়াশা,   

একাকিত্ব  আমায় জড়ায়

আমি হারাই আমার চেতনা;

বসন্তের সকালে অন্ধকার ঘনায়

পৌঁছে যাই জীবনের সায়াহ্নে  

অনিবার্যতার  গহ্বরে কোন সে দিগন্তে !  

আমার চেতনা ফিরে আসে

কবিতার মূর্ছনায়,

নব বসন্ত  ডেকে ফেরে

জীবনের মহিমায়,

স্মৃতি জেগে ওঠে

আমার ভাবনার আঙিনায়

কথা বলে অতীত আমার,

শৈশব গুটি  গুটি পায়

মেলে এসে  চেতনায়,

জীবনের  খেয়া ঘাটে

কৈশোর পৌঁছে যায়,

যৌবন বৈঠা হাতে যুদ্ধের তরী বায়,

আমি ছন্দ ফিরে পাই

মিলি এসে মুক্তির মোহনায়

ভৈরোঁর গান গাই   

বসে থাকি নতুনের  অপেক্ষায় ।

আজ ধীমানের  মনটা বিক্ষিপ্ত। গতকাল খুব সামান্য কারনে বলা চলে অকারণে স্ত্রী সুকন্যার সঙ্গে মনোমালিন্য। এটা আজকাল প্রায়ই ঘটে। কেন ঘটে তার ব্যাখ্যা নেই। বোধ হয় ধীমান ভাবে তার স্ত্রীকে তার মনমত সবসময় চলতে হবে। প্রায় দশ বছরের ছোট ছাত্রীসম স্ত্রীর কাছে যেন এটাই তার দাবি। সম্প্রতি এ ব্যাপারে সে আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

মতপার্থক্য হলেই তাই প্রতিক্রিয়াটা তীব্র। ফলে মানিয়ে চলতে অসুবিধে হয়। বাড়িতে কার্যত ওরা এখন দুজন। এই মনোমালিন্যের মুখে একাকিত্বটা আরও জাকিয়ে বসে। মতান্তর নিয়ে সুকন্যার সঙ্গে যুদ্ধ। নিজেকে সংযত রাখতে পারে না। অসংযত আচরণ। আচরণে অসঙ্গতি।

গতকালের কথা। একটা অনুষ্ঠানে যাবে। ট্রামে বাসে অভ্যস্ত জীবন। স্ত্রী সেটাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তার চলন বলন  জীবন যাপন সবই সেই সাবেকি। সাজগোজের বাহার নেই। নিজের জন্য খরচ নেই। এককালে ধীমানের আর্থিক অসুবিধে ছিল। সুকন্যার এই জীবন যাপন তার পক্ষে সহায়ক ছিল।

অল্প খরচে জীবন যাপনে স্ত্রীও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ধীমান ভাবে আজতো আর্থিক অভাব নেই। তাই এই বয়সে আর কৃচ্ছ সাধন কেন? ছেলে মেয়ে ভিন প্রদেশে থাকে। যথেষ্ট স্বচ্ছল। তারাও চায় বাবা মা আরও খরচ করে আরামে বাকি জীবনটা কাটাক। কিন্তু সুকন্যা এই অভ্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে রাজি নয়। অথচ ধীমান নিজেকে বদলে নিয়েছে।

তার শরীরটা এখন চলতে চায় না। তাই কোথাও গেলে ট্যাকসি বা গাড়িকে বাহন করতে চায়। সুকন্যা একে এখনও অপচয় বলে মনে করে। ধীমান বোঝাতে পারে না আজ এটা অপচয় নয়। আজ অর্থ যখন আছে সেটাকে খরচ করে একটু ভালোভাবে জীবন কাটালে তাতে অন্যায় কিছু নেই। বরং এটা না করে স্ত্রী আত্ম উৎপীরণের পথ নিয়েছে। সে স্ত্রীকে বোঝাতে পারে না যে অপ্রয়োজনে নগদ অর্থের মালিক হওয়ার কোন মানে হয় না।

এতে অর্থের প্রতি মোহ বাড়ে যেটা এক ধরণের আত্মোৎপীড়নের পথ প্রশস্ত করে। অথচ স্ত্রীর অর্থের ওপর যে খুব টান তাও নয়। এই নিয়ে দুজনের মতান্তর ঝগড়া। ধীমান বলে এখন যখন অসুবিধে নেই তখন খরচের সুবিধা নিলে দোষের কিছু নেই।

আর অহেতুক টাকা রেখে কি লাভ। এটা নিয়ে গতকাল বিকেলে তাদের মধ্যে বিবাদ। গাড়িতে বা ট্যাকসিতে না যেতে চাওয়ায় স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্য। ধীমানের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া। অথচ স্ত্রীর যে টাকার চাহিদা তাও নয়। অন্য নানাভাবে টাকা যে নষ্ট হয় না তা নয়। এই বিষয়টা ছাড়া দুজনের মধ্যে তেমন বিরোধ হয় না। সুকন্যা সবই মানিয়ে নেয়। এই ছোট্ট একটা বিষয় যা নিয়ে বিবাদ। ধীমান বোঝে এটা স্ত্রীর ঠিক কার্পণ্য নয়।

একটা অভ্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে না চাওয়া। এটার জন্য মনোমালিন্য, তার রেশ পরের দিনও থেকে যাওয়া একটা বড় অদ্ভুদ ব্যাপার। এই সামান্য ব্যাপারে এখনও  ধীমান খর্গ হস্ত। তার এই প্রতিক্রিয়া আজ যেন ধীমানের নিজের আত্মপীড়ণের কারন। ধীমান নিজের ভেতরেই একটা স্ববিরোধিতা দেখে। তাতে কষ্ট পায়।

আজ ধীমানের সস্ত্রীক বেরোবার কথা। কিন্তু গতকালের রেশটা কাটেনি। রাগ করে বসে কেটেছে সকাল আর দুপুরটা। খাওয়া দাওয়াটাও কেমন যেন বিস্বাদ। আবার সেই  একাকিত্বের আক্রমন। সে ঠিক করেছে একাই যাবে। স্ত্রীকে নেবে না। ভয় সুকন্যা সঙ্গে গেলে যদি কালকের বিবাদটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু একা তো সে তেমন কোথাও যায় না।

বিশেষ করে বন্ধুদের সাথে জমায়েতে। সে জামা কাপড় পরে তৈরি হয়। সুকন্যা এমন সময় এসে বলে, ” আমায় নেবে না?” ধীমান যেন এটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। কিন্তু মুখে বলে। যেতে চাও চল। যেন নির্বিকার।

আর ভাবে এত বকা ঝকার পরও স্ত্রীর কোন বিরক্তি নেই। যেন আত্মসন্মানটাও বিসর্জন দিয়েছে। তবে মনে মনে ভালো লাগে। আর এটাই যে ধীমানকে বধ করার মোক্ষম অস্ত্র। সুকন্যাওতো জানে তাকে ছাড়া ধীমানের চলে না। সে ভাবে গত চব্বিশ ঘন্টার অশান্তির আগুনে জল ঢালার সুযোগটা এল।

পেন্ডুলামটা আবার যথারীতি চলতে থাকবে বিপরীতমুখে। চলায় গতি পাবে। জীবনের এটাই যেন ছন্দ। কালকের বিগড়ে যাওয়া মনটাকে ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনার এটাই যে সুযোগ। পেন্ডুলামটা নিরানন্দের প্রান্তে গিয়ে থেমে যাচ্ছিল প্রায়। আবার দম ফিরে পেয়ে সে এ প্রান্তে ফিরে আসার পথ পেল। সেটা ফিরিয়ে এদিকে নিয়ে আসার দায় বোধ করে ধীমান। সে তো জানে জীবনটা পেন্ডুলামের মত দোদুল্যমান।

দুজনে একসঙ্গে বেরোয়। পাড়া থেকে শীততাপনিয়ন্ত্রিত একটা ভলব বাসে সোজা গন্তব্যস্থল। এই নিয়ে কোন বিবাদ নেই। দুজনের মতের মিল । দুজনে এসে পৌঁছয় দক্ষিণ কলকাতার একটা নামি রেস্তোরাঁয়। তাদের পৌঁছতে মিনিট পনেরো দেরি হয়। এই দেরি হওয়া নিয়েও কোন কোন দিন দুজনে বিবাদ হয়। সাধারণত অন্যেরা  অনেকে এরকম আড্ডায় দেরিতে আসে। প্রায়ই আগে পৌঁছে ওদের আপেক্ষা করতে হয়।

তাই ধীমানের স্ত্রী একটু পরে বেরোতে চায়। ধীমান তা হতে দেয় না। সে বলে তিনটে তো তিনটে। সবার মানসিকতা স্ত্রীর মত বলে দেরি হয়। সেটাতে ধীমানের আপত্তি। আজ ধীমানের মন স্থির করে বেরোতে দেরি হয় তাই স্ত্রীকে দোষ দেওয়া যায় না।

সেইজন্য বিবাদ নেই। ধীমান স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রেস্তোরাঁয় ঢুকেই দেখে শাড়ি শাড়ি চেনা আধাঁচেনা মুখ। ষাট বছর পর এদের অনেকের সঙ্গে দেখা। ওদের কয়েকজনের স্ত্রীও সঙ্গে যাদের কোনোদিন দেখেনি। সবাই আলিঙ্গনে। এক অনাবিল আনন্দের স্পর্শে গোটা হলটা উষ্ম হয়ে ওঠে। কারও কারও নামটা মনে পড়লেও চেহারাটা মনে পড়ে না।

আবার কাউকে চেহারায় চিনলেও নামটা মনে নেই। বিজয় প্রস্তুত। এক এক করে আলাপ করিয়ে দেয়। আলাপ করিয়ে দেয় বললে ভুল বলা হয়। মনে করিয়ে দেয়। সেই কলেজের জীবন হোস্টেলের ঘর। রেস্তোরাটা মুহূর্তে হয়ে ওঠে সেই কমন রুম। ধীমানের স্মৃতি ফিরে আসে। সে ফিরে যায় কৈশোর আর যৌবনের সন্ধিক্ষণে, ষাট বছর আগের সেই দিনে। সে মনে মনে তার কবিতার কয়েক ছত্র আওড়ায়:

বন্ধ বিস্মৃতির জানলাটা খুলি,

বার্ধক্যের কাননে

আবার ফুটেছে কলি,

মিলি আমরা বন্ধু বান্ধবী সজনে,

সময়ের উজানে দাঁড় বেয়ে চলি,

পেরিয়ে এসেছি ষাট বছর

তুলে আনি ফেলে আসা দিনগুলি,

ষাট বছর বাদে

কত কথা মনে পড়ে,

বিনিময় করে নিই সবার সাথে,

মিলি এসে জীবনের কাননে,

স্মৃতির কলি ফুল হয়ে ফোটে,

প্রস্ফুটিত ফুলের সমাহারে

মালা গাঁথি আমাদের মননে,

এই গোধূলি বেলায়

মিলি এসে যৌবনের আলিঙ্গনে,

বার্ধক্যের এ মধু লগনে

সবে মিলি মিলন বন্ধনে।

ফিরে আসে আজের বৃদ্ধদের সেই ভরা যৌবন। সবাই ফিরে গেছে ষাট বছর আগের সেই সন্ধ্যায় যখন সবাই মিলত আড্ডায়। এক অদ্ভুদ অনুভূতির রোমাঞ্চ। উধাও হয়ে যায় আজের একাকীত্ব, বার্ধক্যের অনিশ্চয়তা। চনমনে হয়ে ওঠে সবার মন। মুখ ফসকে সেই সেদিনকার ভাষা বেরিয়ে আসে যা এই বুড়োদের মুখে সভ্য সমাজে মানায় না। উন্মোচিত হয়ে পড়ে নিজেদের সেদিনের অনাবৃত চেহারা। সবাই ভুলে যায় যে এখানে তারা ছাড়াও তাদের ছেলেমেয়ে নাতি নাতনিদের বয়সী অনেক অপরিচিতজন আছে।

যে যার মত জায়গা করে নেয়। বন্ধুদের স্ত্রীরা কেউ কাউকে কোনদিন দেখেনি। কোন মন্ত্রবলে মুহূর্তের মধ্যে তারা একে অপরের একান্ত আপনজন হয়ে ওঠে। যেন পরস্পর কতদিনের পরিচিত প্রথম সাক্ষাতের কোন জড়তা নেই। ঘড়ির পেন্ডুলামটা যেন ঘন্টা বাজিয়ে জানিয়ে যায় এখন সকাল দশটা। প্রত্যেকের  হৃদয় দরজায় সকালের আলো. জীবনের পেন্ডুলাম একটা অক্ষ থেকে আরেকটা অক্ষে ঢোকে। নিরানন্দ থেকে আনন্দ পাওয়া থেকে না পাওয়ার অক্ষে সে দোল খায়। এ যেন মরা গাঙে বান।

কে কোথায় থাকে কর্মজীবনে কে কি করেছে ছেলে মেয়ে নাতি নাতনিদের প্রাথমিক খবরগুলো জেনে নেওয়ার পর সবাই ফিরে আসে ষাট বছর আগের পূরণ দিনগুলোতে। সবাই শরীর মন দুদিক দিয়েই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। ফিরে পেয়েছে তাদের প্রথম যৌবন। সেই সময় কিভাবে সময় কাটাত, কত মজা হত, কে কেমন দুষ্টুমি করত সে সব কথা উঠে আসে। যেন ফেলে আসা সেই জীবনটা সশরীরে এই রেস্তোরাঁয় হাজির।

দেখতে দেখতে সময় চলে যায়। কেউ কাউকে ছাড়তে চায় না। পরিকল্পনা চলে মধ্যে মধ্যে এরকম দেখা করা যায় কি না। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ফিরিয়ে আনার আকুলতা। কিন্তু সময়তো নিজ প্রবাহে প্রবাহিত হয়ে চলে। প্রতিটি মুহূর্ত অতীত হতে থাকে। স্মৃতির ভাণ্ডারে বর্তমান অতীত হয়ে জমা পরে।

আমাদের বয়স বাড়তে থাকে। প্রবাহিত এই সময় ছিনিয়ে নেয় আমাদের এই বর্তমান। তাকে আমরা চাইলেও ধরে রাখতে পারি না। দুতিন ঘন্টার জন্য সে আমাদের অতীতকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এখন বিদায়ের সুর বেজে উঠেছে আবার। আমাদের উঠতে হয়। আবার সেই বার্ধক্যের হাতছানি। একাকিত্বের কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে যায়। সে বৃষ্টি হয়ে নামে আমাদের অশ্রু ভরা চোখে। বিদায় নিতে হয়। স্মৃতি জেগে ওঠে। ধীমানের মুখে আবার কবিতা:

আমার স্নায়ুর সমুদ্রে

স্মৃতি খেলা করে

বসে  এসে চেতনার মজলিসে

অন্তরালে  লুকানো কত সে কথা

নি:শব্দে বলে যায়,

আমি উড়ে চলি

তার ডানায় ডানায়,

সে আসে শৈশবের  ডিঙা বেয়ে

মেলে এসে বাল্যের আঙিনায়,

যৌবনের প্রেম উঁকি মারে

কৈশোরের  সে বেলায়।

উদ্ধত যৌবনে সমুদ্রের গর্জনে

আমি ভেসে যাই

অনিশ্চিতের ভেলায়;

প্রৌঢ় চোখ রাঙায়

ধরে আমায়  নিয়ে যায়

সংসারের হিসেবের খেলায়;

বে-হিসেবি আমি হিসেবের খাতায়

হিসেব মেলে না আমার

ফাঁক থেকে যায় দেনা  পাওনায়।

রেখে আমায় বার্ধক্যে এ বেলায়

স্মৃতি কোথা চলে যায় !

আমি খুঁজে ফিরি তাকে

পাহাড়ের প্রত্যয়ে

জীবন-নদীর আঁকে  বাঁকে

বাতাসের গুঞ্জনে শিশুর ক্রন্দনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *