মানবিক সম্পর্কের অর্থনীতি

রণেশ রায়

সহজ সরল ভাষায় অর্থনীতির প্রগতি হল মানব সম্পদ আর প্রযুক্তির সাহায্যে দেশের আর দশের মানবিক ও প্রাকৃতিক সম্পদকে  শৈল্পিক আর প্রাযুক্তিক নৈপুন্যে ব্যবহার করে সমাজের ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের স্বার্থে নতুন সম্পদ সৃষ্টি করা । এই সৃষ্ট নতুন সম্পদকে অভ্যন্তরীণ জাতীয় উৎপাদন বলা চলে। আমরা আমাদের আলোচনায় দেখব যে মানব সম্পদ বলতে শুধু শ্রম আর বুদ্ধিবৃত্তিকে বোঝায় না।

.

মানব সম্পদের একটি গুরুত্তপুর্ন উপাদান হল মানবিক সম্পর্ক। সমাজে মানুষে মানুষে সুস্থ মানবিক সম্পর্ক বজায় না থাকলে কায়িক সম্পদ বুদ্ধিবৃত্তি এবং প্রযুক্তির নিপুন ব্যবহার সম্ভব হয় না। ফলে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি নিদ্দৃষ্ট নিশানা ধরে বাড়তে পারে না।

.

আমরা যখন  নিদ্দৃষ্ট নিশানা ধরে বাড়ার কথা বলি তখন দেশের আত্মসম্ভ্রম বজায় রেখে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়নের কথা বলি যাকে এক কথায় অর্থনীতিতে আওতাভুক্ত উন্নয়ন ( inclusive growth) বলা হয়। এমন উন্নয়নের কথা বলি না যা একটা সম্প্রদায়ের সম্পদ বাড়ায় কিন্তু আরেকটা সম্প্রদায়ের আয় ও সম্পদ বাড়ায় না। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষিত হয় না। এই ধরণের উন্নতিকে আওতা বহির্ভুত উন্নয়ন ( exclusive growth) বলা হয়। য়েমন আধুনিক রাসায়নিক শিল্প।

.

এর অফুরন্ত বিকাশ আপাত দৃষ্টিতে সম্পদ বাড়ালেও পরিবেষ দুষনের নেতি বাচক দিকটা ধরলে দেশের সত্যিকারের সম্পদ কতটা বাড়ে তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। এতে সব সম্প্রদায়ের আয় এই ব্যবস্থায় বাড়ে না। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে বিভেদের বীজটা থেকেই যায়। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ভিতটা আলগা হয়। এই প্রক্রিয়ায় আপাত দৃষ্টিতে সম্পদ সৃষ্টি হলেও বা মূল্য সৃষ্টি হলেও  এর নেতিবাচক দিকটা খুব শক্তিশালী হলে নেট মূল্যসৃষ্টি কতটা হয় তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। এরজন্যই উন্নত দেশে নোংরা শিল্প বলে অভিহিত শিল্প তাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় না।

.

আমদের জীবনে দুজন ব্যক্তির মধ্যে যত না মিল তার থেকে অমিলটাই  বেশি। সুতরাং বন্ধুত্ব গড়ে তুলে অমিলের সংগে মানিয়ে একসংগে চলাটা জীবনের অনিবার্যতা। পরস্পর সহযোগিতার মধ্যে দিয়ে চলতে পারলে প্রকৃত অর্থে জীবন ধারনের খরচ কমে আর উৎপাদনের ক্ষেত্রে  খরচ কমানোর সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে। একেই আমরা মানবিক সম্পর্কের অর্থনীতি বলি যার মৌলিক তিনটি উপাদান হল : ১) সহমর্মিতা ২) দায়বদ্ধতা ৩) পরস্পর নিরভরশীলতা আর বিশ্বাস।

.

সমাজে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ককে অসংখ্য ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন পরিবারের মধ্যে বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক,  পরিবারের বাইরে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক, নিয়োজিত আর নিয়োগ কর্তার মধ্যে সম্পর্ক প্রভৃতি। বন্ধুত্বকে আলাদা সমমর্যাদা সম্পন্ন সমবয়সীদের মধ্যে সম্পর্ক বলে মনে করা হয় যেখানে সহমর্মিতা নির্ভরশীলতার মত বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

.

অন্য সম্পর্কগুলোকে একধরন বা অন্যধরনের  উর্দ্ধস্তন অধস্তনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বলে গণ্য করা হয়। এমন কি শত্রুতার সম্পর্ককেও একধরনের সম্পর্ক বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আমাদের সমাজে দুটি ছেলেমেয়ের বন্ধুত্বের সম্পর্ককে তেমন স্বীকৃতি দেওয়া হয় না।

.

লিঙ্গগত প্রাধান্যের দর্শন কাজ করে। এক্ষেত্রে সম্পর্কের মধ্যে ভীতি অনুগ্রহ দয়া দাক্ষিণ্য কাজ করে যা মানবতার উপাদানগুলোকে ম্লান করে দেয় বা অস্বীকার করে। সেই জন্যই বেশি বয়স বা মর্যাদার পার্থক্যের মধ্যে সম্পর্ক  বা মেলামেশা দেখা দিলে `ইয়ারের পাত্র`, `প্রশ্রয়` এর মত বিশেষণ প্রয়োগ হতে দেখি। নি;শর্ত আত্মসমর্পনের একটা ফ্যাসিস্ট দর্শন সচেতন বা অবচেতন মনে জাগ্রত থাকে। বন্ধুত্বকে আলাদা এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক বলে গন্য করা হয় যেখানে সহমর্মিতা ও নির্ভরশীলতার উপাদানগুলো সম্পর্কের শর্ত হিসেবে উপস্থিত থাকে।

.

সেখানেও খুব সুক্ষভাবে `কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়` তবেই দায়বদ্ধতার প্রশ্ন বলে বন্ধুত্বকেও শর্তসাপেক্ষের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়। আমরা আমাদের মানবিক সম্পর্ককে এভাবে দেখি না। বন্ধুত্ব সব সম্পর্কের .কেন্দ্রবিন্দু  আমাদের আলোচনায়। শত্রুতার সম্পর্কের জায়গা নেই এখানে। এটাকেই আমরা মানবিক সম্প্রর্কের অর্থনীতি বলে চিহ্নিত করেছি। অমিলের মধ্যে মিল ঘটিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করার শৈলিতাই এই অর্থনীতির মৌলিক বিষয়। পারস্পরিক সহমর্মীতা দায়বদ্ধতা নির্ভরশীলতা শুধু বস্তুগত উৎপাদন নয় অবস্তুগত উৎপাদনেও নৈপুণ্য আনে। এই মানবিক সম্পর্ক আমাদের যে আনন্দ দেয় তাকে আমরা অবস্তুগত উৎপাদন বলতে পারি।

.

আমরা দেখি যে মানুষে মানুষে মানবিক সম্পর্কটা মানবিক সম্পর্কের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু, মামুলি মানবসম্পর্ক নয়। কোন সম্পর্ক তখনই মানবিক  সম্পর্ক বলে ববেচিত হয় যখন উপরোক্ত সহমর্মিতা নির্ভরশীলতা দায়বদ্ধতার মত উপাদানগুলি ক্রিয়াশীল থাকে। উপরোক্ত উপাদানগুলি যে কোন মানবসম্পর্ককে মানবিক সম্পর্কে রুপান্তরিত করে। তখনই মানবিক সম্পর্কের অর্থনীতি ধারনাটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

.

আমরা চলতি মানবসম্পর্ককে নানা সম্পর্কে ভাগ করি।  যেমন পরিবারের মধ্যে বাবা মায়ের সংগে সন্তানের সম্পর্ক স্বামী স্ত্রীর মধ্যে  সম্পর্ক, পরিবারের বাইরে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্ক প্রভৃতি। দুটি মানুষের মধ্যে দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন মিলের উপাদান থাকে তার থেকে অনেক বেশি অমিলের উপাদান থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থসামাজিক  অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন অমিল প্রবেশ করে আগের অমিল দূর হয়ে মিলে পরিণত হয় বা অমিলের চরিত্র বদলে দেয়। আবার নতুন মিলের উপাদান প্রবেশ করে। ফলে বন্ধুত্ব এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। এটা গতিময়।

.

 পুরনো সম্পর্কে ছেদ পড়তে পারে নতুন কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে। অমিলগুলোকে মানিয়ে নিয়ে পরস্পর মিলের ক্ষেত্রকে সংহত করে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হয়। মানুষের মধ্যে যেমন সহমর্মিতা, দায়বদ্ধতার মত গুণগুলো  আছে তেমনি হিংসা পরশ্রীকাতরতার মত দোষগুলো-ও আছে। দুটি মানুষ বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার পার্থক্য সুযোগের পার্থক্য পরস্পরের আকর্ষণ থেকে বিকর্ষণের শক্তিকে বেশি শক্তিশালী করে তুললে অমিলগুলোকে মানিয়ে নিয়ে বন্ধুত্ব   স্থাপনের পথে বাধার সৃষ্টি হতে পারে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে কোন অমিলগুলোকে মানিয়ে নেওয়া যায় আর কোনগুলোকে মানিয়ে নেওয়া যায় না।

.

যদি অমিলগুলো এমনই হয় যে তা মানানো যায় না তখন বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে না। যেমন একজন আরেকজনকে শোষন করে নিজের প্রাচুর্য বাড়ায়। সেক্ষেত্রে যে শোষিত সে শোষককে মানিয়ে নিতে পারে না। আমাদের সমাজে তাও দুজনের মধ্যে মানব সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে উভয়ের প্রয়োজনে। যেমন কারখানার মালিক আর শ্রমিক। এই সম্পর্কে মানবিক সম্পর্কের  উপাদানগুলি অনুপস্থিত বা দুর্বল থাকে। কোথাও ব্যতিক্রম দেখা যেতে পারে।

.

কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম সাধারণ ভাবে সত্যি নয়। এসব ক্ষেত্রে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে অমিলকে মানিয়ে নয় তাকে দূর করে অর্থাৎ শোষণ ব্যবস্থাকে দূর করে.। চলতি ব্যবস্থাকে দূর করে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়। এই বিষয়টা খুবই গুরুত্বপুর্ণ কিন্তু সেটা এখানে আমাদের বিশদে আলোচনার বিষয় নয়।

.

  দুজনের মধ্যে মিলের ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন সহজ। অমিলগুলোকে মানিয়ে নিয়ে সম্পর্ক স্থাপন তেমন সহজ নয়। তবে অমিলগুলো বন্ধুত্ব সহায়ক হতে পারে।  কেউ ভালো খেলোয়ার। আরেকজন নিজে খেলতে পারে না কিন্তু খেলা ভালবাসে তাই সে খেলোয়ারের বন্ধুত্ব চায় । এক্ষেত্রে অমিলের উপাদান থাকলেও তা সম্পর্ক স্থাপনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করে । খেলার প্রতি ভালোবাসা সম্পর্ক স্থাপনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। যে সব ক্ষেত্রে  অমিলকে মানিয়ে নেওয়া যায় কিন্তু সেখানে সম্পর্ক স্থাপনের উপাদান সক্রিয় নয় সেসব ক্ষেত্রে দুজনকেই সচেতনভাবে অমিলগুলোকে মানিয়ে নিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। এই অমিলগুলো রেখে বন্ধুত্ব করলেও কারও ক্ষতি হয় না।

.

এ ধরনের অমিলগুলো থেকে উদ্ভুত বৈরিতাকে অশত্রুতামূলক দ্বন্দ্ব বলা হয়। এদের সঠিক ভাবে  বিবেচনা করে সরিয়ে রাখতে সব সময় সকলে পারে না । বেঠিক ভাবে একে মোকাবিলা করলে যাকে বন্ধু করা যায় তাকে দূরে ঠেলে দেওয়া হয়। এমনকি সে শত্রুশিবিরে চলে যেতে পারে। এই অহেতুক বৈরিতা মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করে সম্পদ সৃষ্টির কাজে প্রতিবন্ধক হতে পারে। অর্থাৎ বন্ধুত্ব স্থাপন যেখানে সম্পদ সৃষ্টিতে সমাজের জন্য এবং ব্যক্তির জন্য সম্ভব ছিল সেটা হতেতো পারেই না বরং সম্পদ  সৃষ্টিতে বাধা হয়। মানবিক সম্পর্কের অর্থনীতির আলোচনার এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক।

.

      কয়েকটা উদাহরনের সাহায্যে আমরা মানব সম্পর্কের অর্থনীতির দিকটা তুলে ধরতে পারি। শুরু করা যাক পরিবারের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক দিয়ে। আমাদের সমাজে বিয়ে মানে পরিবার নামে একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা যাতে সন্তান উৎপাদন, তার পরিচর্যা, ঘরের কাজকর্ম সুসম্পন্ন হোতে পারে। বাইরে অর্থ উপার্জনে কর্মরত স্বামীর রোজগারে সংসার চলে।  এখানে একধরনের শ্রমবিভাগ চালু থাকে যেখানে মেয়েরা সন্তান উৎপাদনের, পরিবার প্রতিপালনের যন্ত্র। মেয়েদের কাজের মূল্য যথার্থ স্বীকৃতি পায় না।

.

তা দেশের জাতীয় উৎপাদনের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচ্য নয়। পুরুষরা অর্থের বিনিময়ে কাজ করে বলে সেটা স্বীকৃত। পুরুষদের দ্বারাই সংসার চলে বলে মনে করা হয়। পুরুষরা সংসারের কর্তা বলে বিবেচ্য। অথচ আজ এটা প্রমানিত সত্য যে বাইরের বহু কাজে মেয়েরা ছেলেদের থেকে বেশিতো কম দক্ষ নয়। আবার রান্নার মত কাজে পুরুষরা যেখানে অর্থের বিনিময়ে কাজ করে সেখানে তারা যথেষ্ট দক্ষতার সংগেই কাজ করে এবং তার জন্য স্বীকৃতি পায়। সুতরাং এই শ্রমবিভাগের বিষয়টি মিথ্যা এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। পরিবারে পুরুষ প্রাধান্যবাদের ভিত্তি। এই ধারণা পরিবারের মধ্যে পুরুষদের স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে।

.

উচ্চবিত্ত পরিবারে বাইরে থেকে লোক নিয়োগ করে সংসারের কাজ করিয়ে নেওয়া হয়। বাড়ির স্ত্রী সন্তান প্রতিপালনের বাইরে অনেকটা অবসর জীবন যেখানে যাপন করে সেখানে মানবিক স্ম্পদের অপচয় হয়।  একেবারে গরিব ঘরে মেয়েরা বাইরে কাজ করে। কিন্ত একই কাজের জন্য তাদের মজুরি কম। আর সামন্ততান্ত্রিক পুরুষ প্রধান সমাজের সংস্কৃতিতে আষ্টে পৃষ্টে বাধা থাকে বলে মহিলারা বাইরের কাজ করলেও অবস্থার তেমন কিছু রকমফের হয় না। দেখা যায় বাইরে কাজ করেও তাদের ঘরের সব কাজ করতে হয়। এই অবস্থায় স্বামী স্ত্রীর বন্ধু নয় কর্তা। প্রচলিত সংস্কৃতিতে সেটাই চল।

.

কেউ কেউ  এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। স্ত্রীর গর্ভে সন্তানের জন্ম  স্বামীর গর্ভে নয়। স্ত্রীর স্তনের দুধে তার বেড়ে ওঠা যেখানে সেখানে সন্তান ও পরিবারের রক্ষনাবেক্ষনে মহিলাদের বিশেষীকরণে আপত্তি কোথায়? এটাইতো স্বাভাবিক। এই চিন্তা মেয়েদের কেবল বছরের পর বছর ধরে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বলে ভেবে আসতে অভ্যস্ত। কিন্ত  তা হতে পারে না। আজ পরিবার পরিকল্পনা স্বীকৃত। সন্তানের জন্ম ও তার মাতৃ দুধের প্রয়োজনে একজন মহিলাকে সারাজীবন গৃহবন্দী করে রাখাটা শুধু অমানবিক নয় বিপুল মানবসম্পদের অপচয়।

.

বিষয়টাকে মানবিক সম্পর্কের দৃষ্টিভংগিতে দেখলে সংশয় থাকার কথা নয়। কিছুদিনের জন্য মাকে সন্তানের  সর্বক্ষণের সাথী হতে হয়। কর্মরত থেকে কাজে ছুটি পেলে সমস্যা থাকে না। সন্তান যেহেতু সমাজের সম্পদ তাই দেশে নিয়ম চালু করে সরকারকে এটা করতে হয়। কিন্তু আমাদের সামাজিক কাঠামোয় মেয়েরা সেই সুযোগ কমই পায়। বরং তাদের ছলে বলে কৌশলে ঘর বন্দী করে রাখার ব্যবস্থা হয়। একই সংগে দেবী বন্দনা চলে তাদের ভুলিয়ে রাখার জন্য। বলা হয় সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে। অর্থাৎ  সুখ শান্তি বজায় রাখতে গেলে স্ত্রীকেই সংসারের যাবতীয় দাযিত্ব নিতে হয়।

.

সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা কিভাবে ভাবা যেতে পারে? যদি দুজনেই ঘরেও শ্রম দিতে ইচ্ছুক থাকে ( যেটা সমাজকে সভ্য বিবেচনা করার শর্ত) তবে দুজনেই বাড়িতে যে সময় দিতে পারে সেই সময়ে সন্তানের লেখাপড়া থেকে রান্না সব কাজ ভাগ করে নিতে পারে। এর জন্য দরকার পরস্পর সহযোগিতা সহমর্মীতা শ্রদ্ধা আর নির্ভরশীলতা তথা বন্ধুত্ব। এতে সমাজের স্বার্থে মানব সম্পর্কের  নিপুণতর ব্যবহার সম্ভব হয়। এখানেই লুকিয়ে আছে মানব সম্পর্কের অর্থনীতির বিষয়টা যা একদিকে নারী মুক্তির পথ প্রশস্ত করে অপরদিকে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশে সাহায্য করে। কিন্ত এই সমাজে এই দৃষ্টি ভঙ্গিকে `স্ত্রৈনতা` নামে একটি শব্দ ব্যবহার করে বিদ্রুপ করা হয়।

.

সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে বলে নারী বন্দনার নামে পরিবারের কারাগারে তাকে বন্দী রাখা হয়। পরিবারের মধ্যে সম্পর্কটিকে আদেশ ও আনুগত্যের বন্ধনে আটকে রাখা হয়। একটা প্রাধান্যবাদ কাজ করে।   সেটা স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি সন্তানের সঙ্গে বাবা মায়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফলে যোগাযোগের প্রবাহ একতরফা হয়। বাবা মা আদেশ করে সন্তানরা তা পালন করতে বাধ্য হয়। ফলে সন্তানের মানসিক বিকাশ ব্যহত হয়। যুক্তির চেয়ে ভয় ভীতি বেশি কাজ করে। এটা ব্যক্তির বিকাশে বাধার সৃষ্টি করে বলে উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হয়।

.

এবার আসা যাক পরিবারের বাইরে সম্পর্ক প্রসঙ্গে। শিক্ষক ছাত্র সম্পর্কের ক্ষেত্রেও জ্ঞানের একতরফা প্রবাহ ঘটে। ছাত্রের প্রশ্ন থাকলেও সেটা মেটানোর চেষ্টা থাকে না। শিক্ষক যা বলেন তাকে বেদবাক্য বলে মেনে নেওয়ার প্রথা চালু থাকে। ছাত্রের ঔৎসুক্য মেটাবার চেষ্টা থাকে না।  ফলে ছাত্রের সম্ভাবনা বিকাশ লাভ করতে পারে না। শিক্ষকেরও যে শেখার আছে সেটা অস্বীকার করা হয়। জ্ঞান চর্চার প্রক্রিয়াটা বেনোজলে আটকে পড়ে । স্বৈরতন্ত্রের পরিবেশে জ্ঞানের চর্চা কখনও উৎকৃষ্টতা লাভ করতে পারে না। এতে ছাত্রের জ্ঞানবিকাশ যেমন হয় না তেমনি শিক্ষকের জ্ঞানের মাত্রা আটকে থাকে। নতুন আবিষ্কার ও নিপুনতার সঙ্গে কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয় যা শেষ বিচারে মানব সম্পদের বিকাশের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

.

দেখা যায় কারখানা বা অফিসে উর্ধতন ও অধস্তনের মধ্যে সম্পর্কের  ক্ষত্রে ধমকে কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রথা চালু থাকে। কারখানায় শ্রমিককে নিদ্দৃষ্ট পরিমান কাজ নিদৃষ্ট সময়ে করিয়ে নেওয়ার ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হয়। বন্ধুত্বের সম্পর্ক এখানে থাকতে পারে না বলে মনে করা হয়। শ্রমিকের অভিজ্ঞতা নতুন কিছুর জন্ম দিতে পারে এবং সেখানে পরিচালকের শেখার আছে বলে মনে করা হয় না। শ্রমিকও রুটিনমত কাজ করে। ফলে উৎপাদিকা শক্তি বিকাশ লাভ করতে পারে না। এটাও মানব সম্পদের অপচয়। দেশের অথনীতি যতটা বিকাশ লাভ করতে পারত তা করে না।  উপরোক্ত বিভিন্ন সম্পর্ক নেহাতই আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক। বন্ধুত্বের স্থান এখানে নেই।

.

উর্ধতন অধস্তনের মধ্যে যতটুকু ভাল সম্পর্ক থাকে সেটা নেহাৎ উর্ধস্তনের অনুগ্রহ বলে বিবেচিত হয়। তাই দেখা যায় যতদিন কোম্পানির লাভ ততদিন শ্রমিকরা তাদের সম্পদ। বাজারের অভাবে বা অন্য কোন কারণে লাভে টান পড়লে শ্রমিকরা দায় বলে বিবেচিত হয়। যে ভাবেই হোক এই দায় ঝেড়ে ফেলা হয়। বিনা নোটিশে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শ্রমিক মালিকের আসল সম্পর্কটা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে।

.

আমরা আমাদের আলোচনায় সম্পর্ক বলতে  কি বুঝি এর মধ্যে বন্ধুত্বের উপাদানগুলো কিভাবে কাজ করে এবং উৎপাদন ক্ষমতার সঙ্গে তা কিভাবে যুক্ত তা দেখলাম। মানবিক সম্পর্কের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের পার্থক্য কি তাও আমরা দেখলাম। অামরা দেখেছি সব সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্বের উপাদানগুলো থাকলেই তা মানবিক সম্পর্ক হয়ে ওঠে। মনে রাখা দরকার যে একটা সুস্থ ব্যবস্থার মধ্যেই এই সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।

.

সুতরাং শেষ বিচারে বিকল্প সুষ্ঠ ব্যবসার অনুসন্ধান  মানবিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। আর মানবিক সম্পর্ক দেশের উত্পাদন ক্ষমতা বাড়াতে যেমন সাহায্য করতে পারে তেমনি মানুষকে হিংসা বিদ্বেষের হাত থেকে রেহাই দিয়ে আনন্দের সঙ্গে জীবন যাপনে সাহায্য করতে পারে। এই সমগ্রতা নিয়েই আমাদের মানব সম্পর্কের অর্থনীতি।

.

(খুব সংক্ষেপে বিষয়টা আলোচনা করা হলো। এর ওপর বিস্তারিত আলোচনা ও গবেষণার সুযোগ আছে। আমি যেভাবে ভেবেছি সেভাবে লিখেছি। সেটা যথেষ্ট নয়। এর বহুমাত্রিক দিক বর্তমান। তাই আলোচনা চলুক।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *