বাঁচার অফুরন্ত দিশা দেখার প্রয়াস।

সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

আমার বিরাট সৌভাগ্য যে আমি বন্ধু থেকে শত্রু,ধনী থেকে গরিব, হাসি থেকে কান্না, প্রাণ চঞ্চলতা থেকে প্রাণহীন সবই পেয়ে গেছি।

কখনো চরিত্রহীনতার ফাঁদে পড়ে হাঁসফাঁস অবস্থা আবার কখনও বিদগ্ধ সমালোচক হিসাবে সংবর্ধিত। আজ যে বন্ধু কাল সে-ই শত্রু রূপে অবতীর্ণ। সৃষ্টিসুখের উল্লাসে প্রকৃতির এ এক অমোঘ খেলা।গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন- সুখ ও আনন্দ অনুভুত হয় জৈবক্ষমতা চরিতার্থ করার মাধ্যমে। নারী ও পুরুষের যৌনমিলনেই সৃষ্টির প্রকাশ।বন্ধন থেকে সুখ-দুঃখের এক অপার্থিব মহামিলন।

সেইরকম বন্ধু থেকে শত্রু– এ এক জাগতিক অভিব্যক্তি। বেদ- উপনিষদ-পুরাণ সবখানেই সূর্যের বীর্য আবার ক্ষয়িষ্ণু মানবতার প্রতি বিরূপ মানসিকতার প্রমান পাওয়া যায়।

আজকালকার বন্ধুত্ব অবশ্য বেশিটাই মোহপদবাচ্য। শুধুই পাওয়া না পাওয়ার হিসেব কিংবা যৌনক্ষুধা মেটানোর প্রত্যাশায় বন্ধু-বান্ধবীর গ্রাম ছাড়া রাঙামাটির পথে জীর্ণ আলধরে রৌদ্র দীর্ণ পথে সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো।

স্কুলজীবনের বন্ধুত্ব স্মৃতির কোটরে পথ হারায় আজোও। যেটুকু অবশিষ্ট তারা সংসারের ঘানি টেনে টেনে ঝাপসা ফ্যাকাসে। তাছাড়া, কর্মজগতে নেমে কেউবা ঘরছাড়া কানাইয়ের দলে পথহারা নাবিক যেন।কেউ তাপদগ্ধ বৈশাখে নিরুদ্দেশ- বৃষ্টিস্বরূপ—বাদলা কোথায়?

বন্ধুত্ব গড়ে আবার বিদীর্ণ বিশীর্ণ হয়ে মরুপ্রান্তরে হাহাকার করে। খেলার সঙ্গীরা খেলা ছেড়ে বিড়ি ফুঁ কে মহাদেবের মতো গাছতলায় দিন গুজরান করে। হঠাৎ দেখা হলে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্মৃতির এ্যালবামে ঘাঁটে।বাল্যবয়স ফুরিয়ে যায় আকাশের নীল সীমানায়।

আমি ধনীর সন্তান বলেই আগে মানুষ কিছুটা সমীহ কোরতো আজ বুঝতে পারছি। এখন আমার ধনী পিতা নেই;ধনও সীমানা পেরিয়ে ভুলভুলাইয়াতে মাথা কোটে। বন্ধুত্বও অস্তাচলগামী। পুনর্মিলন বুঝি অসম্ভব।যারা টিকে আছে তারা স্ত্রী সহচরে দূরত্ব মাপে। পাঁচ হাত দূরত্বের সহপাঠীরাও পাঁচ কিলোমিটার পরিক্রমায় ক্লান্তি বোঝায়।পরে স্কুল পেরিয়ে কলেজে বন্ধুত্ব বেড়েছে।

বান্ধবীরা অসম্ভব প্রেম শক্তি নিয়ে ভ্যালভ্যাল করেছে।ব্রহ্মচর্য অসম্ভব হয়েছে। নারীর সংলাপে ছিটকে গেছে বয়ঃসন্ধির ব্যাকুল তৃষ্ণা নিবারণের ক্ষমতা। প্রেম এসেছে বন্ধুত্বের জানলা খুলে।যদিও শেষমেশ কোনটাই ধোপে টেকেনি। সিনেমা, পার্ক, হোটেল, কফিহাউস, বইপাড়া, শান্তিনিকেতন অনেক পথই পার হতে হয়েছে।এখন নিঃসঙ্গ জীবন।

সিগারেট ছুঁইনি। চা-ও ধরিনি। বন্ধুত্ব গড়গড় করে এগিয়ে গেছে। প্রফেসরদের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছি। বন্যা ত্রানে দূর পেন্ট পলস্ কলেজ থেকে হুগলির রাজহাটি গ্রামে এসে অজস্র প্রশংসা কুড়িয়েছি।

এখন যারা পাশে পাশে ঘুরঘুর করে তারা  সবাই শত্রু— হয় সামনাসামনি নাহয় গোপনে। কারণ, আমি যেমন জানিনা তারাও জানেনা— তবু শত্রুতা। কেউ বলে আমার অসংযত বাক্যালাপ, কেউ বলে ভয়ঙ্কর স্পষ্টবাদীতা আবার কেউবা বলে অসামান্য ব্যক্তিত্বই এর জন্য দায়ী।

 কলেজ জীবনে নারী সঙ্গ পেয়েছি বন্ধুত্ব হিসেবে।তারপর কোনোদিন একে অপরকে না দেখে থাকতে না পারার বেদনা। কলেজ যেতাম, ক্লাস করতাম। কলকাতার তালতলা আর বেনেপুকুরের  বস্তি এক হয়ে মিশে ছিল। যেন কৃষ্ণ- রাধা , যেন রোমিও-জুলিয়েট । কিন্তু কেউ প্রেম-প্রত্যাখ্যাত হবার ভয় পাইনি। দুজনের ই আলাদা সংসার হয়েছে। বন্ধুত্ব রয়ে গেছে অমলিন।

প্রেমের মধ্যে কৃপণতা ছিল না। অতি সযত্নে হৃৎপিণ্ডের দুর্বলতা চেপে রাখার, কন্ঠস্বর গোপন রাখার ইচ্ছা ও ছিলনা দুজনার মধ্যে।। হারিয়ে গেছে দিলীপ, বেণী,বাসুদেব, সুকৃতি আরও অনেকে। কারোরই

হদিশ মেলেনি।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, ফিরে যাই তাদের কাছাকাছি। স্মৃতি চর্চা করি— কিন্তু নানান সমস্যা বাগড়া দেয়। আবার মনে হয় তারাও কি আর আমাকে মেনে নিতে পারবে?? একবার হঠাৎ ট্রামে উঠে একজনের হাত ধরে বলেছি— কি কেমন? উত্তরে বলেছে কে আপনি?  আমি আমার রোল নম্বর স্মরণ করিয়ে দিতে অবাক হয়ে বলেছে এখনো স্মৃতি তে আছে!!!?

সেই একবার। তারপর শেষ। আরও কতজন হারিয়ে গেছে– অবলীলায় বংশীবদন হয়ে সংসারএর সুর বাজায় নয়তো শোনে। আমি ভাবি, ভেবে চলি, হে বন্ধু আমার— যেখানেই থাকো ভালো থেকো।

যদি স্মৃতিকে ছুঁতে চাও তাহলে একবার স্মৃতির এ্যালবামে হাত ঘোরাও— আশ্রয় না পাও আশ্বস্ত হবে। কেননা—

Tomorrow is the first blank page of 365page book. Write a good one.

দয়া নয় ঘৃণা নয় প্রেম– শুধু জীবনের তাগিদে বেঁচে থাকার, বাঁচার অফুরন্ত দিশা দেখার প্রয়াস।

 ৩১জ্যৈষ্ঠ ১৪২২.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *