বাজারু – সুরজিৎ গুপ্ত

পোকা অনেক ধরনের হয়। কীটপতঙ্গ নয়, মানুষপতঙ্গ।যেমন ধরুন বইয়ের পোকা, সিনেমার পোকা,সিরিয়ালের পোকা, নাটকের পোকা, খেলার পোকা। ইদানীং তার সাথে আর একটা নতুন যোগ হয়েছে ফেসবুকের পোকা।

শ্রী নটবর দত্ত মানে আমাদের নাটুবাবু  হলেন একদম এদের থেকে আলাদা।তিনি হলেন আবার বাজারের পোকা। খুব ছোটবেলা থেকে বাজারের হাতে খড়ি। এই বয়সে মোটামুটি পাকা বাজারু।সেরা বাজারটা নাটুবাবুই করতে পারেন। তবে যেদিন কিছু বাজার করার থাকে না, নাটুবাবুর মনটা উশখুশ করতে থাকে বাজারে যাবার জন্য। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গিন্নিকে জিজ্ঞেস করতে থাকেন,

হ্যাঁ গো রসুন আছে ? ধনেপাতা? টমাটো?

সব আছে বলছি তো।

আচ্ছা কাল তুমি লেবুর কথা বলছিলে না।দেখি।

নাটুবাবু ফন্দি খোঁজেন বাজারে যাবার। কিছু না আনার থাকলেও থলি হাতে একবার বাজারে ঢুঁ না মারলে মনটা কেমন হয়ে যায়।বাজারে গেলেই অযথা এক ব্যাগ বাজার করে না আনলে নাটুবাবুর মন ভরে না। এদিকে ঘরে অশান্তি। খাওয়ার লোক নেই, শুধু বাজার করে আনলেই হল।সেগুলো উদ্ধার হবে কি করে ? এই নিয়ে তুমুল অশান্তির পর একটা সমাধানে পৌঁছন গেছে।আজকাল  গিন্নির করে দেওয়া বাজারের ফর্দ ছাড়া বাজার করেন না।

নাটুবাবুর মনে বড় কষ্ট । হাত পা না খেলিয়ে কি বাজার করা যায় ? সিজিন চেঞ্জের সাথে সাথে বাজারে কত নতুন জিনিষের দেখা মেলে। হঠাৎ করে, এক একদিন এসে যায় এসব। তখন কি আর ফর্দ মিলিয়ে বাজার করলে চলে ?এই তো সেদিন , পুজোর পর পর, বাজারে বেশ ডাঁশালো জলপাই এসেছিল। একটু নরম দেখে নিয়ে ভাল করে ধুয়ে , নুন চিনি,তেল আর কাঁচালংকা দিয়ে চটকে রোদে ঘন্টা তিনেক ফেলে রেখে শেষপাতে খেতে ! উফফ জাষ্ট ভাবা যায় না। কিন্তু ওই যে বাঁধা ফর্দের বাইরে নৈব নৈব চ।

শীতকালটা নাটুবাবুর খুব ফেভারিট ।বাজারে গেলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।কত রকমের সুন্দরীদের আনাগোনা।পিঁয়াজকলি তার রূপের ডালি নিয়ে হাজির। অমন পেলব দেহ , কোন সুন্দরীর রমনীর কোমল বাহুবল্লরীর থেকে কম নয়। হালকা হিমের পরশ পড়তে না পড়তেই হাজির হওয়া গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সিম মটরশুঁটিরা ।মরশুমের প্রথম বাঁধাকপিটা দেখে মনে হয় গাঢ সবুজ আর পেস্তা রঙের পিয়োর সিল্কের শাড়ী পরা ঘোমটা টানা নতুন বৌ। ঘোমটার আড়াল দিয়ে উঁকি মারছে ।আহা, কার বাগানে হয়েছিল গো? সদ্য কেটে আনা। সারারাত হিমের পরশ পেয়েছে।এখনো এই

” সকাল বেলায় কপির পাতায় শিশিরের রেখা ধরে “

হাতে তুলতেই কচরমচর শব্দ একটা। নিতে যাচ্ছিলেন আর কি। কি মনে পড়তেই পকেট থেকে ফর্দটা বার করে একবার দেখলেন । নাঃ, বাঁধাকপির কোনো উল্লেখ নেই সেখানে।

অগত্যা, কুমড়োর দিকে হাত বাড়াতে হল।কুমড়ো নাটুবাবুর বরাবরই নাপসন্দ।ফালি কেটে রাখা বিচি ভর্তি কুমড়োগুলো হলদে ছোপওয়ালা দাঁত বের করে হাসছে তার দিকে তাকিয়ে।কি আর করা, তাই দাও ! মাছের মাথা নাকি অনেকদিন ধরে পড়ে আছে ফ্রীজে।ঝিঙ্গে, বেগুন দিয়ে ঘ্যাঁট হবে।

বেগুন কিনতে গিয়ে চোখে পড়ল পাশেই রাখা সতেজ মুলো। পোলকা ডটের গোলাপী আর সাদা স্যুট পরিহিতা মুলোসুন্দরীদের গায়ে সবুজ ওড়না। সুন্দরীরা হেসে এ ওর গায়ে যেন লুটিয়ে পড়ছে। নাটুবাবু দিকবিদিক শুন্য হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আঁটি খুলে দুপিস মুলো বার করে বললেন ভাই এটা দাও তো।

বাবু একদম টাটকা, পুরো আঁটিটাই নিন না, মাত্র তো দশটাকা!

না না, তুমি ওই দুটোই দাও।

মনে মনে বললেন তুমি তো জান না পুরো আঁটি নিলে আমার ঘেঁটি নড়ে যাবে। ওই দুপিস না হয় কোনমতে ঘ্যাঁটের মধ্যে চালান করা যাবে।

মুখে বললেন

নেব নেব, আর একটু গায়ে গতরে লাগুক। তারপর ঝিরিঝিরি করে কুরে,স্রেফ ভাজা ভাজা হবে নারকেল কোরা আর বড়ি দিয়ে। উফ যা লাগবে না !

শীতের বাজারে শুধু মুলো ছাড়া কিছুই নেওয়া হল না নাটুবাবুর। লিষ্টে কিছুই নেই। মুলোটাও জোর করে নেওয়া।শাককে শাক পিছনে আবার মুলো !নরম মুলোশাকই বা কি ফেলে দেবার ? নরম মুলোশাক কুচিকুচি করে ভেজে নিয়ে আর মুগডাল একটু কটকটে করে ভেজে ছড়িয়ে দিলে অনেকটা ভাত টেনে দেওয়া যায়।নাটুবাবু সেদিন ব্যাজার মুখে বাজার সেরে ফিরলেন।

এদিকে সবুজ বোঁটাওয়ালা ছাড়া ছাড়া ফুলকপি যেন সাদা লক্কা পায়রার মত পেখম মেলেছে।নাটুবাবু ওই ফুলকপি ছাড়া খান না। ঠাসা ফুলকপির আবার টেস্ট আছে নাকি ? ঘাসের মত খেতে।কাতলা বা পুকুরের ভেটকির গাদা, ফুলকপি , সিম আর হিং এর বড়ি দিয়ে ঝোল, আহা , কি অপুর্ব।

সুন্দরী বাঁধাকপি , যুবতীর কোমল পদ্মকলি আঙ্গুলের মত মটরশুঁটি , লাস্যময়ীর রাঙা ঠোঁটের মত কচি গাজর  আর শীতের বিট ? কোনো বার্গেন্ডি রঙ করা সুন্দরীর চুলের চেয়ে কম যায় কিসে। সব অধরা রইল , কবে এসবের নাম ফর্দে ঢুকবে কে জানে ? ততদিন পর্যন্ত ওই উচ্ছে, বেগুন, কুমড়ো, কুন্দরি আর ঢেঁড়স খেয়ে কাটাতে হবে ।

নাটুবাবুর বাজারু প্রতিভা ওই ফর্দের লালফিতের বাঁধনে পড়ে পুরো ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এই তো পুজোর ঠিক আগে আগেই, একদিন মাছ বাজারে গিয়ে একটা ইলিশ হাতে লেগে গেল। এইসময়টা ইলিশ যাই যাই করছে। সাইজও ভাল নেই। মাত্র দুপিস আছে।তার মধ্যেই ছ সাতশো ওজনের ইলিশটা হাত দিতেই নাটুবাবু বুঝে গেলেন। বেশ টাইট আর গোলালো পেট।

নেবেন কি নেবেন না এই দোনামনায় আছেন।ইলিশ আজ লিষ্টে নেই , কিন্তু ভাল জিনিসটা হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করছে না। ইতিমধ্যে একজন ঢুকে গেছেন।নাটুবাবু ছাড়লেই উনি নিয়ে নেবেন। নাটুবাবু এই সময় মোক্ষম অস্ত্রটা ছাড়লেন।

মাছটার পেটে কিন্তু ডিম ভর্তি।

না না ডিমটিম কিচ্ছু নেই বাবু।

তুমি আমাকে শেখাচ্ছ ? সেই সতের বছর বয়েস থেকে বাজার করছি। কার পেটে ডিম আছে কার নেই সে আমি ভালই বুঝি, বুঝলে।

ততক্ষনে পাশের লোকটা কেটে পড়েছে।নাটুবাবু দরদাম করে ইলিশটা নিয়েই নিলেন। যদিও ফর্দের বাইরে তবু ডিমভর্তি ইলিশটার স্বাদ ভাল ছিল বলে সে যাত্রায় কোনো হ্যাপা হয় নি।

তবে সেদিন যেটা হয়ে গেল, সেটা একটা ইতিহাস । নাটুবাবু পিঁয়াজশাক দিয়ে পোস্ত খেতে খুব ভালবাসেন। কিন্তু নিয়ে গেলেই রান্নাঘরে খুব অশান্তি হয়। পিঁয়াজশাকের গোড়ায় মাটি লেগে থাকে। একটি একটি করে খোসা ছাড়াতে হয়।গিন্নী দেখলেই রেগে যান।দুতিনদিন রান্নাঘরে পড়ে থাকার পর সময় পেলে সেটা ছাড়িয়ে যখন রান্না হয় ততক্ষণে শাক শুকিয়ে দড়ি।অভিমানী নাটুবাবু সেইজন্য পিঁয়াজশাক আনাই ছেড়ে দিয়েছিলেন।

সেদিন মাছবাজারে দাঁড়িয়ে মাছ দেখছিলেন। পাশের ভদ্রলোক মৌরলা নিচ্ছেন। ভাল সাইজ। ওনার পরিচিত একজন পাশ থেকে,

আজ কি মাছ নিলেন, দাদা ?

এই মৌরলা।সাথে পিঁয়াজকেলি নিয়েছি। ওটা দিয়ে মৌরলা ভাজা ভাজা, আমার দারুন লাগে বুঝলেন না।

নাটুবাবু শুনছিলেন। জিভ দিয়ে নোলা সুড়ুৎ করে গড়িয়ে পড়ল।নাটুবাবু দেখলেন ভদ্রলোকের বাজারের থলি থেকে পিঁয়াজকলি উঁকি দিচ্ছে। পিঁয়াজকলির ডগায় পদ্মফুলের আধফোটা কুঁড়ির মতন ফুল, যেন ইশারায় ডাকছে নাটুবাবুকে।

নাটুবাবু লোভে পড়ে অর্ডার দিলেন

ভাই আমাকেও দুশ মতন মৌরলা দিও তো।একটু বেছে দিও ভাই।

মাছ নিয়ে নাটুবাবু পিঁয়াজকলির খোঁজে গেলেন।থলে ভর্তি করে ঘরে পৌঁছতেই শুরু হল অশান্তি,

আবার এনেছো ? কি রান্না হবে ওটা দিয়ে ?

গিন্নির গর্জনে নাটুবাবু কিরকম নেতিয়ে গেলেন,

ওই বাজারে একজন বলছিল মৌরলা দিয়ে ভাজা ভাজা নাকি দারুন লাগে।

ও তুমিই রাঁধো বাপু। ওসব আমি পারব না।কি করে রাঁধতে হয় সেটা শিখে এলে তো পারতে।যত বয়স বাড়ছে তত নোলা বাড়ছে।যত্তসব।

নাটুবাবু দেখলেন ঝাঁজ বাড়ছে। মিনমিন করে বললেন

আচ্ছা , মৌরলাটা তুমি ভেজে রাখ , আমি ততক্ষনে শাকটা কেটে দিচ্ছি।

সুন্দরী পিঁয়াজকলি যে এত নাকের জলে চোখের জলে করতে পারে নাটুবাবুর জানা ছিল না।ঝাঁজে ক্রমাগত নাক দিয়ে জল বেরতে শুরু করল। নাটুবাবু কাটাকুটি সেরে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করতে করতে রান্নাঘরে জল দিয়ে শাক ধুতে গেলেন।

যাও যাও, খুব হয়েছে । আর আদিখ্যেতা করতে হবে। এইটুকু কাজ করতে গিয়ে সর্দি বাঁধিয়েছেন।

বুকভরা অভিমান নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে নাটুবাবু শপথ নিয়ে ফেললেন জীবনে আর কখনো পিঁয়াজকলির ডাকে সাড়া দেবেন না।

চান করে খেতে বসেছেন। পাতের একদিকে মৌরলামাছ পিঁয়াজকলি দিয়ে ভাজা।নাটুবাবুর  অভিমান গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে। এটা সেটা দিয়ে ভাত খাচ্ছেন।ইচ্ছে, গিন্নির চোখের আড়াল হলেই জানলা দিয়ে থ্রো করে দেবেন ওটা। আজকেই শপথ নিয়েছেন আজ থেকেই লাগু হোক। এখন শুধু সুযোগের অপেক্ষা।

কি গো মাছটা খেলে না ? দারুন হয়েছে কিন্ত। আমি তো পুরো ভাতটাই প্রায় ওটা দিয়ে খেয়েছি। আর একদিন পেলে নিয়ে এসো তো।

ব্যাস,  নাটুবাবুর বুক ভরা অভিমান গলে জল। নেতাদের মতন খুব তাড়াতাড়ি শপথ ভুলে নাটুবাবু তখন বাকি ভাতটা মৌরলা আর পিঁয়াজকলি ভাজা দিয়ে মেখে খেতে খেতে ভাবছেন গিন্নির রান্নার হাতটা কিন্তু সত্যিই চমৎকার !!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: