শম্ভু মিত্রের ঘরানা

প্রিয়লাল রায়চৌধুরী

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মহাষ আমীর খ, বড়ে গােলাম আলি, ফৈয়াজ খাঁ সঙ্গীতপিপাস শ্রোতাদের স্মৃতিতে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। আমি যেহেতু একজন আবৃত্তিশিল্পী আমি শম্ভু মিত্রকে তাদের সনমাপের একজন স্রষ্টা বলেই মনে করি।

এটা স্বতসিদ্ধ যে সুর দিয়ে হয় গান আর স্বর দিয়ে হয় আবৃত্তি। অই কণ্ঠনিষ্কাষিত ধ্বনিশিল্পী হিসেবে উচ্চাঙ্গের মহান শিল্পীদের সমান সারিতে তাকে স্থান দিতে আমার দ্বিধা নেই।

উচ্চাঙ্গশিল্পীদের কাছে সুরসাধনা করতে গেলে নাড়া বেঁধে শিখতে হয়। গুরুমুখী শিক্ষা, এক এক গুরুর এক এক ঘরানা। আবৃত্তিশিল্পে শম্ভু মিত্রও কি কোনাে ঘরাণার জন্ম দিয়েছিলেন? আসলে ‘রানা বেঁচে থাকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে।

পুরাকালে আমাদের দেশের মনি ফিদের কণ্ঠে উচ্চাৰিত শ্লোকের ঘরানা শিষ্য পরম্পরায় বদন প্রবাহিত হয়েছে। সেই অর্থে শম্ভু মিত্রের কোনাে আবৃত্তি দল ছিল না। ছিল নাটকের দল “বহুরূপী”। মানুষটির লেখা “গল্প” কয়েকটি আমার শােনা। তিনি বতা লিখেছিলেন কিনা আমি জানি না। তবু কবিতার প্রতি এত আসক্ত ছিলেন কেন?

বিস্মিত হই, যখন শুনি মিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন সমাবেশে তার “মধুবংশীর গলি” আবৃত্তি জনসভায় লােক সমাগম বাড়াত। সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদিকে কাজে লাগিস্ত্রে দলের ভিত মজবুত করতে প্রায় সব দলই সচেষ্ট।

কিন্তু ঐ সময়ে আরাে অনেকে মঞ্চে মঞ্চে আবৃত্তি করেছেন, কিন্তু শম্ভু মিত্রের মত এত গভীর ছাপ কেউ রাখতে পারেন নি।

আমার মনে হয় শিল্পী হিসেবে শন্তু মিত্র ছিলেন ভিন্ন বােধিসম্পন্ন। অর কবিতা নির্বাচনকে বিস্মিত করে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমে মিত্রের অসামান্য কালজয়ী কবিতাগুলিকেই তিনি তার নির্বাচনে জায়গা দিয়েছেন। যথাসম্ভব কোলাহলকে বর্জন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতায় ভাল গল্প আছে তা সাধ মানুষের খুবই প্রিয়।

যেমন “দেবর গ্রাস”। সাম্প্রতিককালে একজন আবৃত্তিশিল্পী “দেবতার গ্রাস” আবৃত্তি করে খুব হাততালি কুড়িয়েছেন। একটি শিশুকে নির্মমভাবে টেনে হিচড়ে নৌকো থেকে নিয়ে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। শিশুটি ‘মাসী”, “মাসী” বলে হাউ হাউ করে কেঁদে বাঁচতে চাইছে।

অথচ এই জনপ্রিয় আবৃত্তিশিল্পী তার ব্যারিটোন কণ্ঠে ‘মাসী”, “মাসী” যে দীর্ঘায়িত সুরেলা ধ্বনি করলেন তা আমার কাছে খুবই ilogical মনে হয়েছে। বুকে খুবই চাপা অনুশােচনা ছিল।

আশির দশকে রবীন্দ্রসদনের এক আলােচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সন্তোষকুমার ঘােষ, সুচিত্রা মিত্র, অরুণ মিত্র, শাঁওলি মিত্র ও শম্ভু মিত্র স্বয়ং।

অরুণ মিত্রের আবৃত্তিশিল্পীদের সম্বন্ধে একটি তির্যক মন্তব্যের উত্তরে শম্ভু মিত্র বলেছিলেন “কবিতা আবৃত্তি হৃদয়ের, উপলব্ধির ব্যাপার। আমি তাে কোনদিন দেবতার গ্রাস আবৃত্তি করিনি!” আমি চমৎকৃত হয়েছিলাম।

দ্বিতীয়তঃ বিস্ময়করভাবে অনেক বয়সে তিনি স্মৃতি থেকেই কবিতা আবৃত্তি করতেন, আকাদেমী অফ ফাইন আর্টস হলে পরপর একুশটি কবিতা স্মৃতি থেকে শােনালেন। পাশে বসে অবশ্য দু-একটি কবিতা শাওলী মিত্রও পড়েছেন।

তখন শম্ভু মিত্রের বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি। বই দেখে যারা পাঠ করেন, সর্বশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রিয়, চক্ষুকে, যারা বইতে নিবন্ধ রেখে পাঠ করেন, তাদের কাছে আবৃত্তির এই উদাহরণ কিছুটা লজ্জা দেবে . বই কি!

তৃতীয়তঃ স্বরক্ষেপণের জাদু। কী empathy তার হবে! জীবনানন্দের কবিতা “আট বছর আগের একদিন” ঐ রবীন্দ্রসদনের অনুষ্ঠানে যখন আবৃত্তি করলেন, আমার সারা শরীরে বিদ্যুততরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছিল।

বিমূঢ় বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম সুচীভেদ্য নিস্তব্ধতা কাকে বলে? পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহের এক হাজারের ওপর শ্রোতা যেন Hypnotized, “উটের গ্রীবার মত নিস্তব্ধতা” অনুভবে, মানসলােকে প্রত্যক্ষ করেছি সেই দিন।

যখন শেষ হল একটিও করতালি পড়ল না। এই স্বরক্ষেপণ তিনি একদিনে আয়ত্ত করেন নি। বােন্যই যায়, দীর্ঘদিন কণ্ঠসাধনা করে তিনি আয়ও করেছিলেন। আমি ভাবি তার সাধনার ধরণ কেমন ছিল? তিনি কি সংগীত সাধনা করতেন।

কিন্তু তাকে তাে কোনদিন গাইতে দেখিনি। স্বরসাধনার এই চূড়ান্ত শিখরে তিনি কিভাবে আরােহণ করলেন? রবীন্দ্রনাথের “স্বপ্নে” আবৃত্তি ক্যাসেটে শুনেছি। আর কেউ সাহস করেছেন কিনা জানি না।

যাদের কণ্ঠের “Base” ভাল তাদের প্রতি আমাদের অকারণ দুর্বলতা আমাকে খুবই ব্যথিত করে। শুনি তারা বহু অর্থের বিনিময়ে অনুষ্ঠান করেন।

কিন্তু শম্ভু মিত্র দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন “আমি কোনদিন আবৃত্তি করে পয়সা রােজগার করিনি”। আবৃত্তি প্রসঙ্গে আলােচনায় রবীন্দ্রসদনে একবার তিনি সম্ভবত বলেছিলেন “আমি আবৃত্তি করি নেশাড়র নেশার মত”। তার কথার মর্মার্থ না বুঝতে পেরে কিছু উদ্ম প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্থানত্যাগ করেছিলেন।

আজ বুঝি কবিতা কেমন করে মনকে মাতাল করে। কবিতা (a+b) নয়। আজ যে কবিতা পড়ি তার উপস্থাপনার ধরণ দুবছর পরে একই কবিতার উপস্থাপনার ধরণ এক হয় না।

আসলে কবিতাকে তিনি পণ্য করেননি। তার স্বরের মায়াজাল তার একান্ত নিজস্ব। আর সেই পথের অনুসারী “বহুরূপীর প্রায় সব প্রথিতযশা। তার কন্যা অবশ্যই তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব

দাবী করতে পারেন। এই ঘরানার মায়ায় আবদ্ধ অশােক মুখােপাধ্যায়ের মত ধীশক্তি সম্পন্ন তরুণও।

আমরা কি তার মতাে স্বরে কোনদিন কবিতা আবৃত্তি করতে পারব? স্বরক্ষেপণের লালিত্য বা লাবণ্য তার প্রতিটি আবৃত্তিতে প্রভাতী শুকতারার মত আমার উপলব্ধির জগতকে আলােকিত করেছে। চমৎকৃত হয়েছি “জং”এর মধ্যে একটি ছােট অথচ চিন্তাঘন কবিতাকে তিনি তার স্বরক্ষেপণের লালিত্যে রসােত্তীর্ণ করেছেন।

তাঁর আবৃত্ত কবিতাগুলির মধ্যে তানপ্রধান ছন্দের কবিতাগুলিই বেশি দোলা দেয়। জীবনানন্দেরকবিতায় তার স্বরসন্ধান মিস্ এর পর্যায়ে পৌঁছেছে।

মনে হয়েছে এর বিকল্প নেই। এইভাবেই আবৃত্তি করতে হবে জীবনানন্দের কবিতা। এটা কি ঘরানার সাক্ষ্য বহন করে ?

“শিকার” কবিতায় “একটা অদ্ভুত শব্দ/নদীর জল মচকাফুলের পাপড়ির মত লাল” উচ্চারণ শুনলে, জীবনানন্দের প্রতীকী ব্যঞ্জনা অবশ করে ফেলে। মনুষ্যত্ব বিরােধী, প্রকৃতি বিরােধী নৃশংসতাকে জীবনানন্দ কয়েকটি শব্দের জাদুতে আমাদের চেতনাকে যতটা জাগাতে পারেনি, শম্ভু মিত্রের উচ্চারণে সেই চেতনার স্তর ততটাই প্রতিবাদী হয়েছে।

আবৃত্তিশিল্পীর কাজ তাে এটাই। এখনও কারও কণ্ঠে “বােধ” এর মত কবিতা উচ্চারিত হয় না। শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে জীৱনানন্দ দাশের সিন্ধুসারসের উল্লাসময় অস্তিত্ব, “কুড়ি বছর পরে কোন প্রেমিকের পিপাসার্ত হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা ‘উটপাখীর (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত) নিস্পৃহতা, “মধুবংশীর গলি”র (জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র) নিপীড়িত মানুষের শৃঙ্খল মােচনের প্রয়াস,—যেভাবে মূর্ত হয়েছে এবং তার জন্যে জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও .. তার আবৃত্তি শােনার জন্য প্রেক্ষাগৃহের বাইরে বিনিদ্র রজনী যাপন করে যে সুদীর্ঘ লাইন পড়েছে তা সত্যিই অভূতপূর্ব।

বাজনার জগঝম্প, অযথা নাটুকেপনা, গল্পের মিষ্টি সুর দিয়ে কবিতার আসরে যারা কল্কে পান তাদের কাছে শম্ভু মিত্রের ঘরাণা উপেক্ষিত হবে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু কবিতা আবৃত্তিতে যারা অক্ষরবহ্মের উপাসক, সেই বিপুল মানুষের তিনি মাথার মণি। ।

এরপর আসি শম্ভু মিত্রের উচ্চারণ প্রসঙ্গে। আর উচ্চারণ একটা Diction।উচ্চারণের ক্ষেত্রে সাধারণ দোষগুলি র’, ‘ড’, ‘’ অথবা শ, ষ, স’ তার ক্ষেত্রে খুব কষ্ট করেও ‘খুজে পাইনি। অথচ একজন প্রথিতযশা আবৃত্তিশিল্পীর কণ্ঠের আফ্রিকা আবৃত্তিতে “প্রকৃতি” উচ্চারণ “প্রকিতি” শুনলাম। উচ্চারণের ক্ষেত্রে কানে বাধে তার উচ্চারণ।

উচ্চারণের ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্র কত যত্নবান ছিলেন, তা আমাকে জানিয়েছিলেন আমারই এক পরিচিত কবি। তিনি বলেছিলেন “শম্ভু মিত্র তার কন্যাকে কোনদিন “শাওলী” বলে ডাকেননি, “শাওলী” বলে ডেকেছেন। একথা যদি সত্যি হয় তাহলে মানতে হবে বাড়ীতেও তার উচ্চারণের ঘরাণা অব্যাহত ছিল। নইলে এত আধুনিক পরিশীলিত উচ্চারণরীতি আমরা তার কাছ থেকে পেতাম না।

* রবীন্দ্র কবিতার আবৃত্তিতে তার ছন্দবােধ আবৃত্তিশিল্পীদের কাছে শিক্ষণীয়। “লীলাসঙ্গিনী”“পৃথিবী ” “জীবনদেবতা”, “স্বপ্নের মত অসামান্য কবিতাগুলি আবৃত্তিতে ছন্দের সােলায় আমরা আবিষ্ট হই। তার দেবােপম কষ্টে “আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করা পৃথিবী/ শেষ নমস্কারে অবনত/দিনাবসানের বেদীতলে/” অর্থের রসাস্বাদনে কোনাে ব্যাঘাত ঘটায় না।

অথবা “তােমারে ডাকিনু যবে কুঞ্জবনে”, চার মাত্রার পর্বের কলাবৃত্ত ছন্দের দোলায় রােমান্টিক প্রেমের অনুষঙ্গটি হৃদয়ের খুব কাছাকাছি এনে দেয়।

বাংলাভাষার নাট্যজগতের আর এক কিংবদন্তী পুরুষ উৎপল দত্ত লিখেছিলেন “শম্ভু মিত্রের কণ্ঠস্বর ষড়জ থেকে পঞ্চমে অনায়াসে যাতায়াত করে” (স্তানিস্লাভস্কি থেকে ব্রে।রবন্দ্রসদনে এক সন্ধ্যায় আবৃত্তি প্রসঙ্গে আলােচনায় (রসকলি/ দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়) শম্ভু মিত্র বলেছিলেন “আমি আবৃত্তি করি, নেশাডুর নেশার মত”।

প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিলর। তিনি স্থানতাগ করেছিলেন। আজ যে আবৃত্তির ধারা প্রবাহিত হয়েছে সেখানে কবিতা-মাতালের সংখ্যা খুবই নগণ্য, জাতে মাতাল তালে ঠিক’ এর সংখ্যাই বেশি। দুঃখের বিষয় সংরক্ষণের অভাবে আমরা অতীতের অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। তার কালজয়ী অভিনয়, বিশেষ করে রক্তকরবী’ দৃশ্যায়িত করে রাখার দায়িত্ব ছিল সরকারের।

অথচ মতিচ্ছন্ন সরকার বহু অর্থ ব্যয় করে বেশ কিছু দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রযােজনাকে দৃশ্যায়িত করে রেখেছেন। কিছু ভালবাসার মানুষের চেষ্টায়। ক্যাসেটের কবিতার আবৃত্তি আমরা শুনতে পাই। প্রতিমুহূর্তে ভাবি আবৃত্তির এই ধারা যদি ব্যাহত থাকতাে তাহলে সস্তা জনপ্রিয়তার বাজারী চিত্তার কবলে একটি সুন্দর শিল্প এভাবে ধ্বস্ত হােত না।

শম্পা সাহিত্য পত্রিকার আবৃত্তি  উৎসব সংখ্যা

সম্পাদনা : স্বপন নন্দী  // যোগাযোগ : 7699249928

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: