মাইক্রোফোন সম্পর্কে জানতে হবে – জগন্নাথ বসু

sahitysmritiআবৃত্তি কেন করব ? কেন কবিতা পড়ব? ভাবছেন হয়তাে জগন্নাথ বসু নিজে এক কবিতা প্রেমিক হয়ে এ ধরনের কথা বলছেন? হ্যাঁ, বলতে হবে। নিজের কাছে নিজের ক্লারিফিকেশনটা অবশ্যই দরকার।একটা উঠতি বয়সের ছেলে বা মেয়ে কেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়া অভিনেতা, অভিনেত্রী এসব গ্ল্যামারাস নানা ধরনের পেশা ছেড়ে আবৃত্তিতে মনােনিবেশ করতে এখানেই আমার প্রশ্ন। এক্ষেত্রে আমাকে যদি কেউ এই প্রশ্নটা করত, আমি উত্তর দিতাম“কবিতা আমার ভালাে লাগে। এটাকে পেশা করব তা তাে আমি বলিনি।”

হ্যাঁ, এটাই আমি বােঝাতে চাইছি। কী জানেন, একজন আপনার যদি কবিতাই ভালাে না লাগে আপনি কী করে তাকে আত্মস্থ করবেন ? তাই কবিতাকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কেউ সেভাবে দেখে কিনা আমি জানিনা, কিন্তু এটা দরকার। সকল আবৃত্তিকারের পক্ষে তাে বটেই। দেখুন, যে নবীন, সে ভালাে-খারাপ। বুঝবে না, তার দরকার সব ধরনের কবিতা পড়ে যাওয়া, কারণ এই পড়ার মধ্যে দিয়েই কবিতা আর শিল্পীর ভাবের আদান-প্রদান হয়। লক্ষ্য করে দেখবেন, এমন কোনও কবিতা, বা এমন কোন গল্প-উপন্যাসে এমন কিছু কথা বলা থাকে—যা মনে হয়, আমাদের কথা বলছে। কেন মনে হয় এসব? কারণ এখানেই ভাবের বিনিময় ঘটছে লেখক আর পড়ুয়ার মধ্যে, হােকনা সে লেখা এক যুগ আগের।

সেই লেখককে তাে আরও আধুনিকই বলা চলে। যিনি এক যুগ পরেও আমার মনের কথাই বলছেন। এই ব্যাপারটাই আমি বলতে চাইছি। তাই আত্মস্থ করতে গেলে সেই বিষয়টার ওপর জোর দিতে হবে। নচেৎ পারবেন না। আর এর সঙ্গে চাই মনের গভীরতা। কবিতার মধ্যে ডুবে যাওয়া। একটা কবিতা পড়লেন, দেখুন কী বলতে চাইছেন কবি। সেটাই আপনি বলুন মনে করুন আপনিই লিখেছেন কবিতাটাকে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখুন। সার্থকতা আসবে সেখানেই। যখন আপনি এরকম ভাবতে আরম্ভ করবেন, তখন দেখবেন কবিতা আপনার সঙ্গে কথা বলছে, আপনি খালি ঠোট নেড়ে চলেছেন।

‘ যে কবিতাই পড়বেন প্রথম একবার, দুবার ধীরে, মনে মনে পড়ুন। এরপর জোরে জোরে পড়া শুরু করুন। উচ্চারণ করে বলতে শুরু করুন কবিতা।নিজের মনেই শুনুন প্রতিটা কবিতার লাইন। দেখবেন অনেক ভুলভ্রান্তি সব শুধরে যাবে। সঠিক উচ্চারণই আপনি করতে পারছেন। নিজেই নিজের শিক্ষক হয়ে উঠেছেন। এটা কিন্তু শুধু আবৃত্তির ক্ষেত্রে নয়, সবক্ষেত্রেই খাটে। নির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন না করলে কখনই যে কোনােও দিকে বড় হওয়া যায় না, সম্ভবও নয়। তাই এসব অনুশীলন অত্যন্ত জরুরি।

একজন আবৃত্তিকারের ছন্দবােধ থাকা জরুরি। সব কবিতারইনির্দিষ্ট ছন্দ থাকে। জানেন কি কবিতার মধ্যেও নানারকম তাল থাকে? এবার একজন আবৃত্তিকারকে সেই তাল ধরতে জানতে হবে। এটা একটা প্রসেস। এই প্রসেসের মধ্যে দিয়েই সব শিখতে হয়। তাল জ্ঞান বা ছন্দবােধ থাকা জরুরি । এগুলাে কোনওটাই  কিন্তু কোনও মান্রষ জন্ম থেকেই বহন করে না ।  এসবই মানুষকে অর্জন কর থাকতে হয় এবং এটাই সাধনা বা স্ট্রাগল যাই বলুন ।

এই ধারণাটা থাকতে হবে যে  আমি ঠিকই বলব । বলববলব করলে দেখবেন , কোথায় যেন একটা হিসাবে গল্ডগোল হয়ে গেল । যেমন কেউ যদি প্রথম চশমা পরে তখন তার মনে হয় কিছু যেন একটা পরে আছি। তারপর আস্তে আস্তে চশমা পরার অনুভূতিটাই হারিয়ে যায় । আমি যে চোখে কিছু পরে  আছি সে বােধই থাকে না। ঠিক সেরকম ভুল বলছি না তো , ঠিক বলছি তো – এই চিন্তা যদি করতে থাকেন, তা বলে স্বাভাবিক ভুলই হবে । এই কিন্তু কিন্তু অস্বস্তিটাকেই কাটিয়ে উঠতে গতি হবে  । স্বতোৎসারিত হয়ে যখন আপনি কবিতা পাঠ করতে পারবেন, জানবেন তখনই আপনার সিদ্ধিলাভ হল ।

কবিতা  লেখা আর কবিতা পড়া— দুটো জিনিস কিন্তু এক নয়। বম্বেতে মানে মহারাষ্ট্র বঅন্যান্য স্টেটে কবিরাই তাদের কবিতা পড়েন। আর তাদের শুনে শুনে শ্রোতারাও ~কে কিন্তু আমাদের পশ্চিমবঙ্গে আবৃত্তিকার বলে একটা আলাদা শ্রেণি আছে। যারা বা নেকেই কবিতা লেখেন না কিন্তু ভালাে করে কবিতাটা পাঠ করেন। আমাদের এখানেও কবি নিজেরা নিজেদের কবিতা ভালাে করে পাঠকরতে পারেন। যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত ও জয় গােস্বামী ভালাে পাঠ করেন।

আবার অনেক কবি আছেন যারা ভালাে লেখেন, কিন্তু তাঁদের রচনা পরের মুখেই শােভা পায়। সেক্ষেত্রে কবির ভাবটা নিজের মধ্যে লাগান।কবির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কবিতাটা দেখতে হবে। একজন কবির মধ্যে রসবােধ, কল্পনাশক্তি থাকবে, ঠিক তেমনি একজন আবৃত্তিকারের মধ্যেও এগুলাে থাকবে বা থাকতেই হবে। সুর করে করে অনেকে পড়েন, সেটা হাস্যকর নয়। হয়তাে ওই কবিতাটির ওইটাই ছন্দ। সেটা বুঝতে

আবৃত্তিশিল্পীদের আরেকটা গুণ করায়ত্ত করতে হয়, সেটা হল Modulationও Speech পরিবর্তন করা। সেটা আবার হতে হবে খুব স্পষ্ট নিয়মে। একটা কবিতা দেখে বুঝতে হবে তার Tune টা কী হবে। কোনটা ফিসফিস করে, কোনটা ঘােষণার টানে, কোনটা মাঝের স্বরে। এটা বােকার ব্যাপার। আর ঠিক সেক্ষেত্রে এটাকে প্র্যাকটিস করতে হবে। এই জিনিসটা যদি কেউ আত্মস্থ করতে না পারে তবে তার আর আবৃত্তি করে লাভ নেই। কবিতার ডিমাণ্ড অনুযায়ী স্বরকে ওনাে নামাননা করতে হয়।

প্রত্যেক মানুষের গলায় কিন্তু জাদু আছে। সেই জাদুটাকে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারে না। নচেৎ বিভিন্ন লােকের সঙ্গে কথা বলার সময় গলার টোন কেন পরিবর্তন হবে বলুন তাে? হওয়া উচিত নয়। ঠিক সেইরকমই, একটা কবিতা সেটা যদি প্রেমের কবিতা হয়, তার বলার কায়দা হবে ফিসফিস করে। অবশ্য তার মধ্যেও কোথাও উঁচুতে স্বর ওঠে। কিন্তু বুও বেশির ভাগটাই হবে নিচ স্বরে সেখানে উঁচ স্বর মানাবে না। আবার বিদ্রোহের কবিতায় সমসময়ই থাকবে চড়ায়। ওই চড়াতেও Modulation আবার আনতে হবে। বৈচিত্র্য না। ‘

কোনাে জিনিস ভালাে লাগে! আপনার নিজস্ব স্টাইল তৈরি করতে হবে। যেটা বহন করবে নচেৎ ওই প্যানপ্যানানিতে দর্শক শ্রোতা অসহ্য মনে করবে আপনার কে।তবে স্বর বৈভিন্ন্য খুব কঠিন কাজ নয়। নিরন্তর চেষ্টার দ্বারাই হয়ে থাকে। সেটা আপনাকেই চালিয়ে যেতে হবে। কবিতার মুডটা বুঝে বুঝে স্বরের ওঠানামা প্র্যাকটিস করবেন । .

ভালাে শিল্পীর অভাব পশ্চিমবঙ্গে আছে বলে আমার মনে হয় না। সবাই হয়তো  বিপণনটা ঠিকমতাে বােঝেন না। দেখবেন প্রত্যন্ত গ্রামেও অনেক প্রতিভা আছে। হয়তাে আমরা পাই না। তবে প্রচুর নতুন প্রতিভা তাে উঠে আসছে। তাদের তলেও পুরনােদেরই।

আমি যে সব চর্চার কথা বললাম ধরুন সেগুলাে আপনি করলেন, তৈরি, এবার পরিবেশন। সেখানেও মাইক্রোফোন নিয়ে দুটো কথা বলব। যে কোনাে অবহিত ক্ষেত্রেই মাইক্রোফোন ভালাে হওয়া দরকার। আবৃত্তি শিল্পীদেরই দেখতে হবে যে মাইক্রোফোন অমনি / বাইনা ইউনি ডিরেকশনে থাকবে। কারণ এক একটা ডিরেকশনের ওপর কিন্তু গলার ভয়েজ নানা রূপ নেয়। এ

বার ধরুন মাইক্রোফোন আপনার মুখের সামনে। এবার আপনি প/ক যদিবলেন তখন দেখবেন শ্বাসবায়ু গিয়ে মাইক্রোফোনে ধাক্কা মারছে। সেটা নিশ্চয়ই কাম্য নয়। এবার দরুন মাইক্রোফোনে আপনার মুখটা লেগে গেল বাআপনি ইচ্ছা করেইমুখ লাগিয়ে কথা বলছেন, লক্ষ্য করবেন, কেমন একটা মেটালিক আওয়াজ হচ্ছে। সুতরাং এই যে ভাল আবৃত্তিকার হওয়ার এত ভাল ভাল টিপ দিলাম, সেই প্রস্তুতিটাই মাঠে মারা যাবে। একটার সঙ্গে তাে একটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।

ছন্দ আয়ত্ত করা, বােধ জাগানাে, উচ্চারণ স্পষ্ট করা, তেমনি স্বরান্তরের ক্ষেত্রেও হতে হবে একজন দক্ষ শিল্পী। কারণ এটা হলে তাে আপনার খাটনিটাই জলে। একজন ভালাে রাঁধুনি যদি সুন্দর রান্না করে, কিন্তু পরিবেশনের সময় দেখা যায় তার থালা-গ্লাস ননাংরা, কে খেতে চাইবে সেই সুন্দর সুন্দর খাবারগুলাে ! সুতরাং এসব করে লাভ নেই, একটা যে একটার সঙ্গে জড়িত, সেটা বােঝা দরকার, নইলে শ্রোতার অন্তরে পৌঁছানাে হবে দুঃসাধ্য।

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা // সম্পাদনা : স্বপন নন্দী // যোগাযোগ : ৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: