বিবাহ থেকে শুরু বিচ্ছেদে শেষ //লেখা – প্রিয়নীল পাল।

ssmriti

ভালোবাসাতো আমাদের দেশের আকাশে বাতাসে, সেই চোখে চোখে প্রেম চিঠি তারপরে আবার এখন সোশাল মিডিয়ার ভালোবাসা আদান প্রদান থেকে বিয়ে সব তো হচ্ছে অনায়াসে।বিবাহ ইতিহাস ঘেটে দেখলে প্রথম দিকে এটা ভালোই বলা যায় যে আমাদের সমাজে নারী পুরুষের একসাথে থাকা এবং যৌনতার একটা সামাজিক স্বীকৃতি হল বিবাহ।

আমাদের সারা পৃথিবীতে পরিবার-পরিকল্পিত বিবাহ,নিজেদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিবাহ, শিশু বিবাহ, বহুবিবাহ এবং জোরপূর্বক বিবাহ হয়েই থাকে, সব ধরণের বিবাহের অনেক অনেক উদাহরন আমরা পেয়েই থাকি আমাদের চার পাশে।

এদের মধ্যে বর্তমানে শিক্ষার অগ্রগতির কারণে শিশু বিবাহ অনেকটা হলেও কমেছে কিন্তু বাকি গুলো? চলেই যাচ্ছে চলছে। আর চলাটা অস্বাভাবিকও নয় কিন্তু এই বিয়ের সম্পর্ক চলতে চলতে প্রায় থেমে যাওয়াটা অনেক সময়ে স্বাভাবিক লাগে না। 

বিবাহের কারণ যখন জানি তাহলে এত বিচ্ছেদ কেনো? 

প্রেমের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিয়ে না করে আগেই বিচ্ছেদ করে নেওয়াটা অনেকটাই ট্রাডিস্যানাল কিন্তু বিয়ের পরেই বিচ্ছেদ সেটা কি করে হয়!!! 

কারণ অনেক আবার সেই কারণেরও কারণ অনেক এরকম কারণেই তো বিচ্ছেদ। 

বেশ এবার কিছু গল্প পর্যবেক্ষণ করে দেখি , ডিভোর্স কাদের হয় এবং কেন হয়? 

গল্প – ১

মোনালি আর সুমোন প্রেম করে বিয়ে করেছে,তাদের স্কুল থেকে কলেজের প্রেম, বেশ অনুভূতি পরিপূর্ণ আর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভালোবাসা তাদের। সেখান থেকেই অনেক কম বয়সেই বিয়েটা সেরে ফেলেছে তারা, সুমোন এমনি খুব ভালোবাসার মানুষ, কিন্তু পকেটে যে টান, সঠিক করে স্থায়ী না হয়েই মোনালির ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে। প্রেমের আবেগে সব ছেড়ে নুন ভাতে থেকে যাওয়ার আশা ভরসা ছিল বটে মোনালির কিন্তু বিয়ের বছর এক পরে থেকেই কেমন মনটা বিরিয়ানি বিরিয়ানি করতে লেগেছে! 

সমস্যা শুধু এটুকুই নয়, পুজোর ছয় দিন ছয়টা জামা নেই, হঠাৎ হঠাৎ নতুন নতুন জিনিস কেনা নেই, প্রয়োজনেও ভরসা সেই মানিয়ে নেওয়া। কেমন যেনো পুরোনো প্রেম এবার ইতি টানতে চাইছে।তাই নিত্য অশান্তি আর নানান কটূক্তি এটাই বর্তমান হয়ে পড়েছে মোনালি আর সুমনের এক বছরের সংসারে। 

মোনালি নিজের এই জীবন আর মেনে নিতে না পেরে সেই বিচ্ছেদ কেই বেছে নিলো ।

অর্থাৎ কারণ “দাম্পত্য জীবনের কোনো সংকটে বা কঠিন পরিস্থিতে নিজেকে সবসময় নির্যাতিত কিংবা ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করা।”

গল্প-২

একটু যদি অন্য বাস্তবতা দিয়ে দেখি তাহলে বলি 

যেসব দম্পতির বৈবাহিক জীবন অতিরিক্ত রোমান্টিকতা দিয়ে শুরু হয়, তাদের মধ্যে ডিভোর্সের প্রবণতা বেশি। কারণ, ওরকম রোমান্টিকতা ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য যে, যাদের দাম্পত্য জীবনের শুরুতে তুলনামূলক কম রোমান্স থাকে, তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক মজবুত হয়, 

কারন ধারাবাহিকতা বজায়। সত্যিই তো তাই যেমন করুণা আর দীপ শুরুটা তাদের ছিল উত্তম সুচিত্রার প্রেমের মতোন, রোজ সকালে করুণা দীপ কে কানের পাশে আলতো চুমু দিয়ে উঠিয়ে দিত, তাকে গান করে শোনাতো, সারাদিন অফিস এ থাকা কালিন কত ফোন হতো, প্রতিশ্রুতি আর পূরণ ছিল সমার্থক। কিন্তু সংসার মানেই অনেক দায়িত্ব অনেক কর্তব্য ধীরে ধীরে সংসারের চাপ বারে, বেড়ে ওঠে অনেক কাজের কাজ। 

হয়ে ওঠে না সবটা ঠিক যেমনটা হতো আগে, কিন্তু অভ্যাস যে পিছু ছাড়তে চায় না, করুণা অনেক অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেললেও সেই মানসিক শান্তি ধীরে ধীরে যেনো দীপকে দিতে পারছিল না এমনকি দীপ নিজের সমস্যার কথা করুণা কে বললেও সে সমাধান না করে নীরবতা পালন বা সেই প্রসঙ্গে কথা বলতে চায়না এবং এই না চাওয়ার স্বভাবটা দিন দিন আরো বেড়ে যাচ্ছিলো তাই দীপের সাথে দূরত্ব এতটাই বেড়ে উঠেছিল যে অবশেষ হল বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে। 

গল্প – ৩

 উৎপল ও তার স্ত্রী মেঘনার মধ্যে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্ত শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ঠিকমতো মানিয়ে নিতে পারছে না পুত্রবধূর সাথে। এদিকে উৎপলের শাশুড়ি সংসারের ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি নাক গলাচ্ছেন। মেঘনা এদিকে উৎপল এর মা এর সাথে কোনো মতেই মানিয়ে নিতে রাজি নয়।

এদিকে ছেলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা সংসার করাও সম্ভব নয়। আলোচনা করেও কোনো সমস্যার সমাধান হয় না, মেঘনা নাকি নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলছে এই চার দেয়ালের ভিতরে। ক্রমাগত একটা অশান্তির পরিবেশে দুজনেই হাপিয়ে উঠছিল তাই গল্পের শেষে তখন তাদেরকে আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। 

গল্প – ৪

ভালো ডাক্তার ছেলে দেখে রূপার বিয়ে হয়েছে, পণ দেওয়া হয়েছে মোটা টাকা, সংসার চলা শুরু হয়েছে গুটি গুটি পায়ে,যতো দিন যায় ততই যেনো সংসার এর সংজ্ঞা পরিবর্তন হতে থাকে রূপার চোখের সামনে। সে আসতে আসতে নিজের স্বাধীনতা ভুলে যেতে থাকে কোনো প্রশ্ন করা কোনো কথা বলা যাবে না থাকতে হবে বোবা হয়ে আর নাহলে পড়বে বেল্টের বাড়ি,স্বামী কোথায় যায় কি করে জানার অধিকার তার নেই,

মাঝে মধ্যে রূপা কে তার বাবার বাড়ি থেকে চাইতে হয় কিছু টাকা নাহলে খাওয়ার সময় দেখতে হবে শুধু কিছুই খাওয়া যাবে না। কিন্তু রূপা মাঝে মধ্যেই এইসব করতে রাজি হয় না, তাই রূপা কে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তাকে সবসময়ই দমিয়ে রাখার জন্য নানা ধরনের হাতিয়ার ব্যবহার করে তার স্বামী , যার মধ্যে অনেকগুলোই চোখে দেখা যায় না। ভয় দেখিয়ে, গোপন অপরাধবোধ জাগিয়ে তুলে, অপমানিত করে, লজ্জা দিয়ে, আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে তার স্বামী আর তার পরিবারের সদস্যরা।

পরিস্থিতিটা এমনভাবে তৈরি করে যে, রূপা নিজের অজান্তেই হার মানতে বাধ্য হয়। তখন রূপা আরো তীব্র প্রতিবাদ করতে চায় এবং এর থেকে মুক্তি পাবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর তারপরেই দ্বারস্থ হয় ডিভোর্সের।

গল্প-৫

রূপক আর পিয়ু প্রায় পাঁচ বছর সংসার করছে, দুজনেই কর্মজীবি, কিছু দিন ধরেই হঠাৎ পিয়ুর বাড়ি আসতে দেরি হচ্ছে, তা নাকি কাজের চাপ, তার সঙ্গে পিয়ুর ব্যবহার যেনো ক্রমাগত বিরক্তকর হয়ে উঠছে। রূপক কিছু জানতে চাইলে উত্তর দিতে রাজি হয় না পিয়ু, সন্দেহ সৃষ্টি হয় আর সেটা মাথা চারা দিতে থাকে আসতে আসতে। 

যে রূপক ভালোবাসার আদর্শ ছিল এতদিন সেই নাকি বর্তমানে পিয়ুর জীবনের সব থেকে খারাপ একটা সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে রূপক সময়ে ফোন না করলে পিয়ুর মুখ ভার হয়ে থাকতো সেই রূপক আজ ফোন করলে পিয়ুর বিরক্ত লাগে, রূপক কে শুনতে হয় এত ফোন কেনো? তুমি কি আমায় সন্দেহ করছো!! 

সাময়িক মোহ বা ইনফ্যাচুয়েশন এর জেরে পিয়ু ভুলতে বসেছে বিয়ের সমস্ত প্রতিশ্রুতির কথা তাই আজ হয়তো রূপক তার কাছে কেমন মেরমেরে পুরোনো। এরকম পরিস্থিতিতে একদিন চরম কিছুর মুখোমুখি হয়ে পড়ে রূপক, তারপরে একসাথে থাকাটা কেমন যেনো দম বন্ধকর হয়ে ওঠে, তাই ডিভোর্স পেপারে এ সই টা বাধ্যতামূলক করতেই হয়। 

গল্প – ৬

যৌন সমস্যা দাম্পত্যে ফাটল ধরায় খুব দ্রুত যেমন ছিল সুজয় আর মুনের। শরীরী প্রেম দাম্পত্যের এক বিশেষ চাহিদা, আর সেই শরীরই যখন নিয়ন্ত্রণ হারায় তখন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রভাবিত হবেই! সুজয়ের যৌন চাহিদার পার্থক্য শুরু করে দিয়েছিল দূরত্ব, এদিকে ইমপোটেন্স, ফ্রিজিডির মতো যৌনসমস্যা নিয়ে চিকিত্‍সক বা কাউন্সেলরের কাছে যাওয়ার কথা সুজয় আর মুনের অজানা। ফলে শোবার ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে তৈরি হয় এক তিক্ত, প্রেমহীন পরিবেশ।কেউ কাউকে অভিযোগ করে না, বলে না কিছুই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে হয়ে চলে হাজার অশান্তির ত্রাস। এই তিক্ততাকে সঙ্গী করেই জীবন কাটিয়ে দিতে সুজয় রাজি হলেও মুন রাজি হতে পারে নি। 

আমার   কথা 

পারিবারিকভাবে হোক বা প্রেম করে- উভয় ক্ষেত্রেই ডিভোর্সের পরিমাণ আশঙ্কাজনক। রেস্টুরেন্টে পার্কে কিংবা বাড়িতে বসে কয়েক ঘণ্টার প্রেমালাপ বা সপ্তাহে দু’দিন ঘোরাঘুরি করা ও বছর বছর সম্পর্কে থাকা আর বিয়ের পর এক ছাদের নিচে থাকার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। যতই পূর্ব পরিচিত হোক না কেন, বিয়ের পরই একজন মানুষকে গভীরভাবে চেনা যায়।

দাম্পত্য জীবনে যারা একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়,কথা রাখতে প্রস্তুত নয়, মনের কথা উপলব্ধি করতে ইচ্ছেমত নয়, নিজেদের গুরুত্বপূর্ণতা জানতে রাজি নয় এবং যারা সঙ্গীর উপর অতিরিক্ত অকারণ প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তারা সুখী হতে পারে না।

অন্যদিকে পারিবারিকভাবে হওয়া বিয়ের ক্ষেত্রে দু’জন অপরিচিত মানুষের স্বভাবগত পার্থক্যের পাশাপাশি পূর্বের প্রেমের সম্পর্ক, সত্য গোপন করা, সন্দেহ প্রবণতা, বোঝাপড়ার অভাব, অনীহা কিংবা ভয়ের কারণে শারীরিক সম্পর্ক উপভোগ না করা বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

সম্পর্কের নানান ধরণ আছে নানান পরিস্থিতি আছে আগের কিছু ছোটো গল্প থেকে এটুকু বলতেই পারি যে ডিভোর্স এর পেছনে কারণ অনেক। 

কারন যখন আমরা জানি তখন চেষ্টা করা দরকার সেই কারন গুলোতে না আসার তবেই বন্ধ হবে বিচ্ছেদ কিংবা আলাদা করে বলা যায় সব সম্পর্ক হবে সঠিক। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: