মথুরাপুরের জবা কাহিনী

সুদীপ ঘোষাল

 

সুমন্ত ভট্টাচার্য শুধু একজন যোগ্য বিজ্ঞানী নন। তিনি একাধারে চিকিৎসক, সন্ধানী গোয়েন্দা আবার কিশোর মনো বিজ্ঞান পত্রিকার সহ সম্পাদক । তিনি এক বনেদী  পরিবারের সন্তান । পূর্ব বর্ধমান জেলার রায়না থানায় তার পূর্ব পুরুষ রা বাস করতেন ।

অই বংশের একাংশ আবার জলপাইগুড়ি তে বাস করতেন । কিন্তু কালের প্রবাহে কোনো কিছুই স্থির নয় । এখন কে কোথায় ছিটকে পৃথিবীর কোন জায়গায় আছেন তার সন্ধান করা সহজ কাজ নয় ।

জয়ন্ত দা বসে বসে এইসব ভাবছেন আর মনে মনে প্রার্থনা করছেন, যে যেখানেই থাকুন, তারা যেনো সবাই সুখে শান্তিতে থাকেন ।

হঠাৎ রত্না দি র ডাকে সুমন্ন্ত দার লুপ্ত চেতনা ফিরে এলো । দাদা বললেন , বসো  বসো আমি একটু আসছি ।

তারপর দুই কাপ চা এনে বললেন, দিদি চা খাও ।

দাদা চা খুব ভালো  করেন ।

দিদি বললেন, জয়ন্ত দা চা খুব ভালো হয়েছে ।

দাদা বললেন, ধন্যবাদ। তার পর কি খবর বলো ।

দিদি বললেন, গতকাল এক ভদ্রলোক ফোন করেছিলেন বেড়াতে যাওয়ার জন্য।

কোথায় ?

বীরভূম জেলার সাঁইথিয়া র কাছে মথুরাপুর গ্রামে । দাদা নতুন জায়গা দেখতে ভালোবাসেন । ব্যাগ পত্তর গুছিয়ে পরের দিন দুজনে হাওড়া রামপুর হাট  এক্সপ্রেস ট্রেনে চেপে বস লেন ।

ট্রেনে বসে জানালা দিয়ে   দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে যাওয়া অন্তরে এক অদ্ভূত অনুভূতির সৃষ্টি করে । এ রসে যে বঞ্চিত তাকে বোঝানো কঠিন । জয়ন্ত দা ,হৈমন্তী দি কে এই কথা গুলি বলছিলেন ।

দিদি বললেন, সত্য কথা । ট্রেন জার্নির স্বাদ আলাদা ।

তারপর বারোটার সময় ওনারা মথুরাপুর গ্রামে এসে গেলেন । পরেশবাবু ফোনে খবর পেয়ে আগে থেকেই তৈরি ছিলেন ।

জলটল  খাওয়ার পর পরেশবাবু দাদাও দিদিকে নিয়ে ময়ুরাক্ষী নদী দেখাতে নিয়ে গেলেন । নদীতে এখন বেশি জল নেই ।পায়ে হেঁটে ওনারা নদীর ওপাড়ে গেলেন ।

পরেশবাবুর ব্যবহার দেখে দাদা ও দিদি খুব মুগ্ধ হলেন ।

তারপর খাওয়া দাওয়া করে দুপুরে একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বিকালে গ্রাম ঘোরার পালা । কত কিছু দেখার আছে আমাদের দেশের গ্রামে । গাছপালা নদীনালা  এই নিয়েই আমাদের গ্রাম । কবিগুরু তাই বলেছিলেন, ” দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া … একটি ঘাসের শিষের উপর একটি শিশির বিন্দু “।

আমরা আজীবন ঘুরে বেড়াই, আনন্দের খোঁজে । আর এই আনন্দ হলো জীবনের আসল খোঁজ । কথা গুলি জয়ন্ত দা বললেন ।

দিদি পরেশ বাবু কে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করলেন । পরেশ বাবুও কথা বলে খুব আনন্দ পেলেন ।

তার পর রাতে খাওয়া বেশ ভালোই হলো । পরেশ বাবুর বিরাট জায়গা জুড়ে বাগান ।অনেক হিম সাগর আম । গাছের টাটকা আম । আর সাঁকিরের পাড় থেকে আনা দৈ আর রসগোল্লা । রসিক মানুষ জয়ন্ত দা । বললেন, পরেশবাবু কব্জি ডুবিয়ে ভালোই খেলাম ।

পরেশবাবু বললেন, আপনাদের খাওয়াতে পেরে আমি খুব খুশি ।

ভোরবেলা তখন চারটে বাজে । জয়ন্ত দার ঘুম ভেঙ্গে গেলো । পরেশবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, কি ব্যাপার এত কল রব কেন ?

পরেশবাবু বললেন, আর বলবেন না । আমার বাগানে অনেক জবা গাছ আছে নানা জাতের । কোনোটা লঙ্কা জবা, পঞ্চ মুখী , গণেশ জবা , সাদা জবা, ঝুমকো জবা ,খয়েরী জবা , লাল, ঘিয়ে জবা প্রভৃতি।

এখন একটা লাল জবা গাছে ঘিয়ে জবা হয়েছে । সবাই তাই ভোরবেলা পুজো দেয় । বলে  , ঠাকুরের দয়া । তাই এক গাছে দুই রকমের ফুল ।

দিদি দেখছেন প্রচুর মহিলা চান করে কাচা কাপড় পড়ে পুজো দিতে এসেছেন ।

দাদা বললেন , এদের বোঝাতে হবে ।এটা বিজ্ঞান নির্ভর ব্যাপার ।

দিদি বললেন , আপনারা শুনুন, এটা বিজ্ঞানের ব্যাপার ।

তখন মহিলাদের একজন বললেন, একথা বলবেন না দিদি । পাপ হবে ।

দিদি বললেন , পরাগ মিলনের ফলে লাল গাছের পরাগ রেণু ঘিয়ে গাছের পরাগ রেণুর সঙ্গে মিলিত হয় । এই কাজটি করে পতঙ্গ রা ।সংকারয়নের ফলে জটিল পদ্ধতি পার করে এইসব ব্যাপারগুলো হয় । সেসব বুঝতে গেলে আরও পড়াশুনা করতে হবে ।

আরেকজন মহিলা বললেন, কই আর কোনো গাছে তো হয় নি ।

দিদি বললেন, এত বড় বাগান ঘুরে দেখুন। নিশ্চিত দেখা যাবে ।

দাদা জানেন সবাই প্রমাণ চায় । প্রমাণ ছাড়া এদের কুসংস্কার মন থেকে যাবে না ।

দাদা ডাক লেন, আপনারা এদিকে আসুন । দেখুন এখানেও দুটি গাছে অই একই ঘটনা ঘটেছে।

সবাই ওখানে গিয়ে দেখলেন,  সত্য কথা তাই হয়েছে । লাল গাছে  ঘিয়ে জবা ।

দাদা বললেন ,মনে রাখবেন বিজ্ঞান অসম্ভব কে সম্ভব করে । বিজ্ঞান এর দৃষ্টি দিয়েই আমাদের সবকিছু বিচার করতে হবে ।

সবাই বুঝতে পারলেন এবং খুশি হয়ে বাড়ি চলে গেলেন ।

পরেশবাবু বললেন, এবার আপনাদের জন্য কফি নিয়ে আসি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: