মানসী

সুদীপ ঘোষাল

রমেন ও রজনীর একমাত্র কন্যা মানসী  ছোটো থেকে লেখা পড়ায় খুব ভালো ।যখন ও জন্মগ্রহণ করেছিলো তখন বাড়িতে তাদের আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিলো । শঙ্খ ধ্বনি আর প্রতিবেশী দের মিষ্টান্ন বিতরণের মধ্যে জন্ম পর্ব এক উৎসবের সাজে সজ্জিত হয়েছিলো ।

তারপর ধীরে ধীরে মা বাবার আদরে বড় হতে লাগলো মানসী । সাফল্যের সিঁড়ি একের পর এক পেরিয়ে মানসী সকলের মনের মণিকোঠায় স্থায়ী আসন লাভ করেছিলো ।

এবার আঠারো বছরে পড়েছে মানসী । পূর্ব স্থলী কলেজে ভর্তি হবে ।মানসী আজ খুব ব্যস্ত ।

___বাবা আমার ব্যাগটা দাও তো ।

,__,ট্রেন কটায় রে মামণি

_,_,দশটা দশে ..

__তোর মাকে আজ সঙ্গে নিয়ে যা

___,না বাবা , আমি বন্ধু দের সাথে ঠিক চলে যাবো ।

মানসী বেরিয়ে যাবার পরে মা বাবার খুব চিন্তা বেড়ে গেলো । কোনোদিন এত দূরে যায় নি ।

যাইহোক ঠিক পাঁচটার সময় মানসী বাড়ি ফিরে এলো ।

____এবার ও একা সব কাজ করতে পারবে বুঝে ছো।

___হ্যাঁ ঠিক বলেছো ।

মানসীর বাবা মা কথা বলে চলেছে । মানসী ওঘরে  পড়ছে ।

বেশ সুন্দর ভাবে দিন কেটে যাচ্ছিলো । সকলের বিপদে আপ দে মানসী উদার মনে ঝাঁপিয়ে পড়তো  ।সকলেই তাকে কন্যা শ্রী বলে ডাক তো ।

ক্যারাটে চ্যাম্পিয়ন হিসাবে কন্যাশ্রী পুরস্কার ও পেয়েছে মানসী । আর এবার আঠারো বছরে পাবে সমাজ সেবার জন্য বিশেষ পুরস্কার ।

রমেন ও রজনীর মেয়েকে নিয়ে খুব গর্ব । কজনের  ভাগ্যে এমন কন্যা রত্ন জোটে ।

কিন্তু চিরদিন সুখ দুঃখ চক্রাকারে পাক খায় ।

আজ ১৫ই আগষ্ট । মানসীর কলেজে উদযাপন হবে এই দিনটি । মানসী আজকের অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ । আজ সমাজ সেবার জন্য বিশেষ পুরস্কার তাকে দেওয়া হবে । মানসীর বাবা ও মা আজ কলেজে এসেছে।

___দেখো আমাদের মানসীকে আজ ভারত মাতার মতো লাগছে ।

___,হ্যাঁ ঠিক বলেছো ।

মানসীর বাবা ও মায়ের চোখে আনন্দের অশ্রু । আজ তাদের স্বপ্ন সফল । মেয়ে তাদের আজ সত্যিকার মানুষ হয়েছে ।

অনুষ্ঠান শেষে মানসী বাবা মার কাছে এসে প্রণাম করলো । মাইকে  তখন ঘোষণা হচ্ছে, এবার বক্তব্য রাখবেন মানসী হাজরা ।

মানসী স্টেজে উঠে বললো, মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে । মানুষের মত মানুষ  হতে হবে । কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করলে হবে না । প্রতিবাদ করা শিখতে হবে । সমাজ সেবার জন্য জীবন পণ করতে হবে ।…

মানসীর বাবা মা শুনছে মন দিয়ে মানসীর কথা ।

রজনী বলছেন ,বড় ভয় হয় মেয়েটার জন্য । কি যে হবে জানি না ।

রমেন বলে, না না দেখো ও একদিন মস্ত  বড় হবে ।

তার পর মানসী বাবা মা কে নিয়ে  পাঁচ টা পাঁচের লোকাল ধরতে স্টেশনের পথে রওনা হলো ।

স্টেশন পৌঁছে রমেন ও রজনী দেখলো মানসী পাগলের মত ছুটছে । রমেন ডাকছে, কি হলো  , ছুটছিস কেন?

মানসীর বাবা ও মা মেয়ের পিছু পিছু ছুটছে । তারা দেখলো আত্মহত্যা র জন্য একটা মেয়ে লাইনের উপর শুয়ে আছে। ট্রেন কাছাকাছি এসে গেছে । তাকে সরিয়ে মানসী ওপাড়ে লাফ দিলো । এই মেয়েটাকে ওরা ধরে ফেলেছে কিন্তু মানসী কোথায় ।

তারপর ট্রেন চলে গেলে ওরা দেখলো মানসীর ছিন্ন ভিন্ন শরীর । মানসী আর বেঁচে নেই । নিজে মরে গিয়ে একটা প্রাণ বাঁচিয়ে গেলো ।

মানসীর মৃত খন্ড খন্ড শরীর দেখে তার বাবা,মা দুজনেই জ্ঞান হারালেন ।

মেয়েটি চিৎকার করে লোকজন ডাকতে শুরু করলো । প্রচুর লোকজন এই মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইলো ।

পুলিশ যথাসময়ে তাদের কর্তব্য সমাপন করলেন । মানসীর টুকরো শরীর দাহ করলেন এলাকার সমস্ত শোকস্তব্ধ অধিবাসী বৃন্দ ।

মেয়েটিকে রমেন এবার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কি?

___আমার নাম শুভশ্রী

____তুমি কেন মরতে চাইছো

____আমার কেউ নেই । দুজন শয়তান আমাকে অত্যাচার করেছে, তাই আমি আর এ জীবন রাখতে চাইছি না ।

____তা হলেই কি সব সমস্যা র সমাধান হবে ।

____না, আপনার মেয়ে আমার জীবনের গতিপথ পাল্টে দিয়েছে । আমি পড়াশুনা করে বড় হয়ে এর জবাব দেবো

তারপর রমেন ও রজনী যুক্তি করে শুভশ্রীকে লিলুয়া হোমে দিয়ে এলো । সমস্ত খরচের দায়িত্ব নিলো রমেন ।

কিন্তু বাড়িতে তাদের মন মানে না । দেওয়ালে দেখে মানসীর নাম খোদাই করে লেখা । ঘরে তার বই পত্তর, পোশাক আসাক । সবেতেই মেয়ের দেহের ঘ্রাণ ।

আজ এক বছর হয়ে গেলো তারা দুজনেই মেয়ের শোকে চোখের পাতা বুজতে পারে নি । জীবন অর্থ হীন , ফালতু হয়ে পড়েছে । শুধু মেয়ের শেষ কথাটাই. মনে পড়ে, মানুষের জন্য জীবন পণ করতে হবে ।

____কি কর লি  মানসী ,,একবার আমাদের কথা মনে কর লি না__এই কথা বলে রোজ রজনী কেঁদে যায় প্রতি ক্ষণে ।

আর রমেন তো উচ্চ স্বরে কাঁদে না । তার মর্মভেদী নিঃশব্দ আর্তনাদ অন্তরের গভীরে জমা হয়ে এক শোক সমুদ্র তৈরী করে । যার তল পাওয়া সাধারণ লোকের বাইরে । লোকজন দেখলে এড়িয়ে যায় ।

সবাই তাকে দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারে না । কালচক্র তো থেমে থাকে না । বছরের পর বছর চলে যায় কিন্তু মনের মানসী তার বাবা মায়ের মন থেকে যায় না ।

আজ আবার স্বাধীনতা দিবস । সকাল সকাল সকলে তৈরী হয়ে স্কুল কলেজে ছুটি লাগিয়েছে ।হঠাৎ শুভশ্রী র ভিডিও কলে মনের রজনী ঘুচলো রজনীর । মোবাইলে জানতে পারলো আজ কলেজে মাননীয় মন্ত্রী মহাশয় শুভশ্রী কে কন্যা শ্রীর পুরস্কার দেওয়া হবে । তাই তাদের দুজনকেই যেতে হবে কলেজে ।

খুব তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে দুজনেই কলেজে গেলো । মন্ত্রী মহাশয় এসে গেছেন ।ওরা দুজনেই দেখছে শুভশ্রী মানসীর সাজে সজ্জিত হয়ে বসে আছে । দুজনের মুখেই হাসির ঝিলিক ।

রজনী বলছে, দেখো দেখো মানসী ফিরে এসেছে। ও এবার পুরস্কার নেবে । রমেন রজনীর মাথা কাঁধে নিয়ে কেঁদে চলেছে ।

ঠিক তখনই মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, এবার সমাজ সেবার জন্য কন্যা শ্রী পুরস্কার পাচ্ছেন শুভশ্রী ।

ওরা  আপন খেয়ালে তখনও শুনে চলেছে,এবারের কন্যা শ্রী, মানসী মানসী । আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ………..

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *