মাতৃসমা শ্রীতমা  – শ্যামল কুমার রায়, সহ শিক্ষক, 

             প্রথম পর্ব   sahityasmriti

             বছরটা ছিল ১৯৭৮ , সারা রাজ্যে বানবন্যা,  জনজীবন এক প্রকার বিপর্যস্ত । গোবর্ধনপুর গ্রামে পঞ্চানন চ্যাটুজ্জের ঘরে একটা  শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে এল । ধাইমা, কুন্তীপিসি মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠল, পঞ্চুর ফুটো কপাল । এত অভাবের মধ্যে শেষকালে ঠাকুর মেয়ে দিলে? তবে, এটুকুই যা রক্ষে, মেয়ের যেমন রং, তেমনি মুখশ্রী । ঠিক যেন মা দুগ্গা ।  জমিদার গিন্নী কুলপুরহিতের মেয়ের মুখ দেখতে এসে নাম দিলেন শ্রীতমা ।
আর প্রথম মুখ দেখলেন একটা মোটা সোনার সীতা হার দিয়ে । পঞ্চাননের অভাবের সংসার , রোজগার বলতে কিছূ নিত্যসেবা , আর গ্রামের কয়েকটা ছোটখাটো বেদী ধরা আছে। ওরই মধ্যে সুরাহা বলতে কোলকাতায় থাকা জমিদার জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ  রায়চৌধুরী  বাবুর বাড়ির নারায়ণের নিত্যসেবা ও বার্ষিক দুর্গা পুজো করে কিছু রোজগার হয়।
বাবুরা নিত্যসেবা করার জন্য কয়েক বিঘা জমি দেবোত্তর হিসাবে দিয়ে ছিল । ভরসা বলতে ঐটুকুই। রায়চৌধুরী বাবুর এক ছেলে, নাম সংলাপ, বছর পাঁচেক বয়স।
ওনার স্ত্রী, দেবিকাদেবী , অত্যন্ত ধার্মিক, সাধ্বী মহিলা । ঠাকুরমশাই পঞ্চানন চ্যাটুজ্জে কে দাদা বলে সম্বোধন করেন । পঞ্চানন চ্যাটুজ্জে কে সম্মান দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ আসলে, জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ বাবু ও দেবিকা দেবী বিয়ের বেশ কয়েক বছর পর ও নিঃসন্তান ছিলেন ।
তখনই ঐ পঞ্চানন চ্যাটুজ্জে রায়চৌধুরীবাবুর স্ত্রী কে বলেন যে আপনার বাড়িতে মা দুর্গা আসেন, প্রতিবার, আপনি মায়ের কাছে মানত করুন যে আপনার কোল আলো করে সন্তান এলে আপনি দুর্গা পুজোয় কাঙালী ভোজন করাবেন ।
জমিদার বাড়ির জাগ্রত মা স্বকানে প্রার্থনা শুনেছিলেন। মা স্বপ্ন দিয়ে দেখা দিয়ে সাধ্বী দেবিকাদেবীর সাথে কথা বলে যান, তোর পুত্র সন্তান হবে । পরের বছর দুর্গা পুজোর আগে জমিদার গিন্নীর কোল আলো করে পুত্র সন্তান জন্ম নিল ।
মায়ের আশীর্বাদে ছেলে হয়েছে। ঠাকুরমশাই পথ দেখিয়েছিলেন । তাই দেবিকাদেবী ছেলের নামকরণ ঠাকুরমশাই এর কাছে করাতে চান । যেহেতু মা দুর্গা দেবিকাদেবীর সাথে কথা বলেছিলেন, তাই ছেলের নাম হল , ‘ সংলাপ ‘ ।
                                      রায়চৌধুরী পরিবারে অভাবী পঞ্চানন চ্যাটুজ্জের সম্মানের ঘাটতি নেই । ঠাকুরমশাই দেবিকাদেবী কে বৌদি বলে ডাকেন । আর জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী বাবু কে দাদাবাবু বলে ডাকেন।
ঠাকুরের কৃপায় পঞ্চানন চ্যাটুজ্জের সংসার মোটামুটি চলে যায়। আর জমিদার গিন্নী অর্থাৎ পঞ্চাননের বৌদি এমন ভাবে সাহায্য করেন মনে হয় যেন নিজের বড় বৌদি ভালোবেসে দিয়েছেন। অসম্মানের কোনো জায়গা থাকে না ।
                                    শ্রীতমা ও আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছে। কিন্তু, গোবর্ধনপুরে কোনো উচ্চ বিদ্যালয় নেই। শ্রীতমা কে মানুষের মত মানুষ করার ব্যাপারে দৃড় প্রতিজ্ঞা পঞ্চানন । তাই চার কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ইন্দ্রপুর হাই স্কুলে বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে । পঞ্চাননের মা সেকেলে মানুষ । দিবারাত্রি এক কথা – পঞ্চুর একটা ছেলে হোক। বামুনের বাড়ি ।
বংশ রক্ষার ও তো দরকার আছে। শ্রীতমা ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠল , আর ওর ভাই ঋতম হল। সাধারণ ঘর, পাঁচজনের পাঁচ পাত থেকে একটু আধটু করে কমিয়ে নিয়ে ঋতম ও বড় হতে লাগল ।      জমিদারের ছেলে, সংলাপ শ্রীতমার থেকে মাত্র এক বছরের বড় ।
তাই পিঠাপিঠি বলাই যায় । পঞ্চাননের সঙ্গে জমিদার বাড়িতে প্রায়ই আসে, শ্রীতমা । শৈশবের পুতুল পুতুল খেলা, সংসার ভাঙাগড়ার খেলা, লুকোচুরি খেলার মাঝেই, ওরা একে অপরের ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল ।
সহ শিক্ষাযুক্ত ইন্দ্রপুর হাই স্কুলে ও নিছক বন্ধুত্বই ছিল । যেহেতু সংলাপ , শ্রীতমার চেয়ে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে, সংলাপের সব বইগুলোই পরের বছর আবার শ্রীতমা পড়ে । শ্রীতমার বড়মা , দেবিকাদেবীর কৌশলী বুদ্ধিতে সকলেই কাত ।
তাই, পঞ্চাননদাকে , তার বৌদি বলেন যে সংলাপের বইগুলো শ্রীতমাই পড়ুক । আর পুরোনো বই হিসেবে বিদ্যাকে বিক্রির বিরোধী আমি । মনে মনে পঞ্চাননবাবু খুব ভালো করেই বোঝেন যে বৌদি, তাকে সাহায্য করলেন।
শ্রীতমা হেঁটে, আর সংলাপ সাইকেলে  ইস্কুলে যায়। বন্ধুত্ব গাড় হতে লাগল ধীরে ধীরে । তখন স্কুল থেকে রোজ শ্রীতমা কে চাপিয়ে বাড়ি ফিরত। আর ইস্কুল যাবার সময়ে পথে দেখা হয়ে গেলে সাইকেলের পিছনে চাপিয়ে নিত।  এই ভাবেই দুজনেই কয়েক বছর চলে গেল । নিন্দুকে ঠাট্টা করে বলত, ” পঞ্চানন চ্যাটুজ্জে খুব বুঝে শুনেই মেয়ে কে জমিদারের ছেলের সাথে ভিড়িয়ে দিয়েছে ।
সংলাপ মাধ্যমিক পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি হল। জমিদার জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী ও দেবিকাদেবী ঠিক করলেন , সংলাপ রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেলে থাকবে ঠিকই ; কিন্তু মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং এর কোচিং ও তদারকির জন্য নরেন্দ্রপুর এর কাছাকাছি থাকা দরকার । যেমন ভাবনা, তেমন কাজ । গড়িয়া বাজারের কাছে বাড়ি কিনে কোলকাতাবাসী হলেন।

                  দ্বিতীয় পর্ব 

         ঠিক পরের বছরই শ্রীতমা মাধ্যমিক পরীক্ষায় চোখ ধাঁধানো রেজাল্ট করল । মানুষের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা, আশীর্বাদ এ ভেসে যেতে লাগল চ্যাটুজ্জে বাড়ি । কিন্তু, পঞ্চাননের চিন্তা এর পর মেয়েকে কি ভাবে কোথায় পড়াব ? তবে কৃতঘ্ন নয় পঞ্চানন ।
শ্রীতমা কে সঙ্গে নিয়ে সটান হাজির গড়িয়াতে বৌদিমণির বাড়ি। ঘটনাঘটনাচক্রে, সেদিন ছিল শনিবার । তাই বিকেলে হোস্টেল থেকে বাড়িতে এল সংলাপ । নিপাট ভালো মানুষ পঞ্চাননদা ও কন্যাসমা শ্রীতমা কে কাছে পেয়ে, নিঃসঙ্গ শহুরে জীবনে শুধুমাত্র সংলাপের জন্য থেকে হাঁপিয়ে ওঠা, দেবিকাদেবী হাতে যেন সোনার চাঁদ পেলেন। দেখে কেউ বলতে পারবে – যে বৈষয়িক দুনিয়াতে পঞ্চানন চ্যাটুজ্জে কুলপুরহিত ছাড়া আর কিছুই নয়।
কিন্তু, যেখানে হৃদয়ের টান, অকৃপণ কৃতজ্ঞতায় একে অপরের কাছে চির ঋণী, সেখানে নিষ্কলুষ ভালোবাসা ও আতিথেয়তা বাঁধ মানে না । সন্ধ্যেতে, সংলাপ, শ্রীতমা কে সঙ্গে নিয়ে একটু শহর দেখাতে নিয়ে এল । কল্লোলিনী কোলকাতা থেকে বহু দূরে গোবর্ধনপুরে থাকা শ্রীতমার চোখে যেন ঘোর লেগে গেল ।
সংলাপ, শ্রীতমা কে নিয়ে একটা পাঁচতারা রেস্তোরাঁ তে কন্টিনেন্টাল ফুড অর্ডার করল । আফটার অল , ব্লু ব্লাড । রক্তের অভ্যেস আর যাবে কোথায়। প্রায় এক বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন । কথা যেন আর ফুরুতেই চায় না ।
এদিকে ঘড়ির কাঁটা রাত সাড়ে আটটা ছুঁয়েছে । মা ভাববে । তাই সংলাপ আর শ্রীতমা বাড়ির দিকে রওনা দিল । রাতে খেতে বসে , একসাথে অনেক কথা হল। শ্রীতমার বড়মা শ্রীতমার জেঠুকে প্রস্তাব দিল, ” তুমি আমাদের শ্রীতমা কে  রামকৃষ্ণ সারদা মিশন নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চেষ্টা করো । ”  যেমন কথা তেমন কাজ । গোবর্ধনপুর এর মা দুগ্গার আশীর্বাদে ,  পরীক্ষা দিয়ে মেধাবী শ্রীতমা শহরের এলিট স্কুলে ভর্তি হয়ে গেল ।
যেহেতু, পঞ্চানন চ্যাটুজ্জের আর্থিক সামর্থ্য প্রায় নেই বললেই চলে, তাই , নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়ে র শ্রদ্ধেয়া মাতাজী, শ্রীতমার পড়ার খরচ মুকুব করে দিলেন । আর পিছন থেকে দাঁড়িয়ে যে মানুষটা সব ব্যবস্থা করার মূল কারিগর, তিনি আর কেউ নন, উচ্চ শিক্ষিত জমিদার, জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী বাবু
। কারণ, তিনি জানতেন যে শ্রীতমার আত্মসম্মান বোধ যথেষ্ট । পঞ্চানন রাজি হলেও শ্রীতমা আর পড়তে চাইবে না । কারণ, দেখতে দেখতে ওর ভাই, ঋতম ও এবার গোবর্ধনপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে ।
জমিদার জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী বাবু কাউকে বুঝতে ও দিলেন না, কি ভাবে শ্রীতমার পড়ার খরচ মুকুব হয়ে গেল । পঞ্চানন ভাবল , সবই মায়ের কৃপা । সাধ্বী দেবিকাদেবী ও ওনার গোবর্ধনপুরের বাড়ির মা দুর্গা কে প্রণাম জানালেন ।
কিন্তু, মনে মনে জানলেন যে ভগবানের কৃপা কোন না কোন মানুষের হাত ধরে ই ঘটে। এসেছিল, দাদাবাবু ও বৌদি কে মেয়ের মাধ্যমিকের ফল জানিয়ে প্রণাম করে চলে যেতে  । কিন্তু তার জায়গায়, সাত সাতটা দিন বৌদিমণির কোলকাতার বাড়িতে থেকে মেয়েকে ভর্তি করে বাড়ি ফিরলেন ।
                                      যেদিন সকালে পঞ্চানন ও শ্রীতমা গোবর্ধনপুরে ফিরবে, সেদিনই  সংলাপ আবার উইক এন্ড এ বাড়ি ফিরল। বৌদিমণি ,  পঞ্চাননদার দুটো হাত ধরে অনুরোধ করল , ” প্রতি উইক এন্ড এ শ্রীতমা এখানে এসে যেন থাকে । কারণ, আমার তো মেয়ে নেই,  ছোট থেকে ওকে তো মেয়ের চোখেই দেখে এসেছি ।
আর মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং এর কোচিং এর ভার আমার উপরই থাক, দাদা । ” বৌদিমণির মুখের উপর কিছু বলার সাহস কোন দিনই ছিল না, পঞ্চাননের, তাই, শুধু ঘাড় নেড়ে চলে এল । বাড়িতে ফিরে গিন্নী কে সব কথা খুলে বলল, পঞ্চানন । তাই ছাঁদা বেঁধে , নিদিষ্ট দিনে, সোজা বৌদিমণির গড়িয়ার বাড়িতে ।
পরের দিন, দাদাবাবুর গাড়িতে চড়ে নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়ে । শ্রীতমার শুরু হল এক নতুন জীবন । সেখানে শিক্ষা লাভের সাথে সাথে , চলতে লাগল, উন্নততর মানুষ হওয়ার দীক্ষা ।
                            আর উইক এন্ড এ কোচিং এর ক্লাসে যাওয়া আসার পথে দুই বাল্য বন্ধুর চলতে লাগল খুনসুটি । সংলাপ মেডিক্যাল এ কিছু করতে পারল না । কিন্তু, ইঞ্জিনিয়ারিং এ একদম প্রথমের দিকে জায়গা করে নিল ।
ভর্তি হল খড়্গপুর আইআইটি তে । সংলাপের সাফল্যে শ্রীতমা খুব আহ্লাদিত হল । আজ ও সেই একই রেস্তোরায় দুজনে । আজ কিন্তু খাওয়ার ট্রিটটা শ্রীতমা দিল , নিজের জমানো পয়সা থেকে । শুধু একবার অভিমান করে বলল , ” তুই তো এবার আমাকে ভুলে যাবি। ওখানে কত বড় ঘরের সব প্রজাপতি থাকবে, সেখানে কি আর এই হতদরিদ্র পঞ্চানন চ্যাটুজ্জের মেয়েকে তোর আবার মনে থাকছে! “
একথা বলে শ্রীতমার চোখে জল ছলছল করে উঠল । ও আর জল লুকিয়ে রাখতে পারল না ।
সংলাপ শ্রীতমার কাঁধে হাত রেখে বলল ,” তুই আমার ওল্ড চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড । ” শুধু ফ্রেন্ড ? অভিমান এবার সপ্তমে চড়ল ।

              তৃতীয় পর্ব 

       শুধু ফ্রেন্ড? আর কিচ্ছু না? শ্রীতমার এই আবেগমথিত প্রশ্নে, সংলাপ ও কিছুটা ধন্দে পরে গেল ।  আসলে, ছোটবেলা থেকে এক সাথে চলা, খেলা করা , খুনসুটি করা , সর্বোপরি কৈশোর আর যৌবনের দোরগোরায়, প্রতি উইক এন্ড এ একই কোচিং সেন্টারে আসা যাওয়ার পথে, কখন যে নীরবে মন দেওয়া নেওয়া হয়েছে, তা দুজনের কেউই ভালো করে বুঝতে পারেনি ।
আজ যখন, সংলাপ খড়গপুর আই আই টি তে ভর্তি হয়ে চলে যাচ্ছে, তখন শূন্যতা এসে ঘিরে ধরেছে, দুজনকেই । যাইহোক, সালটা যখন ১৯৯৫, সংলাপদের গড়িয়ার বাড়িতে ল্যান্ড ফোন ছিল । সংলাপ শুধু এই বলে আশ্বস্ত করল যে তুই তো উইক এন্ড এ বাড়িতে আসছিস । আমি তোকে দুপুরের দিকে ফোন করব । বেশ।
কাছের মানুষ যত দূরে যায়, অন্তরের টান তত বাড়তে থাকে । দেখতে দেখতে পরের বছর জয়েন্টে মেডিক্যাল এ একদম প্রথমের দিকে স্থান করে নিল শ্রীতমা । রেজাল্টের দিন শ্রীতমা ওর জেঠিমার বাড়িতেই ছিল ।
সুখবর পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে জেঠু – জেঠিমা কে প্রণাম করল। জেঠিমা শ্রীতমা কে জড়িয়ে ধরে বললেন, পঞ্চাননদার কাছে তুই আমার মুখ রাখলি। কেউ মনে রাখুক , আর নাই রাখুক, আমি তো জানি, আমি তোর বাবার কাছে চির ঋণী । উনি সঠিক সময়ে সৎ পরামর্শ দিয়ে, আমার সংসার জীবন বাঁচিয়েছেন ।
জেঠিমা হাতে টাকা দিয়ে বললেন, যা , এবার গোবর্ধনপুরে গিয়ে বাবা ও মা কে প্রণাম করে আয় । বিকেলে খড়গপুর আই আই টির হোস্টেলে ফোন করে, সংলাপ কে সুখবর দিল শ্রী । এতদিনে, সংলাপের কাছে শ্রীতমা শুধু  ” শ্রী ” হয়ে গেছে ।
ঠাট্টা করে বলল, ” এবার তো ভুলে যাবার পালা তোর । ” শ্রী – কেন ? কোথায় ইঞ্জিনিয়ার সংলাপ আর কোথায় ডা. শ্রীতমা  চট্টোপাধ্যায় । ” খোঁটা দিচ্ছিস? বেশ যা , তোর সাথে আর কথা নেই, ” – এই বলে শ্রীতমা ফোন কেটে দিল ।
                গোবর্ধনপুরে বাড়িতে এসে, বাবাকে জড়িয়ে ধরল, মাকে প্রণাম করল । ক্লাস টু তে পড়া ছোট্ট ঋতম কে পরম মমতায় শ্রীতমা কোলে তুলে নিল । অথর্ব ঠাকুমা কে ও প্রণাম করল , শ্রীতমা । যে ঠাকুমা শ্রীতমা জন্মাতে খুশি হতে পারেনি, আজ সেই ঠাকুরমা, বাবার কথা শুনে শ্রীতমা কে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করল। বললেন, আমরা সেকেলে মানুষ, ঘোমটা দেওয়া মেয়ে মানুষ, এই কেবল বুঝতাম ।
ভাগ্যিস, পঞ্চু নিজের বুদ্ধিতে এগ্গেছিল, তাই তো এই অজ পাড়া গাঁয়ে থেকে তুই ডাক্তার হলি । ঠাকুমা, হইনি গো হব , মুখ নীচু করে বললে শ্রীতমা ।
                          যেটা শ্রীতমার নজর এড়িয়ে গেল না, সেটা হল , অভাবের সংসারের জোয়াল টানতে টানতে বাবা কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে । মায়ের অবস্থাও তথৈবচ । শুধু অবোধ ঋতম অনাবিল আনন্দে বড় হয়ে উঠছে ।
বংশধর বলে কথা। শ্রীতমার মা, ঠাকুরমার এই মনোভাবটা ওর একদম সহ্য হয় না । শ্রীতমা জানে , যা কিছু করার , তা বাবাই করেছে । বাবার শরীর সংসারের যাঁতা কলে ক্রমশ পিষে যাচ্ছে, দেখে নিজেকে খুব অসহায় ভাবল। মনে মনে ভাবল , ডাক্তারি পড়ার সময়ে কোনো কাজ করে কিছু রোজগার করে নিজের খরচ চালাবে, সঙ্গে সঙ্গে বাবা কে কিছুটা সাহায্য করবে।
                             গরীব ঘরের মেয়ে, বাড়িতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে, জেঠিমার কাছে চলে এল । মাধ্যমিক অব্দি সংলাপের পুরোনো বইপত্র নিয়ে পড়েছে ; উচ্চ মাধ্যমিকের পুরোটা মাতাজিদের অকৃপণ সহযোগিতায় উতরে গেছে; খালি জয়েন্টের কোচিং এর খরচ জেঠিমা জোগান দিয়েছে।
জেঠিমা কখনো বুঝতে দেয়নি যে তিনি সাহায্য করছেন । আর মিশনের মাতাজিদের তো কোনো তুলনা হয় না । ঠাকুর , মা , স্বামীজির আদর্শে চলা উন্নততর মানুষ ওনারা । কিন্তু, এবার কোথাও যেন একটা আত্মসম্মানে লাগছে । শুধু কি তাই, প্রতি উইক এন্ড এ জেঠিমার গড়িয়ার বাড়িতে থাকা , খাওয়া ও সংলাপের সাথে কোচিং এ যাওয়া ।
তাহলে কি ওরা রক্তের সম্পর্কের থেকেও বেশি আপন ? যেহেতু মেডিক্যাল এ একদম প্রথমের দিকে স্থান ; তার উপর আর্থিক সক্ষমতা অপ্রতুল , তাই শ্রীতমার জেঠুই , শ্রীতমাকে বেশ কয়েকটা স্কলারশিপ এর আবেদন করিয়ে দিলেন ।
জি.ডি.বিড়লা. স্কলারশিপ পেয়ে আর্থিক দুর্গতি কেটে গেল । ওহ ! এর মধ্যে যেদিন আবার নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে গেল, জেঠু- জেঠিমা দুজনেই সংলাপ কে বললেন , “তুই সঙ্গে যা, জানি, শ্রীতমা যথেষ্ট পারদর্শী, চৌকস, তবু কেমন একটা চিন্তা হয় । ” আসলে , ভালোবাসা তো আর নিয়ম মেনে হয় না, চেনা ছকে সরলরেখাতেও চলে না । খড়গপুর আই আই টির সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র, সংলাপ রায়চৌধুরী গেল তার শ্রী কে এন. আর. এস. মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করতে ।
                               দেখতে দেখতে সংলাপ আই আই টি থেকে বেরিয়ে সোজা টিসিএস এ ঢুকল । শ্রীতমা ও পরের বছরই এমবিবিএস পাশ করল। এরপরের সব গন্তব্যই ছিল একসাথে । সংলাপ হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল এ এমবিএ করতে এল, আর শ্রীতমা হার্ভার্ড স্কুল অব্ মেডিক্যাল সায়েন্সে  এম এস করতে এল।
যৌবনের সেরা সময়টা দুজনেই চুটিয়ে উপভোগ করল।

              চতুর্থ পর্ব 

      ওটা আমেরিকা, ভারতবর্ষ নয় । ওরা লিভ্ ইন সম্পর্কে জড়িয়ে পরল । দেশে ফিরে যে যার নিজের বাড়িতে ফিরে এল । তখন সংলাপ পঁচিশ বছরের তাজা যুবক, শ্রীতমা বছর চব্বিশের টাটকা, তাজা যুবতী । আর শ্রীতমার থেকে এগারো বছরের ছোট ভাই, ঋতম তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ।
পঞ্চাননবাবু ছাপ্পান্ন বছরের বৃদ্ধ । শ্রীতমার কল্যাণে সংসারে শ্রী অনেকটা ফিরেছে । আমেরিকায় থাকাকালীন স্কলারশিপ এর বাঁচানো টাকা শ্রীতমা বাড়িতে পাঠিয়ে দিত । তাই দিয়েই গোবর্ধনপুরে পঞ্চাননবাবুর বাড়ির শ্রী  ফিরেছে।
             অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সংলাপ গুগলের কলকাতা অফিসের সিইও, আর শ্রীতমা পিজি হাসপাতালের অধ্যাপিকা ডাক্তার ।
এর মধ্যেই সংলাপের মা দেবিকাদেবী, ওনার রাশভারী স্বামী, জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণবাবুর সাথে ছেলের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে এলেন । বিচক্ষণ রায়চৌধুরী বাবু বললেন, ” দেবী, খেয়াল আছে? ” দেবিকাদেবী, ” কি ? ” তোমার আমার দাম্পত্য ত্রিশ বছর পার করল । চাপিয়ে দিও না, সংলাপের সঙ্গে কথা বল । ওর কোনো পছন্দ আছে কিনা? সব শুনে দেবিকাদেবী বললেন, ” আসলে, আমি শ্রীতমার কথা ভাবছিলাম ।
শ্রীতমা হলে কেমন হতো? বেজাত নয়, কিছু নয়, নিজের কাছে রেখে মানুষ করেছি। সংলাপের জন্যে শ্রীতমার কোনো তুলনা হয় না । কর্পোরেট জগতে কর্মরত আধিকারিক, রাত করে বাড়ি ফিরে এল। মা দেবিকাদেবী, ডিনারের পর ছেলের কাছে বিয়ের ব্যাপারে ওর কোনো পছন্দ আছে কিনা, জিজ্ঞাসা করলেন ।
সংলাপ আর ওর মায়ের সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুত্বের । তাই কোনো রাখঢাক না রেখেই, সংলাপ বলল, ও শ্রীতমাকেই ওর জীবনসঙ্গী হিসেবে চায় । এটা শুনে দেবিকাদেবীর চোখে জল চলে এল । তুই আমার মনের কথাটাই বললি ।
পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্টের টেবিলে, বিষয়টা উঠল। সংলাপ অবশ্য তখনও বিছানা ছাড়ে নি। রাত জেগে ল্যান্ডফোনে কথা বলতে বলতে প্রায় ভোর হয়ে গেছিল । রায়চৌধুরীবাবু সব শুনে বললেন, তাহলে পঞ্চানন কে একবার ডাকি , কথা বলার জন্য । সে তো করাই যায়, বললেন দেবিকাদেবী ।
তবে তার আগে শ্রীতমাকে রবিবার আসতে বলি । প্রফেসর কোয়ার্টারে থাকে শ্রীতমা । জেঠিমা নিজে ফোন করে আসতে বললেন এবং পরের দিন গড়িয়ার বাড়ি থেকে পিজি তে চলে যেতে বললেন ।
               শুধু যে পেটে ধরলেই মা হওয়া যায়, তার কোনও মানে নেই । স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ কি বলতে পারবেন যে মা হিসেবে তাঁর কাছে কে বেশি আপন – মা যশোদা না দেবকী ? সেখানে স্বাধী দেবিকাদেবী তো শ্রীতমার এক কথায় মাতৃসমা । উপেক্ষা করার তো কোনো প্রশ্ন নেই, বরং প্রশ্ন হল কত তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়া যাবে?
তবে সেদিনের শ্রীতমার সঙ্গে আজকের শ্রীতমার অনেক ফারাক । সেদিন সে ছিল কর্পদক শূন্য, আর আজ প্রতিষ্ঠিত, বিত্তবান, সমাজে স্বীকৃত বুদ্ধিজীবি, অধ্যাপিকা তথা বিশিষ্ট সমাজকর্মী শ্রীতমা চ্যাটার্জি । আজ আর ও খালি হাতে আসেনি । সঙ্গে করে এনেছে জেঠিমার খুব প্রিয় শ্রী অভয়চরণ প্র
ভুপাদের  “শ্রীমৎ ভগবৎগীতা যথাযথ” । জেঠুর জন্য এনেছে নামী ব্রান্ডেড চুরুট । শুধু সংলাপের জন্য কি এনেছে , তা চাপা রইল। ঠিক আগে যেমন ঘরোয়া ভাবে সেই একাদশ শ্রেণি থেকে ছিল, ঠিক তেমনই এল, থাকল এবং স্বচ্ছন্দই রইল ।
দুপুরে খাবার সময় , শ্রীতমার জেঠু , জেঠিমা মুখ চাওয়া চাহি করল , নিজেদের মধ্যে । কে পারবে কথাটা এখানে ? গুরুভারটা এসে পরল সেই জেঠিমারই উপর। এ সেই জেঠিমা ; যিনি কিশোরী অবস্থায় শ্রীতমার পিরিয়ডের পিরিয়ডে , মায়ের মতো পাশে থেকেছেন ; পেটে না ধরেও , একদম নিজের মা।
খেতে খেতে, শুধু বললেন, ” হাঁরে! সেটেল হবার কথা কিছু ভেবেছিস? শ্রীতমা শুধু হাসল। জেঠিমা বললেন, কিছু না ভেবে থাকলে , তুই এখানেই থেকে যা । সংলাপ আমাকে সবই বলেছে ।
       শুনে শ্রীতমার একটু খটকা লাগলো । তাহলে কি জেঠিমা, আমাদের লিভ্ ইন এর কথা জানেন ? অধ্যাপিকা শ্রীতমার মুখ রাঙা হয়ে উঠল । শুধু বলল, বাবাকে একবার শুনিয়ে দিলেই হবে । বেশ, পঞ্চাননদা আমার কথা ফেলতে পারবে না, বলল জেঠিমা । রাতে সংলাপ আর শ্রীতমা ছাদে একান্তে বেশ কিছুটা সময় কাটালো ।
শুনলাম, তুই সবার জন্য কিছু না কিছু, এনেছিস? আমি শুধু ফাঁকে পড়ে গেলাম । তোকে তো আমার আর দেবার কিছুই নেই, শুধু আমার ভালোবাসা, ভরসা, বিশ্বাসের কখনও অমর্যাদা করিস না । চোখে জল শ্রীর ।
সংলাপের চওড়া বুকে মাথা রাখল শ্রী । শ্রীর এই কেয়ারলেসলি  কেয়ারফুল ব্যাপারটা সংলাপ কে খুব টাচ করে । শ্রী কাছে এলেই সংলাপ কেমন যেন একটা শ্রী শ্রী ঘ্রাণ পায়। সংলাপ ওতেই মুগ্ধ থাকে।
                          যেমন কথা, তেমন কাজ । গোবর্ধনপুর থেকে আসা পঞ্চাননদাকে তার বৌদি যখন প্রস্তাব দিলেন, তখন পঞ্চানন চ্যাটুজ্জে বাক্যিহারা , তার চোখে জল আর বাঁধ মানে না । মেয়ে স্বজাতে, গ্রামের জমিদার বাড়ির  বৌ হবে?  স্বপ্ন দেখছে না তো ? কানে ভুল শুনছে না তো? নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না । আরও কিছু চমক অপেক্ষা করছিল।
            

               পঞ্চম পর্ব 

        রাশভারী জমিদার, জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরীবাবু , যাকে পঞ্চানন দাদাবাবু বলে ডাকত এবং একটা সম্মানজনক তফাত বজায় রেখে চলত; সেই জমিদার বাবু পঞ্চানন কে বেয়াইমশাই বলে জড়িয়ে ধরে বললেন, আজ থেকে এটাই স্বাভাবিক সম্পর্ক হল। পঞ্চানন বাড়ি ফিরে এসে গিন্নী কে সব কথা খুলে বলল । তখন কথা যেন ফুরুতেই চাইছিল না । যাইহোক, শেষমেষ, চার হাত এক হল।
আমরা তো সমাজে শাশুড়ি বউয়ের কূটক্যাচালি দেখতেই অভ্যস্ত। সমাজে ছেলে মানুষ করা দেখেছি, মেয়ে মানুষ করা দেখেছি , কিন্তু, এভাবে হবু বৌমা কে মানুষ করার দৃষ্টান্ত সমাজে খুঁজে পাওয়া ভার ।
                        দেবিকাদেবী ও শ্রীতমার মিলমিশ, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন । হর – পার্বতীর সংসারে ও সমস্যা আছে; লক্ষ্মী – নারায়ণের ও সংসারে সমস্যা আছে । সমস্যা তো সংসারে নিত্য সত্য ।
অভাবের মধ্যে বড় হওয়া, শ্রীতমা মেডিক্যাল কলেজে পড়ানোর পাশাপাশি, দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির বিনামূল্যে চলা ক্লিনিকে চিকিৎসা করে । জীবনের এত বৈচিত্র্য, মুখ – মুখোশের ফারাক শ্রীতমা কে  খুব ভাবায়।
কিছুদিনের মধ্যেই ওরা ইডেনে সিটিতে খুব বড় একটা বাংলো কিনল । সংলাপ চেয়েছিল যে  শ্রী আর ও দুজনে উঠে যাবে ওখানে । কিন্তু, পাহাড় প্রমাণ বাধা হয়ে দাঁড়াল শ্রীতমা। গেলে সবাই যাব, নাহলে এখানেই থাকব ।
                                  দেবিকাদেবী মনে মনে ভাবলেন কতটা ছেলে মানুষ করতে পেরেছেন , ঠিক করে বলতে পারবেন না । কিন্তু, বৌমা মানুষ গড়াতে তাঁর সাফল্য প্রশ্নাতীত । অতীতের জেঠু, আজকের বাবা একদিন রাতে খেতে বসে সবার সামনেই বললেন, ” এত বড় বাংলো, খাঁ খাঁ করে, সময় কাটতে চায় না ।
এখনও শক্ত আছি, তোর কোল আলো করে একটা নাতি, নাতনি এলে , অন্তত মাধ্যমিক পাশটা করিয়ে দিয়ে যেতাম। একথা শুনে সংলাপ নির্বিকার রইল , আর শ্রীতমা লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই শ্রীতমা কনসিভ্ করল। পঞ্চাননবাবু এসেছেন, মেয়েকে প্রথা মত বাপের বাড়ি নিয়ে যেতে।
ইতিমধ্যে, শ্রীতমার কলিগ ডা বাসন্তী দাশগুপ্ত অ্যাপলো গ্লিনিগ্যালস হাসপাতালে ডে কেয়ার ইউনিটে বসেন। সব টেস্ট করে বললেন, তুই তো টুইন বেবি ক্যারি করছিস । শ্রীতমার ক্যারি করার পিরিয়ডে একদম ছায়াসঙ্গী , তার সেদিনের জেঠিমা, আজকের মা। সবদিক ভেবে দেবিকাদেবী বললেন, দাদা, আমাকে ভরসা হয় না?
পঞ্চাননবাবু নিরুত্তর । শুধু বললেন, আপনাকে আমি নিজের থেকেও বেশি ভরসা করি । পরম নিশ্চিন্ত হয়ে পঞ্চানন চ্যাটুজ্জে গোবর্ধনপুরে ফিরে এসে গিন্নী কে সব বললেন । ওদিকে,  শ্রীতমার থেকে এগারো বছরের ছোট ঋতম এ বছর ইন্দ্রপুর হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করল । শ্রী সংলাপ কে পাঠিয়ে ভাইকে একাদশ শ্রেণিতে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে হোস্টেলে রাখল । সঙ্গে ‘আকাশ’ থেকে কোচিং এর ব্যবস্থা করাল। পঞ্চাননবাবু এবার বেশ নিশ্চিন্ত হলেন।
নিদিষ্ট সময়ের কিছুদিন আগেই শ্রীতমা একটা পুত্র ও একটা কন্যা সন্তানের জন্ম দিল । রায়চৌধুরী বাড়িতে খুশির বন্যা বয়ে গেল।
ছেলের নাম হল অনুরাগ আর মেয়ের নাম হল নয়নীকা । সময় কিন্তু থেমে থাকল না । সুস্থ হয়ে শ্রীতমা ফিরল কাজের জগতে । কিন্তু, দু দুটো বাচ্চা সামলানো মুখের কথা নয় । তাই গোবর্ধনপুর থেকে ডাক পরল শ্রীতমার মায়ের । দুই বেয়ানে মিলে চলল নাতি, নাতনি বড় করার কাজ । গোবর্ধনপুরে বাবা একাই থাকে, আর দুবেলা শ্রী শ্রী ঠাকুরের আশ্রমে পুজোও করে এবং ভোগ খায় ।
                        ইতিমধ্যে সংলাপের প্রমোশন হল। কাজের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। রাতে সবদিন বাড়ি ফিরে আসতে পারত না । শ্রী ও  তার হাসপাতালের কাজ সামলে দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির ক্লিনিকে যৌনকর্মীদের চিকিৎসা করত। কারোর ডেলিভারি করাত । কখনো সখনও, কারো কারো বাচ্চার ফুড কিনে দিত।
নিজের ছেলে মেয়ের পুরোনো জামা , কাপড় এনে অনেককে দেয়। ওদের সবার কাছে শ্রীতমা খুবই প্রিয় ডাক্তারদিদি । এখন শ্রীতমা দশভুজা । একদিকে স্বামীর খেয়াল রাখা , দু ছেলে মেয়ে কে সময় দেওয়া, ভাই এর রহড়া তে উচ্চ মাধ্যমিক দেবে , তার খেয়াল রাখা। নিজের জন্য আর কোন সময়ই নেই ।
                                তবে যত কাজই থাক না কেন, সন্ধ্যের পর পরিবারের সাথে থাকে শ্রীতমা । দুই মা একই সঙ্গে থাকায় চাপ অনেকটা কম। তবে সংলাপের রাতে না ফেরা টা শ্রী ভালোভাবে নিতে পারেনি। দেখতে দেখতে দাম্পত্যও তো পুরোনো হল। কেমন একটা একঘেয়েমির জন্ম দিল ।
জমিদারের ছেলে, তার উপর আবার মোটা বেতনের সিইও, ল্যান্ড রোভার চেপে যাওয়া আসা করে । এক ঠিকাদারের পাল্লায় পরে সিক্রেট সার্ভিস এতে নতুন আসা রতি বর্মনের সাথে জড়িয়ে পরল। আসলে রতি ওপার বাংলা থেকে আসা এক মেয়ে । ইংলিশ অর্নাস নিয়ে পড়া মেয়ে । কিন্তু, বাবার ক্যান্সার এর খরচ জোগাতে মাত্র একরাতের রতিক্রিয়াতে রাজি হয়েছিল।

                      ষষ্ঠ পর্ব 

       কিন্তু, সংলাপ ও যে অন্য রকম ছেলে । ও শুধু রতির শরীর ছুঁলো না, ছুঁয়ে গেল ওর মন। সিক্রেট সার্ভিস এ সব কিছুই গোপন রাখাই নিয়ম। সেখানে দুজনেরই ইন্টিমেসি এমন জায়গায় গেল, যে সম্পর্কটা হয়ে গেল ব্যক্তিগত স্তরে । বিত্তবান সংলাপ সবার অলক্ষ্যে চিকিৎসা করিয়ে দিল । কিন্তু, রতি যে গর্ভবতী হয়ে পরল।
সংলাপের কথা মতো গর্ভপাত করাতে রাজি হল না । মুখ পুড়িয়ে বাড়ি ফেরার মত অবস্থাও ছিল না । একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে , বাবা, অন্যদিকে অভাব নিত্যসঙ্গী । রতির রফা করা ছাড়া আর কোন উপায় সামনে ছিল না ।
অন্যদিকে , আর পাঁচটা মানুষের মত গোপনে সম্ভোগ করতে আপত্তি নেই কিন্তু তার জন্য সংসার ভেঙে ফেলার ইচ্ছে একদম নেই। তবে বেশ কিছু রাত রতির সঙ্গে কাটিয়ে, রতিকে গর্ভবতী করে , সংলাপ এক অদ্ভুত বিবেকের দংশনে ভুগতে লাগল। মনে পরে গেল, সেই বিয়ের আগে গড়িয়ার বাড়ির ছাদে শ্রী এর বলা সেই সব কথা – ” আমার তো তোকে আর কিচ্ছু দেওয়ার নেই, সবই তো দিয়েছি , তোকে উজার করে । তবে তুই আমার ভালোবাসা, ভরসা, আস্থার মর্যাদা রাখিস। ” কিন্তু, কথায় আছে,
   যার কেউ নেই, তার ভগবান আছে । ভগবান তো আর নিজে ধরাতে নেমে এসে মানুষের উপকার করেন না, নররূপী নারায়ণের মাধ্যমেই তিনি জগতের কল্যাণ করেন। এখানেও সহায়, সেই দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতি। তাদেরই পরামর্শে রতি নাম পাল্টে হল চাঁদনি । চাঁদনির স্থান হল দুর্বারের রেসকিউ সেন্টারে । নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কামিনী কলা কেন্দ্রের ডা. দিদির উপরই পরল চাঁদনির চিকিৎসার ভার ।
                         মাতৃরূপী শ্রীতমা পরম মমতায় চাঁদনির চিকিৎসা করল। আসলে নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ে মানুষ হওয়া ও পরবর্তীতে ওখানকার মাতাজীর কাছে দীক্ষিত শ্রীতমা শিব জ্ঞানে জীব সেবা করার আদর্শে চাঁদনির শুধু চিকিৎসাই করল না, করল সেবা । জিতে নিল চাঁদনির ভরসা ।
নিদিষ্ট সময়েই, চাঁদনির কোল আলো করে এল , সিঙ্গেল পেরেন্টের, কন্যা । কি নাম রাখবে মেয়ের? বার্থ সার্টিফিকেট বের করতে হবে তো? ডা. দিদি , আপনি রাখুন না একটা ভালো নাম। বেশ , তবে চাঁদনির মেয়ে ‘কিরণ’ ই থাক। গড়িয়ার বাড়িতে উপর তলায় থাকতে দিল। নীচের তলায় ভাড়াটে থাকে । যত দিন যেতে লাগলো, কিরণের মুখশ্রী, অবিকল সংলাপ বসানো ।
                                     মনে সন্দেহ ঢুকলে মুশকিল খুব । চাঁদনির কিন্তু ডা. দিদি কে অবিশ্বাস করার মত কোনও কারণ ঘটে নি। চাঁদনি স্মৃতির সরণি বেয়ে, নিজের অতীতের পাতা ওলটাতে লাগল। জানা গেল , আসলে ও রতি বর্মন। ওপার বাংলা থেকে সপরিবারে আসা এক মেয়ে । বুদ্ধিমতী মেয়ে ছিল রতি । স্কুল , কলেজ সবই এদেশে।চরম অসহায় অবস্থায় , ও এক রাতের জন্য সিক্রেট সার্ভিস এ যোগ দিয়েছিল। টাকার যা অফার ছিল, তাতে ওর বাবার বেশ কয়েকটা কেমো থেরাপি হয়ে যেতো।
কিন্তু, যার কাছে দালাল মারফত , রতি নিজেকে সপে দিয়েছিল, সে ভালো মানুষ ছিল । শুধু শরীর দেওয়া নেওয়া করেনি , ঘটেছিল মন দেওয়া নেওয়া ও।
                         শ্রীতমা কথা দিয়েছিল, কিরণের কোনো ক্ষতি হতে ও দেবে না । হাজার বলেও রতির সেই ভালোবাসার মানুষটার নাম শ্রীতমা জানতে পারেনি । রতি ও বলতে চায়নি । কারণ, ও জানত , ও কিছু কথা বললে ওর প্রাণ সংশয় হতে পারে । এর মধ্যেই এসে পরল, অনুরাগ ও নয়নীকার জন্মদিন । সংলাপ ও শ্রীতমার কলিগরা, দুর্বার সমন্বয় সমিতির কর্মকর্তাবৃন্দ । ও বাড়িতে থাকা রতি ও কিরণের ও নেমন্তন্ন হল। রতির ডা. দিদি বলেছিল , গাড়ি পাঠিয়ে দেব, সকাল সকাল চলে আসিস । একটু হাতে হাত লাগাস।
                          সকালের ব্রেকফাস্টের টেবিলে ডা. দিদি পরিচয় করিয়ে দিল সবার সাথে । সব শেষে, সংলাপের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার সময়ে বলল, আমার স্বামী । থতমত খেয়ে গেল সংলাপ; শিউরে উঠল রতি । শ্রীতমার নজর এড়িয়ে গেল না কিছুই । পিতৃত্বের  অমোঘ আকর্ষণে কিরণ হাত বাড়িয়ে দিল সংলাপের দিকে। একেই বোধহয় সিক্সথ্ সেনস্ ।
নজর এড়িয়ে সংলাপ কথা বলল রতির সাথে । এখানে কেন?  আমার ঘর ভেঙে দিয়ো না । আমি নিজেই ডা. দিদির কাছে চির ঋণী । আমি চলে যাব । সাইড থেকে সব শুনল শ্রী । চোখের জল আর বাঁধ মানল না ।
                                     পার্টিতে সবাই আনন্দে মাতোয়ারা । শুধু চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল রতির মাথায় । কিরণ কে নিয়ে ও যাবে কোথায়? কিরণ কে শ্রীতমার মায়ের কোলে তুলে দিল ; সবার অলক্ষ্যে কিরণের পকেটে ভরে দিল , একটা চিরকূুট। ডা. দিদি, আমি চললাম; কিরণ কে কোনো হোমে দিয়ে দিও । আমার খোঁজ করো না ।
       লোকজন চলে যেতে সবকিছুর কেমন যেন একটা তাল কেটে গেল । সারাদিনের ক্লান্তি শেষে, শ্রীতমা ফোন করল , দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতিতে । যেহেতু শ্রীতমা ওখানে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত, তাই বিনা আওয়াজে কাজ তোলার ব্যবস্থা হল।

        সপ্তম পর্ব 

       কিন্তু, সব জেনেও, একদম চুপ, শ্রীতমা । যেন কিছুই জানে না । পরের দিন, হসপিটাল যাবে বলে বেড়িয়ে, সোজা গড়িয়ার বাড়িতে । তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল সবকিছু । একটা স্মার্ট ফোন আর একটা ডায়েরি, রতির গোটা অতীতটাকে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে তুলল। ডা. দিদির উদ্দেশ্য লেখা একটা চিরকূুট, দিদি, পারলে আমায় ক্ষমা করো । এদেশে আমাকে আর পাবে না । কিরণকে কোনো একটা  হোমে দিয়ে দিও । সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে সংলাপের বিছানার উপর সাজিয়ে রাখল । শ্রী চায় , একটা অনেস্ট কনফেসন ।
                            রাতে মুখোমুখি শ্রী আর সংলাপ । সবকিছু স্বীকার করল সংলাপ । তবে এটাও বলল, যে একটা সময় তার মনে হয়েছে , সে শ্রী কে প্রতারণা করছে। পারলে, ক্ষমা করো,  শ্রী , সংলাপ বলল। শ্রী এর মুখে ফুটে উঠল , বুদ্ধের সেই বাণী, ” যাকে ভালোবাসো, তাকে ক্ষমা না করতে পারলে, কিসের ভালোবাসা? “
সংলাপ তাজ্জব হয়ে গেল, শ্রীতমার মুখে যখন শুনল, ” আমি কিরণ কে আইনত দত্তক নেব । “
পরিবারের মধ্যে ওঠা উত্তাল ঢেউ একদম শান্ত হয়ে গেল ।
             এদিকে, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে পড়েও, ঋতম মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং কোন কিছুই লাগাতে পারল না । শেষে, বরাহনগর আই এস আই এ পরিসংখ্যান বিদ্যাতে অর্নাস নিয়ে ভর্তি হলো ।
          শ্রী এর প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ির সকলেরই বেড়ে গেল। এরমধ্যেই শ্রীতমার বাবা, পঞ্চানন চ্যাটুজ্জের সিভিয়ার অ্যাটাক । বাবাকে সোজা পিজি তে  ভর্তি করল। গোবর্ধনপুরে আর ফিরে যেতে দিল না । গড়িয়ার বাড়িতে বাবা আর মাকে রেখে দিল। এখানে জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী বাবু, দেবিকাদেবী, অনুরাগ ও নয়নীকা কে নিয়ে শ্রীতমা সংলাপের সুখের সংসার ।
গোবর্ধনপুরে সম্পত্তি দেখাশোনা করা , সর্বোপরি দুর্গা পুজো করানো , সবই শ্রীতমার উপর । শ্রীতমা আজ আর গৃহবধূ নয় , দশভুজা; মাতৃরূপে আগলে রেখেছে সবাই কে । স্বার্থপরের মত শুধু পরিবারের কথা ভাবে তা নয়, দুর্বার মহিলা সমন্বয় সমিতির আজ এক কর্ণধার ও বটে। আকাশে বাতাসে সেই সময়ে ভেসে আসছে  –
” যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা । “

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *