মোগলমারী // অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

প্রফেসর দিবাকর সেন অধ্যাপনা ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে চলে এলেন কলকাতায় |. কিছু দিন শান্তিনিকেতনে পড়ালেন | ভালো লাগলো না ছেড়ে দিলেন |. মেতে উঠলেন গবেষণার কাজে |. বিষয় ইতিহাস আর পুরাতত্ত্ব | একই সাথে চলত বিভিন্ন সভা সমিতিতে বক্তৃতা দেওয়া আর পর্যটন .| কতই বা বয়স ? পঞ্চাশ অনেকটা দূরে কিন্তু ইতিমধ্যেই খ্যাতনামাদের পাশে জ্বলজ্বল করছে দিবাকর সেনের নাম |
খেয়া সেন প্রফেসর সেনের স্ত্রী | ডাকসাইটে সুন্দরী | কলকাতার এক নামী কলেজে পড়ান | রবীন্দ্রনাথ তার ধ্যান জ্ঞান | সদা হাস্যময়ী এবং মিশুকে | নিঃসন্তান | এতো বছর বিয়ে হয়েছে কিন্তু দাম্পত্য – কলহ হয়েছে বলে কেউ কখনো শোনেনি |
আমার সাথে দিবাকারদা ও খেয়া বৌদির পরিচয় একদম অদ্ভুত ভাবে | পুরুলিয়ার শোনকুপি গ্রামে আমি তখন দলবল নিয়ে আছি | আমাদের কাজ পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝে প্রকৃতিকে খুঁজে বের করা | মেঠো রাস্তার পাশে নতুন গড়ে উঠেছে একটা ড্যাম | ড্যামের ওপর দাঁড়িয়ে দেখছি ভোরের সূর্য বানজারা হিলসের মাথায় কিভাবে হামাগুড়ি দিয়ে উঠছে | কী সুন্দর না !
পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি এক ভদ্রমহিলা | একটু পেছনে একজন ভদ্রলোক | দেখে মনে হয় ওনার স্বামী |
ভদ্রলোক বললেন : খেয়া , ড্যামের ওপর উঠলে আরো ভালো দেখতে পাবে |
কিন্তু উঠবো কী করে ?
আমার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললেন : ওর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দাও | ও টেনে তুলবে |
ভদ্রমহিলা মুচকি হেসে বললেন : কী পারবে আমার ভার বইতে ?
বললাম : কেন পারবো না ? দাদা যখন অভয় দিচ্ছে , ভাই তো পারবেই |
দিবাকরদা ও খেয়া বৌদির সাথে এখান থেকেই আমার পরিচয়ের সূত্রপাত | দিন যত এগিয়েছে সম্পর্ক তত গাঢ়তর হয়েছে | গল্প -গুজব , খাওয়া – দাওয়া , ছুটি পেলেই বেড়িয়ে পড়া – এসব ছিল আমাদের রুটিন মাফিক |
একদিন এরকমই এক আড্ডায় দিবাকরদা বললেন : সামনের শনিবার ১২ই জানুয়ারী স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন |. সবার ছুটি | রোববারতো এমনি ছুটি .| দুদিনের জন্য আমরা আমার দেশের বাড়িতে বেড়াতে যাব |
কোথায় তোমার দেশের বাড়ি ?
কুকাই | পশ্চিম মেদিনীপুরে |
বৌদি বললেন : শুধু দেশের বাড়ি নাকি অন্য্ কোনো উদ্দেশ্য আছে ?
ঠিকই ধরেছ | ওখান থেকে সামান্য দূরে মোগলমারী | আর কিছু এখন বলবো না | বাকিটা ওখানে গিয়ে |
শনিবার ১২ই জানুয়ারী আমরা তিনজন দিবাকরদার স্করপিওতে | ঠিক হলো ভাগ করে চালাব আমি আর দিবাকরদা .| সকাল সাতটায় যাত্রা শুরু |
দিবাকরদা বললেন : কলকাতা থেকে মোগলমারীর দূরত্ব ১৭৩ কিলোমিটার | গাড়িতে সময় লাগা উচিত ঘন্টা চারেক | তবে ব্রেক গুলো যোগ করলে সময়টা বাড়বে .| আমাদের প্রথম ব্রেক কোলাঘাট | চা – জলখাবার | অবশ্যই সন্দীপ রেস্টুরেন্টে | এরপর খড়্গপুর দ্বিতীয় ব্রেক | পরবর্তী ৫২ কিলোমিটার এন এইচ ৬০ ধরে বেলদার দিকে | এরপর নিকুরসিনি রেল স্টেশনের সামনে থেকে মাত্র ১০ মিনিটের ড্রাইভ .| বাড়িতে গিয়ে লাঞ্চ |
দুপুরে খাওয়া – দাওয়া সেরে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম অদেখাকে দেখতে আর অজানাকে জানতে | গাড়ি এসে থামলো মূল ফটকের সামনে | অর্ধ চন্দ্রাক্রিত সাইনবোর্ড | নীল রঙের | তারওপর ইংরেজিতে সাদা রঙে লেখা ” মোগলমারি বৌদ্ধ মহা বিহার ” | নীচে ছোট করে লেখা তরুণ সেবা সঙ্ঘ ও পাঠাগার | ভেতরে প্রবেশ করলাম | চারিদিকে খনন কার্যের চিন্হ |
দিবাকরদা বলতে শুরু করলেন : জায়গাটা মোটামুটি ৪৩০০ স্কোয়ারগজ | পুরটাই ছিল উঁচু মাটির ঢিবি | ২০০২ -২০০৩ সালে প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের প্রধান ডক্টর অশোক দত্ত খনন কার্য চালান |
আমি বললাম : কিন্তু উনি এই ঢিবির কথা জানলেন কিভাবে ?
সে এক অদ্ভুত ব্যাপার | ছাত্রদের নিয়ে একবার এক্সকারশন এ গিয়ে আলাপ হয় নরেন বিশ্বাস নামক এক ভদ্রলোকের সাথে | উনি ছিলেন দাঁতন হাইস্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক | মোগলমারীর এই উঁচু ঢিবির কথা উনি বলেন ডক্টর দত্তকে | আরও বলেন যে ঢিবির ওপর দেখতে পাওয়া যায় বড় বড় বিভিন্ন আকৃতির প্রচুর ইট , ছোটো ছোটো কালো গোলাকৃতি পাথর যার ওপর পালি ভাষায় কিছু লেখা |আর আছে কিছু পটারিসের ভগ্নাংশ | উনারই আমন্ত্রণে ডক্টর অশোক দত্ত ২০০৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু সুদক্ষ আর্কিওলজিস্টকে নিয়ে শুরু করেন তার অভিযান | ধাপে ধাপে চলতে থাকে খনন কার্য | শেষ হয় ২০১২ সালে | ঢিবির ওপর যা যা দেখা গেছিল তা সবই সত্যি | তাঁর মতে এটাই পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ বিহার বা বুদ্ধিস্ট হাব | অন্য্ যে সমস্ত বৌদ্ধ বিহার আছে যেমন , নালন্দা , বৌদ্ধগয়া , প্রাচীন উড়িষ্যার পুষ্পগিরি , বালেশ্বর প্রভৃতির সাথে মোগলমারীর কোনো তফাৎ নেই | একটাই যোগসূত্র – সুবর্ণরেখা নদী |
দিবাকরদা বললেন : এবার নীচে এস | ভালো করে দেখ | এগুলোকে বলে স্টাকো ফিগার | গঠনগত দিক থেকে এটাকে দুভাগে ভাগ করা যায় | ৬ থেকে ৭ শতাব্দী আর ১১ থেকে ১২ শতাব্দী |
আমি বললাম : দিবাকরদা , স্টাকো কী ?
চুন , বালি ও কাদার এক ধরনের মিশ্রণ | হরপ্পা যুগে স্টাকো বিল্ডিং মেটেরিয়াল হিসাবে ব্যবহৃত হোত | এরপর গুপ্ত যুগে স্টাকো ডেকরেটিভ আর্টে উন্নীত হয় | অনুসূয়া দাসের মতে
বৌদি জানতে চাইলেন তিনি আবার কে ?
একজন বিখ্যাত আর্কিওলজিস্ট ও আর্ট হিস্টোরিয়ান .| তাঁর মতে মোগলমারীর স্টাকো ফিগারগুলো গুপ্ত যুগের |
 
উনি যুক্তি দিয়ে দেখান যে ফিগারগুলোর ভঙ্গিমা ,মুখের আদল শিল্প কলা এমন কী বিষয়বস্তুগত দিক দিয়েও গুপ্ত যুগের শিল্প কলার সাথে প্রচুর মিল খুঁজে পাওয়া যায় |
দিবাকরদা বললেন : এবার মিউজিয়ামটা দেখব |
ক্লাব ঘরটাই মিউজিয়ামে রূপান্তরিত হয়েছে | বারান্দায় ডক্টর অশোক দত্তের বিরাট কাট আউট | ফ্রেমে বাঁধানো ছবি | ভগবান বুদ্ধের ছবি | তারপাশে স্বামী বিবেকানন্দের ছবি | ঘরের ভেতরে দেওয়াল জুড়ে কাঠের তাক | থরে থরে সাজানো নানা আকৃতির ডেকরেটিভ ইট , ছোটো কালো পাথর , পটারিসের ভাঙা টুকরো , কয়েন প্রভৃতি | তাকের ওপর খনন কার্যের বিভিন্ন পর্যায়ের এবং উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর ছবি |
এই মনাস্ট্রি গড়তে ৪৫ ধরনের ইট ব্যবহৃত হয়েছিল যেখানে নালন্দার মনাস্ট্রি গড়তে ব্যবহৃত হয়েছিল ৩৮ ধরনের ইট | এই কালো পাথরগুলোকে বলে হেইল স্টোন | স্থানীয় প্রনতি জানা নামক এক মহিলা এরকম একটা হেইল স্টোন তার বাড়িতে নিয়ে গেছিলেন | ওই স্টোনের ওপর পালি ভাষায় কিছু লেখা ছিল |
লেখার অর্থ কী উদ্ধার হয়েছে ? আমি জানতে চাইলাম |
হ্যা | হয়েছে | পালি ভাষার পন্ডিত ডক্টর বি এন মুখার্জি এর ইংরেজি অনুবাদ করেন | অনুবাদটি এরকম ” প্রোপাগেশন অফ ধৰ্ম ডাস নট হ্যাপেন উইথাউট সেলফ স্যাক্রিফাইস |”
আচ্ছা , এই জায়গাটার নাম মোগলমারী হওয়ার পেছনে কী কোনো কারন আছে ? খেয়া বৌদির প্রশ্ন |
সেও এক গল্প | সত্যি মিথ্যা জানিনা | মোঘলদের মারতে ( যুদ্ধ করতে ) পাঠানরা নাকি এই গ্রামের ভেতর দিয়ে গেছিল .| যেখানটায় যুদ্ধ হয়েছিল সেই জায়গাটার নাম টুকারুই যা কিনা দাঁতন থানার অধীন | মোঘলদের মারি থেকে মোগলমারী নামের উৎপত্তি |
কালকে যাবো আরেক জায়গায় |
জায়গাটার নাম কী জানতে পারি ?
ক্ৰমশঃ প্রকাশ্য | আজ এই টুকুই থাক |
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: