মহিষ্মতী হয়ে অবন্তীনগর

রুদ্ৰেন্দু মণ্ডল

শিপ্রা এক্সপ্রেসে প্রায় একঘন্টা দেরিতে ইন্দোর পৌঁছে, সেখান থেকে ভাড়া গাড়িতে ৭৭ কিলােমিটার পথ পেরিয়ে ভাের ৪-৩০ মিনিটে পৌঁছলাম ওঙ্কারেশ্বর। সফরসঙ্গী আমার স্ত্রী, বন্ধু অখিল সিন্হা ও সঞ্জীব ঘােষ। এটি নর্মদার দক্ষিণতটের ছােট্ট জনপদ। উত্তরতটে ওঙ্কারনাথ মন্দির।

ভােরের আলাে তখনও নর্মদার স্রোত স্পর্শ করেনি। উঠলাম ‘ভক্তি নিবাসে’। সুন্দর বাগিচার সমারােহ নিবাসপ্রাঙ্গণে। রয়েছে অতীব সুন্দর একটি প্রার্থনা গৃহ। পরিচ্ছন্ন ভক্তি নিবাসে’ কুপন সিস্টেমে ভােজনের সু-বন্দোবস্ত। থাকা-খাওয়ার মূল্য যথােপযুক্ত। মা নর্মদার অদ্ভুত লীলায় ক্লান্ত শরীর আর উত্তেজিত মন। চাঙ্গা হয়ে উঠল।

 দ্বিধাবিভক্ত নর্মদার অন্য স্রোতটির নাম এখানে কাবেরী। তবে দক্ষিণ ভারতের যে কৃষ্ণা-কাবেরী নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়, সে কাবেরী এ নয়। এখানে কাবেরী সাতপুরা পাহাড় থেকে বের হয়ে ওঙ্কারেশ্বর পাহাড়কে প্রদক্ষিণ করে আবার এই ওঙ্কারেশ্বর-এর পাদদেশে নর্মদায় মিলিত হয়েছে।

নর্মদা ও কাবেরীর সঙ্গমস্থলে সৃষ্ট এই দ্বীপটি পবিত্রতম ‘ও আকৃতি পেয়েছে। তাই এই দ্বীপভূমির নাম ওঙ্কারেশ্বর। মান্ধাতার তপস্যায় ওঙ্কারেশ্বর-এর উদ্ভব। তাই নর্মদার বুকে জেগে ওঠা পর্বতের নাম ওঙ্কার মান্ধাতা। আবার কেউ বলেন বীরখােলা পাহাড়।

আমরা কথায় কথায় যে মান্ধাতা আমলের কথা বলি সেই পৌরাণিক সূর্য বংশীয় রাজা মান্ধাতার রাজ্যপাট নাকি এই দ্বীপেই ছিল। পিতা যুবনাশ্ব’র বাম পার্শ্বদেশ ভেদ করে নাকি এর জন্ম! পিতৃ অংশে জাত শিবভক্ত মান্ধাতা ছিল রাবণের বন্ধু। এই দ্বীপে শিবপুরী-ব্রহ্মপুরী-বিষ্ণুপুরীর চারদিকে নর্মদা প্রবাহিত।

গৌরীপট্টহীন স্বয়ম্ভ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ’র অন্যতম এই জ্যোতির্লিঙ্গটির প্রতিষ্ঠাতা রাজা। মান্ধাতা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বারােটি জ্যোতির্লিঙ্গ আছে। সেগুলি হল – (১) গুজরাট – সােমনাথ, (২) শ্রীশৈলম – মল্লিকার্জুন, (৩) উজ্জয়িনী – মহাকালেশ্বর, (৪) মধ্যপ্রদেশ – ওঙ্কারেশ্বর, (৫) দেওঘর – বৈদ্যনাথ, (৬) মহারাষ্ট্র – ভীমাশঙ্কর, (৭) তামিলনাড় – রামেশ্বরম, (৮) দ্বারকা – নাগেশ্বর, (৯) কাশী – বিশ্বেশ্বর, (১০) নাসিক – ত্র্যম্বকেশ্বর, (১১) উত্তরাখণ্ড – কেদারনাথ, (১২) ইলােরা – ঘৃষ্ণেশ্বর।

 সাত সকালেই সকলে মিলে সেতু পার হয়ে গেলাম বহুকাঙ্ক্ষিত ওঙ্কারেশ্বর দ্বীপের ওঙ্কারনাথ মন্দির দর্শনে। রাস্তার দু’ধারে স্থানীয় মহিলারা পুজোর সামগ্রী নিয়ে বসেছে। পূজারী, পাণ্ডা ও ভক্ত মানুষের সমাগম। নানা দেবাচারে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ।

স্তবপাঠ ও বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে আজীবন কুমারী নর্মদার অনাস্বাদিত কন্যা-পজন উপভােগ করলাম। শুরুতেই পঞ্চমুখী গণেশের মন্দির। অনেক উঁচু পাহাড়ের উপর ভীল। রাজাদের প্রাসাদ।

ছােট বড় বেশ কিছু মন্দির পার হয়ে গেছিলাম ওঙ্কারেশ্বর মন্দিরের প্রবেশদ্বারে। মন্দিরটি ১০১টি স্তম্ভের উপর নির্মিত, কিন্তু বাইরে থেকে তা বােঝা যায় না।

গর্ভগতে ঢােকার মুখে মণিময় কারুকার্য খচিত চারটি স্তম্ভ মনােমুগ্ধকর। গর্ভ মন্দিরের বাঁ-পাশে। রাজা মান্ধাতার মূর্তি। কালচে খয়েরি রঙের অমসৃণ গৌরীপট্টবিহীন স্বয়ম্ভ জ্যোতির্লিঙ্গ।অনতিদূরে শ্বেত পাথরে নির্মিত পার্বতীর বিগ্রহ। পাঁচতলা মন্দিরের প্রথমতলে বিরাজিত।

ওঙ্কারেশ্বর, দ্বিতলে মহাকালেশ্বর, ত্রিতলে মহাদেব সিদ্ধিনাথ ও সিন্দুর চৰ্চিত মহাবীরের মূর্তি। চারতলায় গুপ্তেশ্বর আর পঞ্চমতলে ধ্বজাধারী। মূল মন্দিরের অনেক নীচে ঢালু পথে প্রায়ান্ধকার গুহাতে শঙ্করাচার্যর তপােস্থলী।

 এবার নৌকোযােগে ফিরে এলাম দক্ষিণতটের অমলেশ্বর ঘাটে। ওঙ্কারনাথের প্রাচীন। মন্দিরটি ছিল এখানেই। প্রাচীন নাম অমলেশ্বর বা মণিমলেশ্বর। এখানেও পুজোপাঠ সমাপনান্তে দর্শন করলাম অন্নপূর্ণা ও মার্কণ্ডেয় আশ্রম। মার্কণ্ডেয় আশ্রমে বহু সাধু-সন্ত’র বাস দক্ষিণতট থেকে উত্তরতট যাওয়ার কংক্রিটের সেতুর ঠিক গায়েই সুবিশাল বিশ্বরূপ মূর্তি।

চত্বরে বহু সাধু-সন্ত’র আনাগােনা। বেশ কয়েকজন কঙ্কালসার তপস্বীকে বিভিন্ন মুদ্রায় তপস্যারত অবস্থায় দেখলাম। দুপুরে ফিরে এলাম ভক্তি নিবাসে। সন্ধ্যারতি দেখব বলে আবার ওঙ্কারেশ্বর মন্দির চত্বরে এসে বসলাম। মন্দিরে দীপ জ্বলে উঠল, আকাশে অসংখ্য তারা।

নীচে নর্মদার বুকে ভেসে চলেছে সহস্র দীপমালা। সারাদিনের ক্লান্তির পর থমকে দাঁড়িয়ে আছে খেয়া পারাপারের নৌকোগুলি। নিস্তরঙ্গ। নীল জলে দলছে দীপদোলা।

স্বচ্ছ জলে কম্পমান তার ছায়া, হাজার প্রতিবিম্ব। দু’পাশে পাহাড়ের বুক চিরে কোমর দুলিয়ে নৃত্যরতা উর্বশীর মতাে বয়ে চলেছে নর্মদা। এখানে নেই যৌবনের উদ্দামতা, নেই চপলতা। প্রথম যৌবনের উচ্ছলতা কাটিয়ে জলরূপী। শিবকন্যা অনেক সমাহিতা।

বড় শান্তভাবে একমনে বয়ে চলেছে। নির্মল আকাশে অগণ্য তারা মিটমিট করে হাসছে। আকাশ, মাটি আর নর্মদার দিগ্বলয় যেন মিলেমিশে একাকার। নদীর দু’পারেই ঘন ঘন নিনাদিত হচ্ছে নির্মদে হর’ আর শঙ্খধ্বনি। মৃদু নরম আলােয় আলােকিত হয়ে উঠছে চরাচর। মা নর্মদার আত্মসমাহিতা তপস্বিনী মূর্তি যেন দৃষ্টি ও হৃদয়ের নান্দনিক মহােৎসব। ।

 পরদিন কাকভােরেই ওঙ্কারনাথজীকে প্রণাম জানিয়ে চারজনই বেরিয়ে পড়লাম ১১ কিলােমিটার ব্যাপী শৈলদ্বীপ পরিক্রমায়। ভােরের সুবাসিত বাতাস গায় লাগিয়ে সেতু পেরিয়ে দ্বীপের দক্ষিণ দিক ধরে নীহারসিক্ত প্রত্যুষে আলাে-ছায়াতে হাঁটতে শুরু করলাম।

ঊষার অরুণ আলাে মিশে বিশ্ব চরাচরে ছড়িয়ে পড়ছে মেদুর স্পর্শ। সংকীর্ণ রাস্তায়। পর্বতের ঢাল ধরে উঁচু-নীচু পথ ডিঙিয়ে এক কিলােমিটার রাস্তা পার হয়ে পৌঁছলাম খেড়াপতি হনুমান মন্দিরে। গদাস্কন্ধে পবনপুত্র’র প্রসন্ন অবয়ব থেকে জ্যোতি ঠিকরে বের হচ্ছে। চোখে মুখে অমলধবল দীপ্তি। কাসর-ঘন্টা আর রামায়ণী স্তোত্রে ঘুম ভাঙছে মন্দিরের।

প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে চলি কেদারেশ্বর মন্দিরের দিকে। মহিষের পিছন দিক যেমন হয়, ঠিক তেমন দেখতে কেদারনাথের মূর্তি। কথিত আছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আত্মীয়-পরিজন। নিধনের পাপে দগ্ধ পাণ্ডবরা মহর্ষি বেদব্যাসের পরামর্শে পাপস্খলনের উদ্দেশ্যে গেলেন দেবাদিদেব দর্শনে। মহাদেব মহিষের ছদ্মবেশে লুকিয়ে বেড়ান কেদারখণ্ডে।

মধ্যম পাণ্ডব ভীম, দুই পর্বতে দ-পা দিয়ে মহিষরূপী শিবকে খুজতে থাকেন। ভীম লক্ষ্য করলেন। সকল মহিষ তার দ’ পার ফাক দিয়ে প্রতি সন্ধ্যায় বাসায় ফেরে। কিন্তু মহিষরূপী শিব। কিছুতেই ভীমের দু’পার ফাক দিয়ে পার হতে চান না। বুঝতে পেরে মহাবলশালী ভীম  

পিছন থেকে শিবরূপী মহিষকে জাপটে ধরে ফেললেন! মহিষরূপী শিব টুকরাে-টুকরাে। হয়ে ভেঙে গেলেন। পিছন দিকটা রয়ে গেল কেদারে। তুঙ্গনাথে বাহু, মদমহেশ্বরে নাভি, কঙ্গনাথে মুখ ও কল্পাতে জটা পড়ে রইল। তাই কেদারনাথের মূর্তির রূপ মহিষের পিছন দিকের মতাে।

সাত সকালে মন্দির চত্বর একেবারে ফাকা। সেবাইত আর ভক্তদের কর্মচঞ্চলতা। কখনও শুরু হয়নি। তাই ভক্তিভরে প্রণাম জানিয়ে আবারও এগিয়ে চলি। আরও এক কিলােমিটার পথ চলে পৌছলাম বহু কাঙ্ক্ষিত নর্মদা-কাবেরী সঙ্গমে। কাবেরী এখানে নর্মদার জলধারাকে আরও পুষ্ট করেছে, বেগবতী করেছে। পাহাড়ের বুক ফাটিয়ে কলকল। করে বয়ে চলেছে যুগ যুগ ধরে।

অবর্ণনীয় তার রূপ, তার কলস্বনা মূর্তি, তার খেয়ালীপনা। অপরূপাকে দেখে নিলাম দু চোখ ভরে। তৃপ্তির প্রাচুর্যে ভরে উঠল মন। অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে উঠেছে প্রাপ্তির ঝুলি।  প্রভাতী সূর্যর আলাে মেখে উঠেছে সকাল। প্রকৃতির বিশাল সৃষ্টির কাছে এ যেন ভক্ত’র সঙ্গে ভগবান আর নদী প্রকৃতির মহামিলন! সকলে পুণ্যস্নান করলাম এই সঙ্গমে।

মা নর্মদার পুজো দিলাম। পাত্র ভরে নিলাম জল, ওঙ্কারেশ্বর-এর মাথায় ঢালব বলে। একটু এগােতেই কুবের ভাণ্ডারী তীর্থ। লঙ্কাধিপতি রাবণ কুবেরকে পরাজিত করে তার সর্বস্ব লুট করেছিল। হৃদ-সর্বস্ব কুবের এখানে ব্রহ্মার তপস্যা করে আবার সমস্ত কিছু ফিরে পান।

অদূরে দেখলাম চব্বিশ অবতারের মন্দির।এরপর উত্তর-পূর্ব মুখে চললাম। পথে পড়ল মন্মথেশ ও এরণ্ডি মাতার মন্দির। এটি সতী অনসূয়া ও মহর্ষি অত্রির তপস্যাস্থল। বন্ধ্যা মহিলারা সন্তানপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে এখানে মানত করেন। চৈত্র মাসের একাদশীতে বিশেষ মেলা বসে।

চড়াই-উতরাই বেয়ে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পথ চলা। কিছুটা দূরে কয়েক ঘর স্থায়ী বসতি। কাঁচা-পাকা দু’রকম বাড়িই নজরে এল।  হঠাৎ একদল হনুমান পথ আগলে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে শুকনাে খাবার দিতেই ওরা। পথ ছেড়ে দিল। ওদের কাণ্ড-কারখানা দেখে মজা পেলাম। ঠিক যেন চাঁদা আদায়। পৌঁছলাম ঋণমুক্তেশ্বর শিব মন্দিরে।

এখানে ঋণমুক্তির অভিনব পন্থা। সেবাইতের মুখে শুনলাম – এই মন্দিরে পাঁচ পােয়া অড়হর ডাল অথবা সমমূল্য ধরে নিবেদন করলেই জীবনের সমস্ত ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়ার অভিনব বুজরুকির কথা।

বেশ কিছু ভক্তকে দেখলাম এই পথ অবলম্বন করে পার্থিব সমস্ত ঋণ থেকে মুক্ত হতে চাইছেন। মল। সেবাইত আমাদেরও প্ররােচিত করলেন, ঋণমুক্তির এহেন সুযােগ হাত ছাড়া না করার জন্য। মাতৃঋণ, পিতৃঋণ, দেশঋণ, দেবঋণ ও ঋষিঋণ এ তাে জন্মসূত্রে সকলেরই থাকে। এই পঞ্চঋণ কোনদিনই পরিশােধযােগ্য নয়। তাই এড়িয়ে গেলাম।

দেখলাম রণছােড়জী ওমুরলীমনােহর মন্দির। দুটিমন্দিরের কারুকার্য অতীব মনােহর। সকাল দশটা প্রায় বাজে। একগহ-সংলগ্ন অতি সাধারণ দোকানে চিড়ের পােহা সহযােগে প্রাতঃরাশ সেরে নিলাম। আরও আধঘন্টা উতরাই পথ বেয়ে পৌছে গেলাম অতি প্রাচীন ধ্বংসস্তুপের মাঝামাঝি।

বিরাট বিরাট চওড়া আধ ভাঙা পাথরের তােরণ। দেখে মনে হয় এ ধ্বংসাবশেষ কোনও রাজপ্রাসাদ অথবা দূর্গনগরীর। মান্ধাতা পুত্র মুচকন্দ শৈলদ্বীপের উপর এই প্রাসাদের নির্মাতা। পরে হৈহয় বংশ’র রাজা মহিৎ এই দুর্গনগরী অধিকার করেন। সমৃদ্ধশালী বিশাল নগরীর নামকরণ হয় মহিস্মতী ।

রেবা  নদী প্রকৃতির  আবেষ্টনীর মাঝে  আলো প্রাসাদ ও দুর্গশােভিত মহিষ্মতী ছিল অতি-সমৃদ্ধ। নারী। তবে পুরাতত্ত্ব বিভাগ এখনো  এর নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি । এই শৈলশহরই মহেন্দ্র পর্বত ও পরশুরামের তপস্যার স্থল।

চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবার গেলাম অর্ধনারীশ্বর গৌরী সোমনাথ মন্দিরে। এর প্রবেশ পথে কৃষ্ণ, গণেশ  -নদীকেশ্বর ভৈরব ও হনুমানের মূর্তি। আমরা চারজন ছাড়া কোনও লােকজন কোথায় নেই। নে। ঘন কুল অত্যুজ্জ্বল বিশাল শিবলিঙ্গ বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

 সকলে গল্প করতে করতে হাঁটছি। রংবেরঙের বােল্ডারের পথ। দু’পাশে বনস্থলীর অদুরে কানাদিনী সুনীল নর্মদা অন্তহীন আনন্দ লহরী হয়ে বয়ে চলেছে। পাহাড়ের ঢালে একদিকে বিg মন্দির আর একদিকে জৈন মন্দির। দুই মন্দিরের মাঝ বরাবর বয়ে যাচ্ছে। রাবণ নালা।

কিতকিমাকার রাক্ষুসে মূর্তি দণ্ডায়মান –এটি নাকি ভৈরব পত্নী মহাকালীর মুর্তি। সংস্কারবশত ‘ভৈরবের রক্তপিপাসা মেটাতে ভক্তগণ নাকি শিলাময় পাদদেশে ঝাপ দিয়ে আত্মাহুতি দিত। ১৮২৪ সালে আইন করে এই প্রথার বিলােপ করা হয়। সুদূর অতীতে এখানে নাকি নরবলির প্রথাও চালু ছিল।  হাঁটতে হাঁটতে এবার পোঁছলাম প্রাচীন সিদ্ধিনাথ মন্দিরে।

প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির ভেদ করে, দেওয়ালের ভিতর শিকড় চালিয়ে গজিয়ে উঠেছে প্রাচীন পিতামহ বটবৃক্ষ। ইতিহাসের সাক্ষী সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান বেশ কিছু শিল্পসুষমাণ্ডিত সুপ্রাচীন দেব-দেবী ও হাতির মূর্তি। গর্ভগৃহ’র দু’পাশে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত কারুকার্যমণ্ডিত বেশ কয়েকটি স্তম্ভ অবহেলায় দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছে।

খােলা আকাশের নীচে পূজিত হচ্ছে ওঙ্কার, মান্ধাতা, মুচকুন্দ, কার্তবীর্য’র মতাে প্রবল পরাক্রান্ত রাজাদের দ্বারা পূজিত শিবলিঙ্গ। কত শত শত পরিক্রমাকারী, সাধক, মুনি-ঋষিদের চিত্ত প্রসাদিত হয়েছে এদেরই নীরব দৃষ্টিতে। নেই সে রকম ভক্তসমাগম, নেই জাঁকজমক, নেই মন্দিরের ছাদ, নেই প্রসাদ ও নৈবদ্য’র।

ঘটা সমগ্র চরাচরে বিরাজিত অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। হঠাৎ দেখা হ’ল কলকাতা থেকে আগত কয়েকজন পরিক্রমাকারীর। পুরােহিতের অনুপস্থিতিতে ভক্তিভরে তারা নিজেরাই পুজো করলেন ও জল ঢেলে দিলেন। | ফিরে এলাম ওঙ্কারের মূল মন্দিরে।

সঙ্গমের বয়ে আনা জল ভক্তিভরে জ্যোতির্লিঙ্গ’র মাথায় ঢেলে দিলাম। সাঙ্গ হ’ল ওঙ্কারেশ্বর দ্বীপ পরিক্রমা। দুপুর ১২টা নাগাদ ভক্তি। নিবাসে ফিরে এলাম। জনবসতি ও দুর্গমতা কম হলেও এই পরিক্রমায় মাধুর্য যথেষ্ট। ওইদিনই দুপুর ২টো নাগাদ ১৪০ কিলােমিটার পথ পেরােন’র জন্য মােটরে করে রওনা দিলাম উজ্জয়িনীর উদ্দেশ্যে।

১৭৫০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত সিন্ধিয়াদের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী। স্বাধীনােত্তরকালে উজ্জয়িনী মধ্যপ্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। গন্তব্যে পৌঁছলাম সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ। মহাকাল মন্দির সংলগ্ন যাদব ধর্মশালায় উঠলাম। ব্যবস্থাপনা ভালােই।

ভাড়াও সাধ্যর মধ্যে। সন্ধ্যারতির সময় হয়ে এসেছে। তাই আরতি দর্শনের উদ্দেশ্যে। সােজা গর্ভগৃহ’র সামনে উপস্থিত হলাম। মারবেল পাথরে বাঁধানাে জ্যোতির্লিঙ্গীর কাছে। যাওয়ার পথটি রেলিং দ্বারা ঘুরে ঘুরে (ঘুরপাক খেতে খেতে) গােলকধাঁধায় ভরা। সময়ও লাগল বেশ।

 বিবিধ উপাচারে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় সন্ধ্যারতি দর্শন করলাম। এরপর রাত্রি ১০টায়। দেখলাম অভিনব শয়নারতি। সময়, কাল ও পরিবেশের পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই তবে উজ্জয়িনী মহাভারতীয় যুগে ছিল, কালিদাসের কালে ছিল, আজও আছে ভারতবর্ষ’র

নভিস্থানে। চমলের শাখানদী শিপ্রাতটি বিক্রমাদিত্যর রাজধানী ছিল, ছিল নবরত্ন’র উপস্থিতি । পরিচ্ছন্ন শহর, কোনও ট্রাফিক জ্যাম নেই। শিপ্রাতট ও মন্দির-সংলগ্ন এলাকায় ত কোনও পাণ্ডার উপদ্রব। এর প্রসিদ্ধি মহাতীর্থ রূপে। অতীতে এর নাম ছিল এত্তীনগর।

ব্যবসা বাণিজ্যে উন্নত ছিল এই শহর। এখানকার মূল্যবান মণিমুক্তো ও অন্যান্য দ্রব্য সামী শিচমী দুনিয়ায় রপ্তানি হ’ত। মল সড়ক থেকে একটু নিচুতে মহাকাল মন্দিরের অবস্থান। তলায় মহাকালেশ্বর শিব, উপরে ও কারেশার, তার উপর নাগচন্দ্রেশ্বর !

বিশ্বপ্রেমিক মহাকাল দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ’র অন্যতম এবং আকারে সর্ববৃহৎ। ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে কর্তিত সতীর কনুই পতিত হয়েছিল এখানে। সপ্তপুরীর এক পুরী উজ্জয়িনী। দর্শন, স্পর্শন ও আলিঙ্গনে কোনও বাধা নেই।

মহাকালেশ্বর কী জয়’, ‘দেবজী কী জয়’ ধ্বনিতে মুখরিত গর্ভমন্দির। আকাশ, বাতাস অনুরণিত হয়ে ওঠে সেই ধ্বনিতে। ১২৩৫ সালে উজ্জয়িনীকে প্রায় শ্মশানে পরিণত করেছিল দিল্লির সুলতান ইলতুৎমিস।

 ধর্ম আর ইতিহাস নিয়ে এই অবন্তীনগর। সম্রাট অশােক থেকে গুপ্ত রাজারা, বিক্রমাদিত্য থেকে পারমার রাজারা, মােগল থেকে সিন্ধিয়ারদের রাজধানী ছিল এই উজ্জয়িনী। মন্দিরের পাশেই কোটিতীর্থ নামে বিশাল কুণ্ড।

এই কুণ্ড’র জলেই। মহাকালেশ্বর-এর নিত্য পুজো হয়। মন্দিরটি ব্যাপক সংস্কার হয়ে নবরূপে সজ্জিত হয়েছে। পার্বতী, বড় গণপতি, কার্তিক, ঋদ্ধিনাথ ও সিদ্ধিনাথ সহ বহু দেব-দেবীর মূর্তি এখানে। বিরাজ করছে।

শহর থেকে সাত কিলােমিটার দা ভর্তৃহরি গুহা দেখতে গেলাম। বিক্রমাদিত্য’র। বৈমাত্রেয় ভাই ভর্তৃহরি রাজ্যপাট ছেড়ে এই গা-ছমছমানি সংকীর্ণ গুহাতে সাধনা করেন। কালিদাসের বরদাতা দেবী গড়কালিকা’র মন্দির এর পাশেই। এই ভর্তৃহরি গুহা নাথ।

সম্প্রদায়-এর মহান তীর্থ। আরও এক কিলােমিটার দূরে কালিয়াদহ প্যালেস। মাণ্ডুর। রাজা নাসিরুদ্দিন খিলজীর পারদ খাওয়ার নেশা ছিল। পারদের নেশায় গরম শরীরকে ঠাণ্ডা রাখার জন্য জলমহলে আসতেন। চলত হই-হুল্লোড় আর নাচ-গান। মােগল সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীর-এরও যাতায়াত ছিল এখানে।

 শহর থেকে তিন কিলােমিটার দূরে কৃষ্ণ-বলরাম ও সুদামার স্মৃতি-বিজড়িত সন্দীপন। আশ্রম। কৃষ্ণ-বলরাম ও সুদামা যুদ্ধবিদ্যা সহ শাস্ত্রাধ্যায়ন করতেন এখানে। দেখলাম। শিপ্রা, গন্ধবতীও কালিকা নদীর সঙ্গমে হরসিদ্ধি মন্দির। দেখলাম পারমার রাজা ভদ্রসেন নির্মিত তন্ত্রসাধনার অন্যতম পীঠস্থান কালভৈরব মন্দির।

এখানে পুরােহিতের হাতে কালভৈরবের সুরাপান বিস্ময় উদ্রেক করে। মণ্ডা-বাতাসা-নকুলদানার পরিবর্তে দোকানে বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের দেশী-বিদেশী মদ। এখানকার প্রধান অর্ঘ্য হ’ল কারণবারি’ যেমন, রাম, হুইস্কি, স্কচ, ভদকা ইত্যাদি।

 আমরা ২৫০ মিলি দেশী মদ কিনলাম। পুরােহিত একটি পাত্রে সেই মদের অর্ধেকটা ঢাললেন। তারপর পাত্রস্থ মদ কালভৈরবের মুখের ফাকে ঠেকিয়ে ধরতেই তা নিমেষে ভিতরে চলে গেল। পুরাে ব্যাপারটা রহস্যময় রয়ে গেল আমাদের কাছে।

মদ কোথায় গেল প্রশ্ন করতেই, পরােহিত জানালেন, অতীতে ব্রিটিশরা অনুসন্ধান করেছিল এই রহস্যভেদ করার জন্য। কিন্তু কোনও সুড়ঙ্গ বা অন্য কিছু হদিশ করতে পারেনি। আমরা ইচ্ছে করলে এই ব্যাপারে খোঁজ-খবর করতে পারি। যাই হােক, বােতলের অবশিষ্ট মদ

পুরােহিত প্রসাদ হিসেবে আমাদের ফেরত দিলেন। এই কালভৈরব উজ্জয়িনী নগরের দ্বাররক্ষী। আমাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অটো-ড্রাইভার ভৈরােগড় গ্রামে স্থানীয় লােকদের তৈরি করা কাপড় কেনার জন্য পীড়িপীড়ি করল।

অনতিদূরেই মঙ্গলনাথের মন্দির ও যন্তর-মন্তর। রামঘাটের অদূরেই বিক্রমাদিত্যর আরাধ্যা দেবী হরসিদ্ধি মাতার মন্দির। এখানে সতীর বাম কপাল পড়েছিল। টানা চোখ, সিন্দুরে চর্চিত মা অন্নপূর্ণার অবয়ব। দু’পাশে লক্ষ্মী আর সরস্বতী বিরাজমান।

এখানে পর্ণ স্নান ও পুজো দিলাম। সন্ধ্যায় হাজার হাজার দীপদান প্রত্যক্ষ করলাম। মারাঠাশৈলীতে তৈরি দীপস্তম্ভ। পাশাপাশি দুটি উঁচু মিনারে হাজারসংখ্যক প্রদীপে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে অগ্নিসংযােগের ধ্রুপদী কলাকৌশল বেশ রােমহর্ষক। এরপর দেখলাম ওঙ্কারের ঘাট, কালভৈরব ঘাট, ঋণমুক্তেশ্বর ঘাট। প্রতিটি ঘটেই দীপদান ও সন্ধ্যারতিরআয়ােজন মনােমুগ্ধকর।

সন্ধ্যার অব্যবহিত পরেই যাদৰ ধর্মশালায় ফিরে এলাম।  ভাের চারটেয় বহু কাঙ্ক্ষিত ভষ্মরতি দেখব। তাই এখন বিশ্রামের প্রয়ােজন। শিৰ এখানে দূষণ নামে এক দৈত্যকে এক নিঃশ্বাসে ভয় করেছিলেন। দূষণ উজ্জয়িনীর ব্রাহ্মণদের পুজো-পাঠে বাধা দিত ও নানা অত্যাচার করত। ভষ্মরতি দর্শনের জন্য। আগেই পরিচয়পত্র-সহ আগাম বুকিং-এর ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম।

খুব সামনে থেকেই এই বিরল দৃশ্য দেখব বলে রাত্রি ১২টার আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এই মন্দিরে প্রবেশের জন্য পুরুষদের ধুতি ও মহিলাদের শাড়ি পরার নিয়ম আছে। মােবাইল ক্যামেরা ও অন্যান্য জিনিষ নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ নিষেধ আছে। 

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর গেট খুলতেই সারিবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে মন্দিরে প্রবেশ করলাম। প্রথমে জ্যোতির্লিঙ্গর মাথায় কোটিতীর্থর জল ঢাললাম। তারপর বাবাকে স্পর্শ ও আলিঙ্গন করলাম একে একে। এরপর আগেভাগে বসার আসন গ্রহণ করলাম যাতে ভষ্মরতি ভালােভাবেদর্শন করা যায়।

বাবার গান ওঅঙ্গসজ্জা চলল বেশকিণ। চলল অভিনব শৃঙ্গার আরতি। তারপর অঘােরী পুরােহিতরা চিতাভয় উড়িয়ে উমর, কাঁসর-ঘন্টা ও বিবিধ বাদ্যযন্ত্র সহযােগে মহাকালেশ্বর-এর অভূতপূর্বভঘারতিকরলেন। আগে জ্যোতির্লি’রউপর চিতাভষ্ম সরাসরি মাখানাে হত।

কিন্তু এতে এই অমূল্য লিঙ্গর ক্ষতি হয়। তাই মহামান্য আদালতের নির্দেশে বর্তমানে জ্যোতির্লিঙ্গর উপর চাদর চাপিয়ে তার উপর চিতাভষ্ম লেপন করা হয় ও ওড়ানাে হয়।  উত্তর-প্ৰবাহিনী শিপ্রার রামঘাটে প্রতিবারাে বছর অন্তর জাঁকজমকেরসঙ্গেকুম্ভমেলার।

আয়ােজন হয় চলে পুণ্যস্নান। উজ্জয়িনী নগর উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে শিপ্রানী দ্বারা। বেষ্টিত। সমুদ্র মন্থনে উৎপন্ন অমৃত কুণ্ড থেকে অমৃত পড়ে যে চার জায়গায়, সেগুলি ইল। এলাহাবাদের প্রয়াগ, হরিদ্বার, নাসিকের গােদাবরীতট আর রামঘাটের শিপ্রাতট।

মন্থনের গরল পান করে মহাদেব হলেন নীলকণ্ঠ। মন্থনে উঠে আসা চন্দ্র শােভা পেতে থাকে। মহাদেবের মস্তক-শীর্যে। আর সেই নীলকণ্ঠ মহাদেব হলেন চন্দ্রশেখর।  মহিষ্মতী থেকে অবন্তীনগরের অপরূপ মাধুর্যে মধুময় হয়ে শিপ্রা এক্সপ্রেস ধরে ঘরে  ফিরলাম।

 

 

 

বাক্প্রতিমা সাহিত্য পত্রিকা থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: