মুখস্থ বললেই আবৃত্তি হয় না – কাজল সুর

আমার মনে একটা জিজ্ঞাসা ছিল যে আবৃত্তি আদৌ একটা শেখার বিষয় কিনা। আমরা যখন আবৃত্তিটা শুরু করি তখন এখনকার মতাে আবৃত্তির কোনাে বই আমাদের চোখে পড়েনি এমনকি আবৃত্তি চর্চার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছিল না। বলা যায় বিষয়টা তখন  শ্রুতিশিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

শুনে শুনে একটা ধারণা গড়ে উঠতাে নিজের মধ্যে। তারপর স্রেফ মুখস্থ করলেই হয়ে যেত, যেমন কি না খুব ছােটবেলায় মায়ের শেখানাে ছড়া কবিতা মুখস্থ করে তােতাপাখির মত উগরে দিলেই আবৃত্তি হয়ে যেতাে। এখনও অনেক আবৃত্তিকারের স্মৃতিশক্তি দেখলে ভিরমি খেতে হয়। এই স্মৃতিশক্তি আরাে অনেক শক্তপােক্ত, যাকে বলে একদম ঠোটস্থ।

একের পর এক কবিতা নিরাসক্তভাবে এইসব আবৃত্তিকাররা মঞ্চে আবৃত্তি করেন -আত্মীয়স্বজন এবং বেশ কিছু শ্রোতার করতালির মধ্যে দিয়ে এরা অনুষ্ঠান শেষ করেন, এমন কি দু’চারজন দাদাস্থানীয় কাগজের সমালােচককে আরাে কোন বড় দাদাস্থানীয়কে দিয়ে ফোনে তদ্বির করিয়ে দু-কলম প্রশংসা আদায় করেন। কিন্তু অচিরেই নিজেদের স্ব-আয়ােজিত অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনও জায়গায় সুযােগ বা আমন্ত্রণ না পেয়ে মরিয়া হয়ে প্রতিষ্ঠিতদের উদ্দেশ্যে বিষােদগার করা শুরু করে দেন।

ভাবখানা এই রকম যে “আমিও ঐরকম সুযােগ পেলে একেবারে কাপিয়ে দিতাম। খবরও রাখার এরা প্রয়ােজন মনে করেন না যে স্বনামধন্যরা ঐ স্রেফ করার বাইরেও মঞ্চে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে কবিতাটিকে নিয়ে আর কি কি করেন। এই সব আবৃত্তিকারাে না শােনেন ভাল করে নিজেরটা মন দিয়ে, না শােনেন অপরেরটা। নিজেরটা কিভাবে শুনবেন ? খুব সহজ একটি টেপরেকর্ডারে প্রতিটি কবিতা রেকর্ড করলেই তােসবটা ধরা পড়ে যায় – ধরা পড়ে যায় যে আদৌ কবিতাটির মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হল কিনা?

কিংবা তিনি আদৌ এই শিল্পের যােগ্য কিনা? শম্ভু মিত্র, একা এক জায়গায় বসে তিন ঘন্টার মত পড়ে যেতেন ‘চাঁদ বণিকের পালা। লােকে আগের দিন থেকে লাইন দিয়ে টিকিট কিনবার চেষ্টা করত। এটা কি আবৃত্তি নয়? তিনি বেশীরভাগ কবিতাই স্মৃতি থেকে বলতেন।

তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ালাে ? দাঁড়ালাে এই যে খালি মুখস্থ করলেই হয় না। এর জন্যে আরাে কিছু লাগে। যাঁরা সেই ‘আরাে কিছু আয়ত্ত করতে পারেন তারাই শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত হন-শ্রোতাদের ঘনঘন আমন্ত্রণে সফল আবৃত্তিশিল্পীর মর্যাদা পান।

মুখস্থ করাটা বলা যায় একটা প্রতিষ্ঠান গড়ার শুরুর মুহূর্তে একটা খড়ের কাঠামাে মাত্র। এইবার ঐ খড়ের কাঠামাের ওপরে মাটি, রং, অলঙ্কার, ঘাম, তেল দিয়ে তৈরী করতে হয় এক জীবন্ত প্রতিমা। কেবলমাত্র সফল আবৃত্তিকারের ঝুলিতেই থাকে ঐ মাটি রং, অলঙ্কার; একমাত্র সফল আবৃত্তিকারই জানেন

এ সব উপকরণ দিয়ে কিভাবে সত্যিকারের একটি প্রতিমা গড়তে হয়। আর এই গড়ে ওঠা  প্রতিমার ওপরে যদি এখনকার নানান ধরনের প্রয়ােজনীয় প্রযুক্তির আলাে ঠিকমত ফেলা যায়

তাহলে তাে আর কথাই নেই – মানুষের আগ্রহ এতে আরাে বেড়ে যাবে এ বিষয়ে তাে কে সন্দেহই নেই এই কারণেই দেখা যায় ছােটরা স্রেফ মুখস্থ করে যখন আউড়ে দেয় তখন উৎস দেবার জন্য বাধ্য হয়ে হাততালি দেওয়াটাই রেওয়াজ কিন্তু আসলে তাে ওটা শিল্প হল না। হতে হলে কবিতাটি বলতে হবে একদম ভিতর থেকে।

নিজের অনুভবে কবিতাটি জারিত হয় তবেই তাে অন্যদের অনুভবকে তা স্পর্শ করবে। এই ভেতর থেকে বলাটা কি এক আধদিন সম্ভব ? আমার তাই তখন খুব অস্বস্তি লাগে যখন দেখি কেউ কেউ বলে কাজলদা, তােমার প্রতিষ্ঠিত হতে লেগেছে ১৫-২০ বছর। আমাদের এক-দুবছরই যথেষ্ট। প্রতিষ্ঠিত হওয়া কাকে বলে কে জানে! ভাল আবৃত্তি করাটাই মূলকথা । আসলে এটা কি সম্ভব ? অল্পতেই বাজিমাৎ ।

কারণ ঐ মুখস্থ করা ছাড়া আবৃত্তি করতে গেলে আর যা যা দরকার যেমন কণ্ঠচর্চা, উচ্চারণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা, ছন্দোজ্ঞান, বােধ, অভিব্যক্তি – সর্বোপরি সেকাল এবং একালের সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপক জ্ঞান। এ কি একদিনে হওয়া সম্ভব, না এক বছরে হওয়া সম্ভব! যাঁরা বলেন, আমি বলি তারা ভাবের ঘরে চুরি করেছেন।

তাই আবার বলি মুখস্থ করলেই আবৃত্তি হয় । আবৃত্তির জন্য আরাে বাকী বিষয়গুলির জ্ঞান এবং অভিজ্ঞান প্রয়ােজন।সকলে তাে প্রকৃতিগত প্রতিভা নিয়ে জন্মায় না। সকলে তাে কাজী সব্যসাচীরমতকণ্ঠস্বর নিয়েও জন্মায় না। তা বলে কি আবৃত্তি থেমে গেছে? তা নয়, কিছুটা থাকলে, বাকীটুকু চর্চা আর সাধনার দ্বারা অবশ্যই সম্ভব।

প্রশ্ন হচ্ছে সেই সাধনাটা কেমন? কি? প্রথমতঃ একজন আবৃত্তিকারকে প্রচুর কবিতা তৈরী রাখতে হবে। তৈরী কথাটা এই কারণে ব্যবহার করলাম যে একটি চিত্রনাট্য হাতে পাওয়ার পর তার থেকে তৈরী হয় একটি চলচ্চিত্র। এটাও তেমনি এক একটি কবিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাবার পর তবেই আবৃত্তিকার তার স্বরলিপি তৈরী করবেন অর্থাৎ কবিতাটি তিনি কিভাবে বলবেন। এই দীর্ঘ দিন ধরে একটা কবিতা নিয়ে পড়া আর ভাবার মধ্যে দিয়েই কবিতাটি স্মৃতিতে পাকাপােক্ত আসন করে নেবে।

কবিতাটি সম্পর্কে আবৃত্তিকারের একটা বােধ জন্মাবে। ধরে নেওয়া যেতে পারে অভিব্যক্তি কণ্ঠচর্চা-ছন্দচর্চা-উচ্চারণ সম্পর্কে স্বচছ ধারণা ইত্যাদি বিষয়গুলির বিভিন্ন ধাপ এই আবৃত্তিকার পূর্বেই অতিক্রম করেছেন। কবিতাটা সম্পর্কে হয়তাে আবৃত্তিকার মার মধ্যে নতুন কোন ভাবনার প্রকাশ ঘটছে—এতে দোষের কিছু নেই।

আবৃত্তিকার তাে কেবলমাত্র কবিতার বাহক হতে পারনেনা তিনি তাে একজন স্রষ্টা, তিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চলেছেন আবৃত্তির মাধ্যমে অবশ্য এর মানে এই নয় যে কবি যা বলতে চেয়েছেন আবৃত্তিকার বেশী বুঝে সেই ভাবনার উল্টোদিকে শ্রোতাদের নিয়ে যেতে চাইছেন। আসলে আবৃত্তিকার নিজের মধ্যেই এক অনন্য চিত্রকল্প তৈরী করবেন এবং সেই চিত্রটিই তিনি শ্রোতাদের সামনে ভাসিয়ে দিয়ে মুগ্ধ করে মঞ্চ ছেড়ে চলে যাবেন।

অবশ্য এই মুগ্ধতা সেই মুগ্ধতা, যাতে থাকবে কবির কবিতার মাধ্যমে প্রেরিত বার্তাটি-শ্রোতারা সেই বার্তাটি নিয়েই ঘরে ফিরবেন, বদলে তারা যদিআবৃত্তিকার কেমন সুদর্শন বা সুদর্শনা, কিংবা কী অসাধারাণ কণ্ঠ, কিংবা কি দারুণ মিউজিক, কিংবা কি আলাের ব্যবহার- এইসব আলােচনা করতে করতে ঘরে ফেরেন তাে বুঝতে হবে কবির কবিতাটি আবৃত্তিকার জেনে বুঝে হত্যা করলেন। তাহলে কবির কবিতাকে হত্যা করা যায় এইভাবে যে আবৃত্তিকার বেশ কিছুকবিতা মুখস্থ করে ফেলে সাউন্ড সিস্টেম, মিউজিকও আলাে  সহমঞ্চে দাঁড়িয়ে স্মৃতিটি উগরে দিলেন শ্রোতাদের সামনে এবং কিছুনা বােঝা মানুষের হাততালি নিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে গেলেন।

শ্রোতারা স্মৃতি আর মিউজিক আলােকে দিল বাহবা। চর্চা আর সাধনা ছাড়া আবৃত্তিকার কিছু চঞ্জলদি পিঠ চাপড়ানাে এবং অর্থও পেলেন— এতে হয়তাে আবৃত্তিকারের একটা তাৎক্ষণিক লাভ হল কিন্তু অচিরেই সেই সব কথার বাণ যখন বিজ্ঞজনের কাছ থেকে আবৃত্তিকার শুনবেন তখন তিনি সামান্য লাভের বদলে চিরকালীন লােকসানের স্বখাত সলিলেই ডুবলেন। সেই বিজ্ঞজনের কথাগুলাের একটি হবে অনেকটা এইরকম যে ওর সব কিছু ভাল কেবল আবৃত্তিটা ছাড়া। মিউজিক, আলাে, নিশ্চয়ই সাহায্যকারী হিসেবে থাকবে, |

কিন্তু তা আবৃত্তিকে সাহায্য করুক পাঁচ থেকে দশ ভাগ। বাকীটা ছন্দ, যতি, অভিব্যক্তি, সঠিক উচ্চারণ, বােধকে সঙ্গী করে কণ্ঠের ব্যবহার এরজন্যে চাই নিরল কণ্ঠচর্চা। এই চর্চার মাধ্যমে কষ্ঠের বিভিন্ন স্তর বলতে বােঝাচ্ছি—ন্যাজাল, অ্যাবডােমেন, উঁচু স্বর, খাদে কথা বলা ইত্যাদি

বেং এর জন্য প্রয়ােজনীয় দম থাকা, অত্যাবশ্যক। আর দম বেশী রাখতে গেলে নিজের স্বাস্থ্যটি | সর্বদা ভাল রাখতে হবে এবং সেটা পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত। কেবলমাত্র গমগমে ভারী গলা হলেই ভাল আবৃত্তিকার হবেন এমন মনে করার কোন কারণ নেই। স্বরের নানান স্তরের ব্যবহার আবৃত্তিকারকে আয়ত্ব করতেই হবে এবং এই নিজের স্বরকে জানা-চেনার মধ্যে দিয়েই স্থির হবে আবৃত্তিকারের কবিতা নির্বাচন।সব কবিতা সব আবৃত্তিকারকে মানাবে না, যেমন সব গান সব সঙ্গীত শিল্পীর গলায় খুলবে না যে গান হেমন্ত মুখােপাধ্যায়ের কণ্ঠে মানানসই হত, সে গান নিশ্চয়ই মান্না দে-কে মানাতাে না।

আমাদের ল্যারিং-এর উপরের দিকে রয়েছে। স্বরতন্ত্রী, সেটা নিঃশ্বাসের জন্য কাঁপে এবং তখন আমাদের কণ্ঠস্বর সৃষ্টি হয়। এই স্বরকে ভালাে ভাবে চিনে নিয়ে আবৃত্তিতে প্রয়ােগ করতে হবে। কণ্ঠস্বরের সৌন্দর্য সকলের এরকম নয়। একমাত্র ভাঙা ছাড়া যে কোন কণ্ঠস্বরকেই নিয়মিত চর্চার মধ্যে দিয়ে আবৃত্তি উপযােগী করে তােলা যায়। এই উপযােগী কণ্ঠস্বর, আবৃত্তিকার একটি কবিতার মাধ্যমে, একটি আসরে কেবলমাত্র একটিবারই প্রয়ােগ করতে পারছেন।

এ বড় কঠিন কাজ। গানে তাও একটি লাইন অনেকবার রিপিট করা যায় কিন্তু আবৃত্তিকার একটি আসরে কেবলমাত্র একটিবার বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে চিত্রকল্পটি শ্রোতাদের সামনে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। সুযােগ কেবল একটিবার। তাই এই এত কিছু শিখে-জেনে-বুঝে তবেই আবৃত্তি করতে হয়  কেবলমাত্র স্মৃতিকে সম্বল করে এটা হয় না। আবার বলছি স্মৃতি দরকার, নিশ্চয়ই দরকার কিন্তু তার সঙ্গে চাই আর সব কিছু সেটা চটজলদি হয় না।

 

শম্পা সাহিত্য পত্রিকা //  সম্পাদনা : স্বপন নন্দী // যোগাযোগ : ৭৬৯৯২৪৯৯২৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: