ভালোবাসা নাকি সহানুভূতি – ইতি ভ্যালেন্টাইন । প্রিয়নীল পাল

pnil

ভালোবাসা কিন্তু সবসময় নিয়ম ভাঙতে আর সাহস দেখাতে প্রস্তুত থাকে। পৃথিবীতে ইতিহাসের থেকেও পুরোনো কিছু থাকলে সেটিই হয়তো ভালোবাসা।

কারন এই ভালোবাসার উৎপত্তি কবে আর কেনো সেটা জানা সম্ভব না। তবে আমরা বর্তমানে ভালোবাসতে চরম ভালোবাসি।সে শরৎচন্দ্র যতোই দেবদাস লিখেছেন, তাতে ভয় পেয়ে কেউ প্রেম করাটা ছাড়তে পারে নি।

বরং পাশ্চাত্য গল্প থেকে ঠিক একটা আন্তর্জাতিক দিবসও খুঁজে বের করে নিয়েছে ভালোবাসার মানুষ গুলো ।

ভালোবাসা কিন্তু আদতে খুব আনারি তাই বারে বারে মুখ থুবরে পরে কিন্তু তাতে কি! নিজের শরীরের অঙ্গ সেটা কি আর কেটে ফেলা অতোই সহজ!

ভালোবাসা কিন্তু সবাইকে যায় মা বাবা থেকে ভাই বোন বন্ধু বান্ধব আর প্রেমিক প্রেমিকা তো উজ্জ্বল নিদর্শন।

তবে যতোই যা বলি প্রেমিক প্রেমিকার সাথেই ভালোবাসার যোগ সূত্র চরম প্রবল। তাই ভ্যালেন্টাইন আর ভালোবাসা খুব সহজেই প্রেমিক প্রেমিকার কাছে গিয়ে মিলে যায়।

তবে সত্যি বলতে আমরা ভ্যালেন্টাইন দিবসে ভালোবাসার সফলতা মনে করি নাকি ভালোবাসার অপরিনতিটাই হেসে মেনে নিতে চাই সেটাই পরিস্কার নয়।

ভ্যালেন্টাইন নিয়ে যেমন অনেক গল্প আছে সেখান থেকেই যদি একটা তুলে আনি তাহলে দেখবো  রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস নারী-পুরুষের বিবাহ বাধনে আবদ্ধহওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তার ধারণা ছিল, বিবাহ বাধনে আবদ্ধহলে যুদ্ধেরপ্রতি পুরুষদের অনীহা সৃষ্টি হয়। এই নিষেধাজ্ঞা যে অনেক অনেক ভালোবাসা কে পরিণত হতে দিচ্ছিল না সেটা বুঝতে কারোর অসুবিধা হবে না কিন্তু ভালোবাসা কোনো নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে অভ্যস্ত নয় ।

তাই সে সময় রোমের খ্রিষ্টান গির্জার পুরোহিত ‘ভ্যালেন্টাইন’ রাজার নির্দেশ অগ্রাহ্য করে গোপনে নারী-পুরুষের বিবাহ বাধনের কাজ সম্পন্ন করতেন।মানে এটা চিরাচরিত যে ভালোবাসার জন্য এক বিদ্রোহী বিপ্লবী জন্ম নেবে, যে সব বেনিয়ম ভেঙে শুধু ভালোবাসার জন্য কাজ করবে তখনও সেটাই হয়েছিল।সেই বিদ্রোহী মানুষটা ছিল ভ্যালেন্টাইন। এই ঘটনা উদ্ঘাটিত হওয়ার পর তাকে রাজার কাছে ধরে নিয়ে আসা হয়।

ভ্যালেন্টাইন রাজাকে জানালেন, খিষ্টধর্মে বিশ্বাসের কারণে তিনি কাউকে বিবাহবাধনে আবদ্ধহতে বারণ করতে পারেন না। রাজা তখন তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। কারাগারে থাকা অবস্খায় রাজা তাকে খ্রিষ্টান ধর্ম ত্যাগ করে প্রাচীনরোমান পৌত্তলিক ধর্মে ফিরে আসার প্রস্তাব দেন এবং বিনিময়ে তাকে ক্ষমা করে দেয়ার কথা বলেন।

 ভ্যালেন্টাইন রাজার প্রস্তাব মানতে অস্বীকৃতি জানালেন কারণ কিন্তু একটাই হয় তিনি এই নিষেধাজ্ঞা মানতে চান না। তখন রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। বন্দী অবস্থায় ভ্যালেন্টাইনের সাথে অনেকেই দেখা করতে আসতেন তার মধ্যে ছিল এক অন্ধ মহিলা, তিনি রোজ আসতেন, ওনাদের কি কি কথা হতো সেটা বলা মুশকিল কিন্তু তার আসা যাওয়া অনুভূতির সুপ্ত প্রদীপ জ্বালাতে শুরু করে দিয়েছিলো এটা বলাই যায়।

এখান থেকেই শুরু একটা কিছু গল্প আর গল্পের বিশেষ আকর্ষণ যে  ভ্যালেন্টাই এই দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। তার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন, হয়তো প্রথম সে ভ্যালেন্টাইনকেই দেখেছিল, তাদের চোখ একে অপরের দিকে কতক্ষণ ছিল কিংবা তারা কতটা ভালোবাসায় আবদ্ধ হয়েছিল তা বলা মুশকিল কিন্তু ভালোবাসা যে হয় নি, পুরোটাই সহানুভূতি সেটিও বলা চলে না।

কারণ যে মানুষটার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত তার মনে হঠাৎ করে কোনো অচেনা মেয়ের প্রতি সহানুভূতি জেগে উঠবে আর সে প্রাণপণ চেষ্টা করবে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে সেটা মেনে নেওয়া সহজ না, একটা বিশেষ কারণ তো থাকতেই হয়, হয়তো কারণটা ছিল ভালোবাসা।

সে যাই হোক অত:পর রাজার নির্দেশে ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাহয়।

এবার এখানে এসেই কেমন বিষয় আর গল্প পুরো ঘেটে যায় তার কারণ পরে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্ট ধর্মের প্রাধান্য সৃষ্টি হলে গির্জা ভ্যালেন্টাইনকে ` `Saint’হিসেবে ঘোষণা করে। ৩৫০ সালে রোমের যে স্খানে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিলসেখানে তার স্মরণে সেখানে একটি গির্জা নির্মাণ করাহয়। অবশেষে ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পোপ গ্লসিয়াস ১৪ফেব্রুয়ারিকে `Saint Valentine Day’হিসেবে ঘোষণা করেন।

এবার ওনার কিংবা ধর্মের ব্যখ্যা হলো ভ্যালেন্টাইনের অন্ধ যুবতী মেয়েকে ভালোবাসার কারণে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পোপ গ্লসিয়াস ১৪ফেব্রুয়ারিকে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ ঘোষণা করেননি। কারণ, খ্রিষ্ট ধর্মে পুরোহিতদের জন্য বিয়ে করা বৈধ নয়। তাই পুরোহিতহয়ে মেয়ের প্রেমে আসক্তি খ্রিষ্ট ধর্মমতে অনৈতিক কাজ।তা ছাড়া, ভালোবাসার কারণে ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে যেতে হয়নি।

কারণ, তিনি কারারক্ষীর মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন কারাগারে যাওয়ার পর। সুতরাং, ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে নিক্ষেপ ও মৃত্যুদণ্ডদানের সাথে ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক ছিলনা। তাই ভ্যালেন্টাইনের কথিত ভালোবাসা সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে’র মূল বিষয় ছিল না। বরং ধর্মের প্রতি গভীর ভালোবাসাই তার মৃত্যুদণ্ডের কারণ ছিল।

এবার বিষয় হচ্ছে কি করে আমরা ভালোবাসা কে দূরে ঠেলে ফেলতে পারি! কারণ বিবাহকে  ভালোবাসার পরিণতি হিসেবেই যদি ধরি তাহলে ভ্যালেন্টাইন কিন্তু ভালোবাসার পরিণত দিতে গিয়েও অপরাধী হয়েছিলেন।তার মানে উনি ভালোবাসার পক্ষেই ছিলেন, আর যিনি ভালোবাসার পক্ষে থাকবেন তিনি যে ভালোবাসা অনুভব করবেন না কিংবা কারোর প্রেমে পড়বেন না সেটা হতে পারে না।

ভ্যালেন্টাইন সহানুভূতি দেখিয়ে ছিলেন নাকি ভালোবাসা সেটা নিয়ে বর্তমানে কারোর মাথা ব্যথা নেই কারণ আমরা এটাই মানি তিনি ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু শেষ পরিণত পান নি।তাই কোনো চাহিদা আর ভবিষ্যত ছাড়াও যে ভালোবাসা যায় সেটাই প্রমাণ করতে প্রতি বছর এই দিন ঘুরে ঘুরে আসে।

এবার আমরা ঠিক করবো আমাদের ভালোবাসা কেমন হবে। একটা মানুষ যে অন্যদের ভালোবাসার রূপ দিতে গিয়ে নিজেকে বিপদে ফেলেছে আর সেই আবার কোনো এক অন্ধ মেয়ে কে নিজের শেষ দিন গুলোতে নিজের সব প্রচেষ্টা ঢেলে দিয়েছে সুস্থ করেছে, বিনিময়ে তার থেকে কিছুই চায় নি এবার এই পুরো ঘটনা গুলোকে আমরা ভালোবাসার নাম দেবো নাকি সহানুভূতির সেটা আমাদের মন বলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *