শেকড়ের স্মৃতি  //  ৩১  //  মাধব মন্ডল

mm

ছোটবেলায় আমি একটা চিহ্ন মামার বাড়ি থেকে অর্জন করেছিলাম, বাঁ উরুর বাঁ পাশে, একটা চিরস্থায়ী লম্বা কাটা দাগ, কাট মার্ক। মামার বাড়ি মানে এক কাঁড়ি খেলার সাথী। খেলা, হুড়োহুড়ি, খাওয়া, ঘোরা….. কাছেই মেজ আর ছোট মাসির বাড়ি যাওয়া। দিদিমা মায়েদের ছোটবেলায় গত হয়েছেন, সুতরাং লাষ্ট কাটে আসা আমার সৌভাগ্য হয় নি তাঁকে দেখা। দাদামশাইকেও হালকা হালকা মনে আছে। মা তাঁকে ন’মাসে ছ’মাসে দেখতে যেত, সঙ্গে আমরা পিঠোপিঠি শেষ দু’ভাই, আমি আর বলাইদা। বাবাকে কোনোদিন যেতে দেখি নি। 

মামাদের আদি বাড়ি ছিল আমাদের আদি বাড়ি ডিঙেভাঙার কাছাকাছি সাধবেড়ে, আবার নোতুন বাড়ি আমড়েশ্বরও কাছাকাছি। সম্পন্ন কৃষক ফ্যামিলি। সাধবেড়ের দু’টো ঘটনা আমার এখনও মনে আছে। এক, কাপাস ফুলের মধু খাওয়া আর দুই, বাঘরোল মারা। আর চিরস্থায়ী কাটার চিহ্নটা সম্ভবতঃ সাধবেড়ের। মেজ মাসিদের বাড়ি মামাদের আমড়েশ্বরের বাড়ির কাছাকাছি। আর পাশের গ্রাম নকুড়আটিতে ছিল ছোটমাসির বাড়ি। ছোট মেসোকে আমি দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।

মার কাছে অনেক গল্প শুনেছি। বড় মাসিকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাদীতে তাঁদের বাড়ি, সেও ডিঙেভাঙার কাছাকাছি। তখন এসব পথ হেঁটেই যেতাম আমরা। যেহেতু আমরা আবাদে অর্থাৎ ১০ নং কুমড়োখালি থাকতাম, তাই সরবেড়ে থেকে বাসে করে ঘটকপুকুর, সেখান থেকেও বাসে করে বাদবাকিটা আসা, শেষে শ্রীচরণ ট্যাক্সি।

কটকেনোদের দেশে একটাও নদী নেই, নেই খালও, খোলা মাঠও নেই, শুধু গাছ আর বাঁশবন আর বাড়িঘর। খেঁকশিয়ালের হুক্কাহুয়া, খটাসের উৎপাত, আগানে বাগানে চিনে জোঁকের ভয়, মাঝে মধ্যে বাঘরোলও বেরতো।

৩২ 

চারদিক লোকে লোকারণ্য, প্রত্যেকের হাতে হয় রামদা, হেঁসো, শাবল, বল্লম, কোঁচ নয় বাঁশ। বাঘরোল বেরিয়েছে। তেড়ে তেড়ে তাকে মারার চেষ্টা চলছে। তাড়ার ঠ্যালায় শেষে সে পুকুর পাড়ের একটা বড় তাল গাছের মাথায় ঠেলে উঠেছে। গাছটাকে ঘিরে রয়েছে সবাই। ব্যাটাকে গাছ থেকে নামানোর জন্যে আস্ত বাঁশ দিয়ে তাল গাছের মাথায় গোঁজা মারা হচ্ছে। চলছে পাড়া কাঁপানো হল্লা।

কতক্ষণ আর ব্যাটা নিজেকে বাঁচাবে? গাছ থেকে আছড়ে পড়ল, কিন্তু পালাবার পথ নেই। এদিকে পেটা খেয়ে ওদিকে যায়, ওদিক থেকে এদিকে। একসময় সে কাবু হল। যাদের হাঁস, মুরগী, ছাগল, ভেড়া বা বাছুর সে মেরেছে বা খেয়েছে তাদের রাগ দেখে কে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হলদেটে চকরাবকরা প্রাণিটির ভবলীলা সাঙ্গ করা হলো।

মহুয়ার মিষ্টি ফলও আমি প্রথম খাই মামার বাড়িতেই। অনেক দূর থেকেই মহুয়ার গন্ধ ভেসে আসতো। আর গাছতলাটা তো গন্ধ ম ম করতো। আমাদের ” আবাদের ভূত পেঁদে বলে বিস্কুট ” বলে ক্ষ্যাপানো হতো। আমরা শামলা খেকো, এসব আমাদের কাছে এক্কেবারে নতুন। তবে আমরাও ছাড়তাম না, আমরাও তাদের উল্টে কোটকেনো ভূত বলে ঐ একই ছড়া কাটতাম। কত গাছ, কত পাখি, কত কোহাহল! ক’দিন বেশ ভাল কাটতো, তারপর ঘরে ফেরার টান লাগতো। পাণিখাল, খোলা মাঠঘাট, খাসখামার, বনবিবিতলা, বড় থানতলা, স্কুল, আজন্ম খেলার সাথিরা সবাই মরণ টানা টানতো।

সেবার বর্ষার পরপর মার সঙ্গে আমরা মামার বাড়িতে। কানায় কানায় ভরা পুকুর। পাড়ে ঘাটের ধারে একটা জাম গাছ। আমরা ক’টা গেছো বাঁদর ঐ গাছ থেকে জলে ঝাঁপাচ্ছি, কিন্তু আমার ঝাঁপটা যুতের না হওয়ায় পড়বি তো পড় ঘাটের খোঁটার উপর! আর যায় কোথায়, খোঁটার মাথা লেগে  উরুৎ চেরাই হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বড়রা জল থেকে আমাকে তুলে আনলো, গামছা দিয়ে থাই বেঁধে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করতে লাগলো। তারপর তো ডাক্তার কবরেজ।

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *