সত্তর দশকের কবি // প্রথম প্রকাশকাল ১৯৮৭

Sir1.

কবিতায় সময় বা কালের গুরুত্ব  

স্বপন নন্দী

যোগাযোগ : 7699249928

বাংলা কবিতা তার পরিশীলিত ঐতিহ্য, সময় ও কাল অন্বিত নিত্য নতুন নিরীক্ষা ও নিরীক্ষাপ্রসূত সিদ্ধিকে পাথেয় করে বেঁচে আছে। উজ্জীবিত হচ্ছে। কবিতার পথ পরিক্রমার মধ্যে যে বাঁক, সেটি রবীন্দ্রনাথের সংজ্ঞায় আধুনিকতা।

সেই সংজ্ঞাকে মেনে নিয়ে বাংলা কবিতার এক একটি সময়কে বিশেষ অভিধায় ভূষিত করা হয়। শুধু কবিতাকে নয়, সাহিত্যের যেকোন উপাদানকে সময়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন অভিধায় মর্যাদা দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে সাহিত্যের ইতিহাসে। এই রেওয়াজ এসেছে অনেকটা উপলব্ধিজাত প্রয়ােজনের ভিত্তিতে।

সম্প্রতি সাহিত্যে কাল বিচারের পদ্ধতিটি আরাে বেশী করে বিভাজিত হচ্ছে। আজকাল শােনা যাচ্ছে চল্লিশ দশকের কবিতা, পঞ্চাশের কথাসাহিত্য, ষাটের নাটক ইত্যাদি। অর্থাৎ একটি শতাব্দীর দশকগুলিকে খণ্ড খণ্ড করে সাহিত্যের প্রভাব ও প্রতিপত্তি দিয়ে মূল্যায়ণ করা হচ্ছে।

অতি সাম্প্রতিক সাহিত্যের দ্রুত পরিবর্তনশীলতার কারণে এই বিখণ্ডিকরণের প্রয়ােজন। সময়টিকে চেনবার জন্যে, সময়টিকে চেনাবার জন্যে শিল্পীর এটি একটি দায়। যদিও কেউ কেউ দশক বিখণ্ডিকরণের বিরােধী । রবীন্দ্র পূর্ব ও রবীন্দ্র সমকালীন কবিতায় এই দশক চিন্তা দানা বাঁধে নি।

তখন সাহিত্য মূল্যায়ণে ‘শতক’ বা ‘যুগ’- জাতীয় শব্দের প্রয়ােগ হতো। যেমন উনিশ শতক, বিশ শতক, বঙ্কিম যুগ, রবীন্দ্র যুগ ইত্যাদি। আবার সেই বিতর্কিত ‘আধুনিক’ শব্দটি শিল্পী ও সমালােচক চিত্তে বেশী করে ছায়া ফেলত।

আধুনিক’ শব্দটি সময়কে একথা গুরুত্ব দিয়ে যত না, তার চেয়ে রচনারীতিকে গুরুত্ব দিয়ে। এ কথা  ঠিক, সৎ ও সত্যনিষ্ঠ কবি চিরকালের, কোন যুগ বিশেষের নয়। তাই তাদের কবিতার আবেদনও চিরন্তন।

তবু ইতিহাসের প্রয়ােজনে কালচিহ্নের গুরুত্ব স্বীকার করে নেওয়া হয়। এইভাবে চিরকালের চিরন্তন কবির বিশেষ কালের মনােধর্মটিকে তুলে ধরলে সেই দশকের কবিতার সার্থক বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।

১. শতক বা দশকের কৃত্রিম বিভাজনে কবিতার স্বরুপ বা প্রকৃতিকে বিদ্ধ না করাই হয়তাে শ্রেয়। উপলদ্ধির  প্রশ্নে দশক-ওয়ারি বিভাজন রীতিকে অস্বীকার করতে চাইলে তা অনুচিত বা দোষাবহ হয়।

তবে দশক ওয়ারি বিভাজন রীতির  মধ্যে নিঃসন্দেহে কবি চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য তাঁর বিশেষ মানসিক প্রবণতা ও সার্থকতার সমবায়িক দিকটা ধরা পড়ে ।

আবার ব্যক্তি নামের স্বাতন্ত্র্যকে কবির সৃস্টি মর্ম বা বৈশিষ্টাকে চিত্রিত করবার ক্ষেত্রেও দশক ভাগের প্রসংগে আমরা আস্থাশীল হই ।

আবার পারিপার্শ্বিক  ‍যুগ-কালের বিশেষ বৈশিষ্ট্য উপলদ্ধি ও পর্যালোচনার কারণে ও এই দশক বিভাজনের লক্ষ্যমুখীন উদ্দেশ্যগত সার্থকতা রয়েছে। •••••••”দশক বিভাজনের রীতির মধ্য দিয়ে কবিতার ভাব-ভাবনা আঙ্গিকের চরিত্র আমরা নিবিট চিত্তে পাঠ করতে সমর্থ হই।

এর মধ্য দিয়ে আমরা বিশেষ কালের কবিতার রসনাকুল ফলশ্রুতি উদঘাটনে সাথক হই। তাই কবিতার দশক বিভাজন রীতির চিহ্নিত করণের মধ্যে বিশেষ পর্বের কবিতার উপলদ্ধি একমুখীন ব্যাপ্তিতে সার্থক হয়ে ওঠে ‘ [ ডঃ প্রদ্যোত সেনগুপ্ত। অন্য দিগন্ত ও ষাটের কবিতা ] * ‘সাহিত্যের কাল-চিহ্ন সব সময় অর্থবােধক নয়, বিশেষ করে সমসাময়িক সাহিত্যের কাল লক্ষণ নির্ণয় করতে যাওয়া দুঃসাহসিক ।

তবু, সময়ের এক একটি পবকে চিহ্নিত করার প্রয়ােজন।’’| [ সরােজ আচার্য | রবীন্দ্রোত্তর কাল | অনিলকুমার সিংহ সম্পাদিত সূর্যাবর্ত পত্রিকা।]

২. সাধারণতঃ বহু, কাব্য সমালোচনায় তিরিশ দশকের কবি, চল্লিশ দশকের কবি, পঞ্চাশ দশকের কবি—এমন ভাবে ভাগ করা হয় ! জানিনা, ঠিক এই ভাবে ভাগ করা যায় কিনা। আর করলেও তা কতটা সঠিক হবে।

মনে হয় যাঁরা এই ধরণের ভাগ করে সমালােচনা করতে চান, তাঁরা ধনতান্ত্রিক ব্যবসানীতির ‘মডেলের‘ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। | [ ডঃ জ্যোতির্ময় চট্টোপাধ্যায় । আধুনিক বাংলা কবিতা ও দ্বন্দ্ববাদ । ২য় সংস্করণ, পঃ ২৫ ]

সত্তৱেৱ কবি কারা  ?

বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে দশক চিন্তার অপরিহার্যতা বিষয়ে বিতর্কের সম্ভাবনা এড়িয়ে গেলেও অন্য একটি প্রশ্ন উন্মুখ হয়ে ওঠে। পাঠক ও সমালােচককে দ্বিধান্বিত করে তােলে সত্তরের কবি কারা বা কোন সময়ের কবিতাকে সত্তরের বলবাে।

এই প্রশ্নের জটিলতা ও দুরূহতা বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। চল্লিশ, পঞ্চাশ, ও ষাটের দশকে যাঁরা সমান ভূমিকায় লিখে গেছেন এবং সত্তরের  দশকেও যাদের গতি অব্যাহত তাঁদের কবিতাতে তিন-চারটি দশক ধরেই আলােচিত হওয়ার সুযােগ থাকে এবং আলােচিত হয়।

এমনকি ত্রিশ দশকের বেশ কয়েকজন কবি এখনাে বেঁচে আছেন এবং বয়সের ক্লান্তি সত্বেও তারা কম-বেশী যা লিখছেন তা সত্তরের বিশেষ পাওয়া। তবে কোন্ বিশেষ দশকে তারা স্বমহিমায় স্থিরী| কৃত হবেন তা আমাদের ভাবায়।

ত্রিশ-চল্লিশের প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সুভাষ মুখােপাধ্যায়ের কলম সম্প্রতি আটের দশকেও প্রাণবন্ত। শুধু ত্রিশ দশকে লেখা তাঁর কবিতাকর্মের মূল্যায়ণ করলে শিল্পীদের পূর্ণায়ত মর্যাদায় ধরা যাবে বলে মনে হয় না।

সুতরাং একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে হয়। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৯-এই সময় সীমার মধ্যে যেসব কবি বাংলা কবিতা চর্চায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন তাঁদের কবিতাকে ‘সরের কবিতা বলা যেতে পারে।

আলােচিত সময়সীমা তাঁদের প্রধান অবস্থিতি ধরে নিলেও শিল্পের ধারাবাহিকতা থাকবে। হয়ত শেষ ষাটে তারা লিখতে শুরু করেছেন সত্তর দশক জুড়ে লিখেছেন, উত্তর সত্তরেও তাঁদের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হচ্ছে।

এক্ষেত্রেও শিল্পীর পূর্ণায়ত মূল্যায়ন সম্পর্কে সংশয়াচ্ছন্নতা থেকে যায়। সমস্যাটির প্রতি মনােযােগী হয়েই সত্তরের কবিদের সামগ্রিক মূল্যায়ণে তাদের উত্তর সময়ে প্রকাশিত কবিতাগুলি সমান মর্যাদা পাবে।

যেসব কবি সত্তর দশকে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখেছেন সেই অসংবদ্ধ, বিচ্ছিন্ন কবিতাগুলি সংগ্রহ করে কবির মুল্যায়ণ করা কষ্টসাধ্য। সেক্ষেত্রে তাদের সত্তরের পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলি আটের দশকে গ্রন্থিত হতেই পারে।

এই আটের দশকে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থগুলি আলােচিত হওয়ার অধিকার দাবী করতে পারে। সত্তরে অনেকে সখ করে কবিতা লেখা শুরু করেছেন। এমনকি গ্রন্থ প্রকাশও করেছেন।

সত্তর দশকের সমাজ ইতিহাস :

কবিতার ক্ষেত্রে তার প্রভাব

দায়বদ্ধ কবি কখনােই সমাজগ্রন্থি থেকে বিচ্যুত হতে পারেন না। বাংলা কবিতা প্রত্যেকটি সমাজ ও পরিবেশ অন্বিত মনােভূমি  তৈরী করে কবিতাকে স্বতন্ত্র আভিজাত্য দিয়েছে। দশক ভেদ অনুযায়ী কবিতার চরিত্রও গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র স্বাদে। কবিদের প্রবণতা ও উত্তরণ হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন।

অন্যান্য দশকের মতাে সত্তর দশক তার সমাজ ও ইতিহাসকে স্বীকার করে নিয়ে কবিতার ক্ষেত্রে একটি স্থিরতায় পৌছে যাবার গর্ব অর্জন করে নিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্যকালীন সমাজ সমস্যায় কবিরা আন্দোলিত হওয়ার ফলশ্রুতি তাদের কাবাদর্শের আমূল রঙ বদল।

সাহিত্যে রােমান্টিকতার পরিবর্তে এলো বাস্তবতা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ভারতবর্ষে অর্থ, ধর্ম ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাশ্য সংক্রামিত হল। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থেকে তথনে ভারতবাসী বঞ্চিত ?

জীবন সংগ্রামের সুতীব্র সংকট এবং সংকট সম্পর্কিত যন্ত্রণার বন্ধুর পথে হাঁটতে হাঁটতে ভারতবর্ষের মানুষ ক্ষতবিক্ষত হলো, রক্তাক্ত হলো। এরপর দেশভাগ, মন্বন্তর। সমগ্র দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি ভেঙ্গে টুকরো টুকরাে হয়ে গেল।

ক্ষুধাকাতর নিরন্ন মানুষ অন্নের খোজে, আশ্রয়ের খোঁজে ছিন্নমুল হয়ে তার চিন্তা চেতনার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। ইউরােপ-আমেরিকায় তখন Hunger বা Anger আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

সেই স্রাত এসেছে বাংলার সাহিত্য সমুদ্রে। উনিশশাে ষাট থেকে বাষট্টির মধ্যে এই আন্দোলন পশ্চিমবাংলার সাহিত্যে বিশেষ আলােড়ন জাগায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমীর রায়চৌধুরী, সুবাে আচার্য, শৈলেশ্বর ঘােষ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায় প্রমুখ পঞ্চাশ-ষাটের লেখকগণ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন।

বুলেটিন, পত্রপত্রিকা প্রকাশ প্রভৃতির মাধ্যমে তারা রাজনীতির কুৎসিত ন্যাকামি, সমাজের অন্তর্নিহিত পাপ, অশ্লীলতা, অবক্ষয়, মানুষকে হত্যা করার ক্রনিক ষড়যন্ত্র ও কর্মতৎপরতা, হিংসা, ঈর্ষা, লােভ, নৃশংসতা নিষ্ঠুরতা, বীভৎসতা ও তার চতুরতা, ইত্যাদির বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে উদ্যত ও উদ্ধত হয়ে উঠলেন শিল্পের খরশাণ হাতিয়ারে।

ইউরােপীয় খণ্ড থেকে ধার করা এই আন্দোলন ষাটের দশক পেরিয়ে সত্তরে এসে উপনীত হল। কথিত আন্দোলনে প্রাণিত হলেন কেউ কেউ। ষাটের মলয় রায়চৌধুরী লিখলেন—“কবিতা ব্যতীত আর কি আছে ? এ জীবনে !

মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে । কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয় । মলয় রায় চৌধুরী কৃত ধারা অনুসরণ করে সত্তরের কেউ কেউ হঠাৎ আলাের ঝলকানিতে সাময়িক উদ্বেল হয়ে উঠলেও কোনো স্থিরতায় উপস্থিত হতে পারেননি।

স্থায়ী হয়নি এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন। শিল্পীর আবেদন নিঃশত। শিল্পী কারাে শর্ত মেনে চলতে চায় না। হাংরির প্রশাসনিক শর্তে নতনু হলেন না কবিরা ।

একথা বলা হয়ে থাকে সত্তর দশক যৌবনের দশক এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যৌবন ভঙ্গের দশকও। ষাটের মধ্য ভাগ থেকে নকশালবাড়িতে গণ আন্দোলন শুরু হয়।

নকশাল আন্দোলন নামে তা পরিচিত। নকশাল আন্দোলন শেষ ষাট ও সত্তর দশকের শিল্প সাহিত্যকে যথেষ্ট পরিমাণে প্রভাবিত করেছিল। এই আন্দোলনটি সম্পর্কে এক জন সমালােচকের অভিমত, -‘সম্ভবত এই প্রথম কোন রাজনৈতিক আন্দোলন অতীত বর্তমানের সমস্ত অর্থ  রাজনৈতিক সমাজ ঐতিহাসিক প্রশ্নে তার সময়ের দৃষ্টি মুষ্টিমেয়।

সম্ভ্রান্ত প্রতিভাধরের দিক থেকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হল। দৃষ্টি নিবদ্ধ হল শ্রমিক কৃষকের লক্ষে , সমাজ পরিবর্তনের প্রধান পরিচালক জনগণের দিকে।

এবং সর্বোপরি নির্ভুলভাবে ব্যক্ত হল স্বশ্রেণীর ঐতিহ্যে শ্রদ্ধাহীন, আজন্ম বঞ্ছনার শিকার একটি প্রজন্মের স্বতঃস্ফুর্ত বিক্ষোভ। এই প্রতিরােধ্য সময়কে অবহেলা করা, কি প্রগতি কি প্রতিক্রিয়া, কোন শিবিরের কবি  সাহিত্যিকদের পক্ষেই সম্ভব ছিল না।’

নকশাল আন্দোলন ছাড়া সমকালীন বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনীতিক প্রেক্ষাপটটি বিশেষ বৈচিত্রময়। ভয়াবহ বেকার সমস্যা, দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎসঙ্কট, শিক্ষাব্যবস্থায় ঘন ঘন।

ভাঙচুর, দু-দুবার বিধ্বংসী বন্যা, কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যগুলির মধ্যে ভাষা সমস্যা, রাজনীতিতে শাসিত দলের ঘন ঘন পরিবর্তন, সর্বোপরি সাম্প্রদায়িকতা ও বিচ্ছিন্নতা–ই সব কিছু নিয়ে বৈচিত্র্যময় সত্তরের সময় প্রবাহ।

ভয়াবহ বেকার সমস্য! সত্তরের যুবশক্তিকে সবচেয়ে বেশী আঘাত দিল। বেকারত্ব যুবশক্তির উজ্জ্বল সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটায়। বেকারত্বের কাছে লাঞ্ছিত হয় প্রাণের অভিব্যক্তি, আত্মার ঋদ্ধি।

শহর, নগর গ্রাম গঞ্জে হঠকারিতার বিশৃঙ্খলা ও বিক্ষোভের জন্ম নেয় এই পথেই। নকশাল আন্দোলনের মধ্যে মহতী সম্ভাবনা। যা-ই থাকুক না কেন আন্দোলনের নামে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।

তার পিছনেও এই বেকার যুবমানসিকতা কাজ করেছে। নিঃসন্দেহে স্বীকার্য যে অবক্ষয়ই সতরের শেষ কথা নয়, মুক্তির উচ্চারণ ও সেখানে সমানে ঘােষিত। সমালোচকের উদ্ধৃতি ৩, “আসলে সত্তর দশক বাধক্যের নয় তারুণ্যের, বিচক্ষণতার নয়, উদ্দীপনার,

শীতল প্রজ্ঞার নয় আগ্নেয় আবেগের দশক। যারা পারেনি হৃদয় দিয়ে সময়ের ঐ প্রাণকেন্দ্রকে স্পর্শ করতে তারা সম্ভবত তা রাজনৈতিক বা অপর কোন কারণে, এক আন্তরিক বিরােধিতা-বােধ থেকেই পারেননি। এই সমাজ-ইতিহাস সমকালীন কবিতাকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছিল।

প্রাক সত্তর ও সত্তরে প্রকাশিত কবিকর্ম   //  প্রভাব ও প্রতিপত্তি

সত্তর দশকের কবিতার সুপ্রসারিত মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে প্রাকৃ দশকের কবিতার এবং সমদশকে লেখা প্রতিষ্ঠিত কবিদের রচনার সঙ্গে নবীনদের কবিতার সাযুজ্য ও  সামঞ্জস্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়ােজন আছে। পঞ্চাশের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়।

অলােকরঞ্জন দাসগুপ্ত, আনন্দ বাগচী, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, তারাপদ রায়, কবিতা সিংহ, শঙ্খ ঘােষ, শরৎ কুমার মুখােপাধ্যায়, চিত্ত ঘােষ প্রমুখ ; ষাটের পবিত্র মুখােপাধ্যায়, গৌরাঙ্গ ভৌমিক, সামসুল হক, রত্নেশ্বর হাজরা, নীরেন্দু হাজরা, শান্তুনু দাস, রবীন সুর, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, মলয় শঙ্কর দাশগুপ্ত, তুলসী মুখােপাধ্যায়, আশিস সান্যাল, শিবেন চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায় প্রমুখ কবিগণ সত্তর দশকে জোর দাপটেই লিখেছেন।

অনুসরণ নয়, অনুকরণ নয় তাঁদের প্রেরণা সত্তরের কবিদের পাথেয়। সত্তরের সংশয়, সত্তরের চেতনা তাদের কবিতায় বিধৃত হয়েছে।

হিংস্র  রাজনীতি, হানাহানির বীভৎস এই দিনগুলি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় তীর্যক বান হানে—ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙ্গে মানুষ ছিলাে নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো। অন্ধ ছেলে, বন্ধ ছেলে, জীবন আছে জানলায় ! —পাথর কেটে  পথ বানানো, তাই হয়েছে ব্যর্থ। মানুষ বড় শস্তা, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতে। !

এই সময়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন—

আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা

নিখিলেশ এই কি মানুষ জন্ম? নাকি শেষ

পুরােহিত ককালের পাশাখেলা। প্রতি সন্ধেবেলা

আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা

করে রক্ত ! আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে

থাকি তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবাে বলে।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা

জানিরে সিতাংশু তাের ঘরের চরিত্র আমি জানি

ওখানে অনেক কষ্টে শােয়া চলে, কোনােক্রমে দাঁড়ানাে চলে না

তাের ঘরের ভিতরে বড় অন্ধকার, বড় অন্ধকার, বড় বেশী অন্ধকার

তোর ঘরের ভিতরে।

অথবা তরুণ সান্যালের কণ্ঠ

যুবক তােমারি জন্যে মুখ ফিরিয়ে বসেছে তরণী

আলােছায়া খেলছে রাজ-রাজেবরীর কোমল চিবুক,

বসাে, হাট ভেঙে বসাে, বলাে আছি অনভ্যাস, বলাে আছি উদগ্র উন্মুখ

তােমার শােণিতে আমি জম চাইছি,••••••

চিত্ত ঘােষের কণ্ঠটি ভােলবার নয়—

এক যুবক তার ফুটো করা বক আর বিচ্ছিন্ন উদর নিয়ে

শুয়েছিল রাস্তার ধারেই

রক্তে মাখামাখি জামা, নীল চুল বুকের কিশাের লােম

হাত পা ঠাডা শীতল বরফ।

কবির আত্মবিশ্বাস–

জানে না যে কোনােখানে ক্রোধের অরণ্য রয়ে গেছে

জানে না যে প্রতিহিংসা পরায়ণ রত্নাকর সমুদ্র উত্তাল হয়ে গেছে

জানে না যে পাথরে পাথরে মরীয়া আগুন জেগে আছে।

দিনেশ দাস, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও অমিতাভ দাশগুপ্ত সত্তর দশকের ছােট বড়াে পত্র পত্রিকায় উল্লেখ করার মতো অনেক কবিতা লিখেছেন। দিনেশ দাসের ‘রাম গেছে বনবাসে’—

আশিরদশকে প্রকাশিত হলেও কবিতার ভাবনাগুলি সত্তরকে নিয়ে। কথিত গ্রন্থের ভূমিকায় আলােচিতদশকের কথাই বলেছেন—“ছেলের বাড়ির বাইরে গেলে ফিরে আসবে কিনা বলা যেত না।

অনেকসময় | তাদের খবরও মিলত না। সন্ধে হতে না হতেই গােটা শহর হয়ে। উঠত থমথমে। রাত্রির সিনেমা -শাে বন্ধ থাকত। এই যুগচেতনার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টাই ‘রাম গেছে বনবাসে’-র কবিতা  এরকম অনেক দৃষ্টান্তই উল্লেখ করা যায়।

তারা একটা শক্তিশালী পটভূমি তৈরী করে রেখেছেন তাতে সত্তরের কবিরা তাঁদের সৃষ্ট সম্বন্ধে সচেতন হতে পেরেছেন। সমাজ ভাবনার দিক থেকে, রচনাশৈলীর দিক থেকে প্রাক সত্তরের ও সত্তরের প্রবীণ কবিদের সঙ্গে সত্তরআত্মপ্রকাশ করা কবিদের একটি হার্দিক মেলবন্ধন ঘটে যায়। 

আলােচিত দশকের কবি ও কবিতার মূল্যায়ণ

অলকেন্দুশেখর পত্রী   (১৩৪৭)

সত্তরের এক বহুল আলােচিত কবি। ছবি ও কবিতার এক অন্বয় মেলবন্ধন তার শৈল্পিক উত্তরণের সহায়ক। শব্দের নতুনত্বে, বক্তব্যের অভিনবত্বে তার কবিতাগুলি মনােযােগ্য হয়ে উঠেছে। কবিতা গ্রন্থগুলি হল,-“খােদাই করায়’ (জুন, ৭৯), ‘ডালিকে ভরে’ (চৈত্র, ১৩৮৪), পূর্ণিমায় (আষাঢ় ১৩৮৫), ‘কালে বজ্র’ (বৈশাখ, ১৩৮৬ ), পরমানু জানে ( আশ্বিন, ১৩৮৯)।

অরুণ কুমার চক্রবর্তী    (১৯৪৬)

তথাকথিত এসটাবলিস্টমেন্ট অর্থে নয়, সচেতন কবিতা পাঠকের বােধের আকাশে এক প্রদ্যোৎ জ্যোতিষ্ক অরুণ কুমার চক্রবর্তী। তাঁর কবিতার ভাষা, ভাবনা, আঙ্গিক এক নিজস্ব পরিমণ্ডলে আবর্তিত। ছােট ছােট শব্দ ও বাক্যের মধ্যে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছেন বড়ো বড়ো ব্যঞ্জনাকে।

ছন্দের নৈপুণ্য সাম্প্রতিক কবিতার মধ্যে দুর্লভ। অরুণবাবু বিষয়টির প্রতি মনােযােগী। ছন্দ ভাঙ্গ। ও ছন্দ গড়া-উভয় বিষয়েই তিনি সব্যসাচী। ছন্দনৈপুণ্যের সৃজনে মুখরময় পঙক্তি—‘সাতমুখী সাপ জিভের ডগায় বাজিয়ে দিচ্ছে তুড়ি  আমি এখন নিজের মধ্যে নিজের কবর খুড়ি।

আঞ্চলিক ভাষা প্রয়ােগের ক্ষেত্রেও অরুণবাবু সিদ্ধহস্ত। শ্রীরামপুর  ইষ্টিশনে মহুয়াগাছটা’, ‘পিরথিবী বড়-অ বাথান, কাদদের’, ‘রাজারে, তুই কিসের লেইনে’—ইত্যাদি কবিতাতে আঞ্চলিক ভাষার বিন্যস্ত প্রয়ােগ হয়েছে। দুটি কবিতাগ্রন্থ—অরণ্য হত্যার শব্দে’ (জুন, ৭৮), জলছুরি কাটছে পাথর (জুলাই, ৮২)।

অজয় নাগ   (১৯৪৬) 

অজয় নাগ সত্তরের আরেকজন কবি। তার উৎসাহের মধ্যে কোনাে কৃত্রিমতা নেই। আর এই উৎসাহের ফসল ‘স্বপ্ন ও দীর্ঘশ্বাস’ ‘দূর জন্মের ভাের’ কবিতাগ্রন্থ দুটি এই দশকে প্রকাশিত হলেও সত্তরের মেজাজ ও মর্জি এতে সমানে উপস্থিত।

সত্তরের লিটল ম্যাগাজিনের পাতা থেকে অনেক কবিতা সংকলিত হয়েছে ‘স্বপ্ন দীর্ঘশ্বাস’-এ। অনিশ্চয়তা, বিচ্ছিন্নতা ইত্যাদি নেতিবাচক দিকগুলি তার কবিতায় সংক্রামকের ভূমিকা নিয়েছে। ফলে উত্তরণের পথে এসেছে প্রতিবন্ধকতা।

কবিতাকে অহেতুক দীর্ঘ করার প্রবণতা তার একটি ত্রুটি বলা যায়। প্রসঙ্গতঃ স্বীকার্য, এই সমস্ত ত্রুটি বা অপূর্ণতা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছেন পরবর্তী সময়ে। শব্দ প্রয়ােগ, বাক্যগঠন, রূপকল্প নির্মাণ প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি মার্জিত এবং পরিণত হচ্ছেন।

বসন্তে পৌষে তােমাদের অগাধ শরতে  কীর্ণ অবসরে  ব্যস্ত দিনের কুটিরে / আমার শুভেচ্ছা থাকল। এই প্রত্যয়ে, এই আশাবাদিতায় কবির শৈল্পিক উত্তরণ পাঠকের কাছে প্রত্যাশিত। তার অন্যান্য কবিতার বই–তিনটি বেড়াল এবং আমি ( এপিল, ৭২), রাগরাগিনী (অক্টোবর, ৭৫ ), অস্তিত্ব সর্বস্ব লােপাট ধুমল সৈকতে আমি একা ( ডিসেম্বর, ৮০ ), ‘মানুষের নামে।

অভিজিৎ ঘােষ। (১৯৪৮)

বেশ কয়েকটি কবিতাগ্রন্থের রচয়িতা অভিজিৎ ঘােষ এক স্বকীয় কবিচেতন। সমসাময়িক কবিদের থেকে এক ভিন্ন স্বাদ তার কবিতায় বর্তমান।

তাঁর কবিতার মধ্যে আছে ‘ভয়াবহ সংক্রান্তির মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি দশকের চালচিত্র, আছে নির্বাসিত বাউণ্ডুলে জীবনযাপন এবং যৌনযন্ত্রণার ছবি; আছে সূর্যকরােজ্জ্বল এই মহাপৃথিবীতে প্রেমে মগ্ন এক যুবকের কিছু নিরিবিলি কথপােকথন ; আছে তার রাত্রি আর দিন ; আছে একজন মানুষের দ্বিধা দ্বন্দ্ব সহ বিপন্ন অস্তিত্বের চর্যাপদ গান।

নির্মল বসাকের সঙ্গে সম্পাদিত কবিতাপত্র সৈনিকের ডায়েরী সত্তর দশকের ক্ষেত্রে একটি আন্দোলন বিশেষ। শ্লীলতা অশ্লীলতার গণ্ডী পেরিয়ে সময়কে সময়েব বিপন্নতাকে, কোলাহলকে চিনিয়ে দিতে পারেন অভিজিৎ।

সময় সত্তর তার চেতনায় ঘটায় গুঢ় সত্যময় আলােকপাত ছিন্নমস্ত! ঈশ্বরীর গর্ভস্রাবে জন্ম নিলে সত্তরের বিকলাঙ্গ শিশু। কোলকাতার যােনি থেকে তাজা রক্ত বয়ে যায় শ্মশানের দিকে। কবিতার বই –‘কল্পনার শরীর’ ( জানু-৭৫), ‘শুখা রুটি রােজগারে কাটে দিনমান’ (জানু-৭৯), ‘দুঃখী দেবতার আত্মচরিত।

অজিত বাইরী   (১৯৪৮)

আলােচিত দশকের কবিতায় যে মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন তরুণ বিশেষ ভূমিকা পালনে অগ্রণী হন অজিত বাইরী তাঁদের একজন, অন্যতম।

ঐ সময়ে লেখা ‘নৈঃশব্দ্য সম্মোহন এবং বিষাদ (সেপ্টে৭২), ‘উত্তর দক্ষিণ’ (অন্যান্যদের সঙ্গে) এবং অবেলার রােদ্দরে তােমার মুখ ( আশ্বিন ১৩৮২)। পরবর্তী সময়ে লেখা—‘বিদায় কোভালাম বিদায় সূর্যাস্ত (কার্তিক-১৩৮৫), ‘বিষন্ন অর্কিড ও ভাই অ্যালিন’ (মার্চ-৮১), প্রিজন ভ্যান ও কালপুরুষ’ ( জুলাই-৮৪) সময়ের অবক্ষয়কে জানিয়ে দেয় তার কবিতা।

বিক্ষুব্ধ কবিচেতনায় তাঁর দেশজননী ভারতবর্ষ হয়ে যায় ‘বােবা। বলেন—“ক্ষিধের চাবুক খেতে খেতে ভারতবর্ষ । বােবা যুবকের দু’চোখে দ্যাখাে, চোখ ফেটে  ঘােলা জল, বােবা ক্ষোভ। 

ভারতবর্ষ, পশুর মতাে তােমার পায়ে আমি মুখ ঘষছি। তাঁর লেখায় বিগত দশকের প্রভাব সম্পর্কে তার স্পষ্ট অনুচিন্তন,‘সত্তরের কবিতা লিখতে বসে আমি অস্বীকার করার স্পর্ধা রাখি না বিগত দশকের কবিদের।

অতীত অস্বীকারে নয়, অঙ্গারাত্তিকরণেই কবিতার প্রতি যথার্থ মমত্ববােধ গড়ে তােলা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। সমসাময়িক কবিবন্ধুরা আমরা যারা হাঁটছি পাশাপাশি, মনোেযােগ রাখি প্রত্যেকের দিকেই। এবং সেই সঙ্গে সচেষ্ট হই স্বকীয়তা অর্জনে ।।

অনির্বাণ রায়চৌধুরী    (১৯৪৮)

অনির্বাণ রায়চৌধুরী সত্তরে লেখা শুরু করেছেন। সত্তরে তার কোনাে কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। ১৯৮৩ তে প্রকাশিত ‘অনিন্দ্য গোলাপের কাটা’-তে তার প্রাক দশকে প্রকাশিত কবিতা-ই বেশী স্থান পেয়েছে। তার সেই সময়ের কবিতার মুখ্য বিষয় ছিল প্রেম।

প্রথম যৌবনের বিস্ময়, অনুভব যা মানুষের রক্তে তােলে হিন্দোল কবি সেই অনুভূতিকে কবিতার প্রতিমায় বাত্ময় করে। তুলেছেন। সমকালের সমাজ সচেতনতা থেকে যে তিনি বিমুক্ত, তা নন।

প্রেমের দয়িতার মধ্যে তিনি খুজে পেয়েছেন সংগ্রামের উৎসশিখা। প্রকাশিত অন্য দুই কবিতার বই ‘ঝড়ের সহযাত্রী ও ‘আমার অবােধ প্রজাপতি।

অলােকনাথ মুখােপাধ্যায়    (১৯৫০)

সত্তরের কবি তালিকায় অলােকনাথ মুখােপাধ্যায় নিজস্ব ব্যক্তিত্বে একটি শােভন সংযােজন। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। অলােকনাথ—কোনো একদিন  মানুষের পাশাপাশি ভাবে মানুষ, আঁস্তাকুড় থেকে  বেজে উঠ:ব সঙ্গীত-নীল জীনস-পরা মেয়ে / ছুটে যাবে কিশােরের কাছে।

কোথায় যেন চলে যেতে চান অলােক। তবে কি জীবন থেকে পালিয়ে যেতে চান। বােধহয় না। অসুখ, দুঃস্বপ্ন, পাপ, জৈবিক ক্ষুংকাতরতা কবিহৃদয়কে আশাভঙ্গ করে। পলায়ন মনােবৃত্তি এই ভাবেই আসে। কিন্তু এই আত্মিক অস্থিরতা তাকে অনেকটা সময় ধরে বিচলিত করতে পারে না।

স্থিতধী হন তিনি বলেন—“যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবে। একথা ভেবেই শুধু / যাওয়া হয় না, থেকে যেতে হয়। যে যার মতন শুধু ভেঙ্গে ভেঙ্গে টুকরো হয়ে যাওয়া। এসব ভেবেই স্রেফ যাওয়া হয় না, থেকে যেতে হয়। যেখানে যেমন আছি -একা-একা 

দুঃখীর মতন। তার বক্তব্য—“যে খেলা হয়েছে শুরু  শেষ হ’ক— চোখের জলের হাহাকার | শেষ হ’ক মৃত্যুর আগেই   শব্দ প্রয়ােগ, রূপকল্প নির্মাণ ইত্যাদি বিষয়ে অলােকনাথ সিদ্ধহস্ত কবিতাগ্রন্থ— ‘মানুষের জন্যে, এসাে, মিলেমিশে থাকি, ‘বিদায়, চোখের জল।

অমিত চক্রবর্তী

অমিত চক্রবর্তী সত্তরে লিখেছেন “আমি চলে যাব’ (বৈশাখ, ১৩৮১, ) ও ‘চাবুক’ (এপ্রিল, ১৯৭৭) নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ। সময় সচেতনতা অমিতের অন্যতম গুণ। ভারতবর্ষকে তিনি দেখেছেন সমকালের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিতে।

স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন, আশা এবং হতাশ। অমিতের কবিতাকে একটি বলয়ে আবর্তিত করেছে। অমিত ভেঙ্গে পড়েন, তেমনি স্বপ্ন দেখেন। ভেঙ্গে পড়া অমিতের কণ্ঠ –‘প্রিয় কমরেড তুমি জেলে বসে আমার কবিতা পড় না।

তােমার সারাগায়ে ঐ বীভংস ঘ। আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না। । ঠিক এই ভবেই বাবাও একদিন সেলুলার জেলের ভেতর পচে গলে মারা গেল | শুধু তার টেলিগ্রাম ছাড়া আর কিছুই আসেনি। অন্যদিকে অমিতের স্বপ্ন,—“আমি আবার জেগে উঠলাম ভারতবর্ষ।

অলকেশ ভট্টাচার্য   (১৯৫২)

আলােচিত দশকের এক অনন্য স্বাদের কবি অলকেশ ভট্টাচার্য। তার কবিতার বই -বরফ টিলার স্টেশন’ । লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় তাঁর কবিতা অপেক্ষাকৃত কম প্রকাশ হলেও এমন একটা দাগ রাখে যা অস্বীকার করা যায় না।

অলকেশও সময়কে দেখেছেন জাগরী সত্তায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টানাপােড়েনে দ্বিধাগ্রস্থ এবং দ্বিধাত্তীণ একটা ছায়া, প্রভাবশালী ছায়া তাঁর কবিতার পত্রপল্লবে বিস্তারিত হয়েছে। পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শব্দের ব্যবহার সময় সচেতন অলকেশকে চিনিয়ে দেয়।

সত্তরের অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলতা এবং এর থেকে উত্তরণের জন্য সংগ্রামমুখিনতা তার কবিতার ছন্দে ছত্রে স্পন্দিত। প্রশাসনের জিপ রাখালকে রাত বারােটায় তুলে নিয়ে চলে যায়।

যে রাখাল নীরবে নিভৃতে কখনো বা প্রকাশ্যে মানুষের মুক্তির কথা ভাবতাে তাকে ভুলতে পারেনি অতি সাধারণ একজন নারী মতিলাল চৌকিদারের বউ। রাখাল তার ছােট্ট কুটিরে গােপনে রেখে এমন একটা কিছু যা উজ্জীবনের ইস্তাহার।

অলকেশের ইঙ্গিত– আর একটা জিনিষ আছে ঐ ঘরে শুধু মতিলালের বউ জানে  যা আর কাউকেই বলা যায় না মতিলালকেও।

অজিত ভড়     (১৯৫২)

 অজিত ভড়ের এখনাে পর্যন্ত কোনাে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। কিন্তু সত্তর দশকে প্রকাশিত অনেক কবিতা দিয়ে তিনি পাঠকদের আলােচিত দশককে চিনেছেন, চিনিয়েছেন।

তাবৎ বিশ্বের এই সমাজ, সংসার, মানুষজনের প্রতি তাঁর প্রথামাফিক বিশ্বাস, প্রেম বা ভালবাসা নেই। সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে এক অনিশ্চয়তা তঁাকে ক্লান্ত করে। বুকে বাসা বাঁধে অভিম!ন এবং অভিমাননিষিক্ত ক্ষোভ।

দুঃখ ও ক্লান্তির পথ হেঁটে নীল সমুদ্রের দিকে তাঁর উজান যাত্রার  প্রার্থনা—এই শরবিদ্ধ আমি হাটু গেড়ে বসেছি মাটিতে “হে সূর্য করুণা করাে। নিজেকে ভেঙ্গে, টুকরো টুকরো করে পুনর্গঠনের।

স্বপ্ন দেখেন অজিত-‘ভাঙ অজিত ভাঙ কাট অজিত কাট; নিজেরই মাংস কিছুটা কেটে বেশ করে নুন ঘষে দে। জ্বলতে জ্বলতে কুচো কুচো ছবিগুলো নিয়ে নতুন করে নিজেকে জোড়া। সম্প ক্ত ও সংশ্লিষ্ট সুযােগ পেলে অজিত ভালাে লিখতে পারবে।

অশােক চট্টোপাধ্যায়

অশােক চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ—উত্তর তিরিশে এসে (বৈশাখ, ১৩৮২), সামুদ্রিক নােনাগন্ধ’ ( বৈশাখ ১৩৮৫)। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও অতীন্দ্রিয় প্রেম প্রথামাফিক আঙ্গিকে সাধারণ শব্দের মণিহারে গ্রথিত হয়েছে উত্তর তিরিশে এসে’-র কবিতাগুলিতে।

লেখার মধ্যে এমন কিছু অনাস্বাদিত ভাবনা নেই যাতে তাকে অনেক দিন মনে রাখা যায়। গােধুলি মন’ সম্পাদনার মাধ্যমে তরুণ কবি। পরিমণ্ডল-কে সত্তর দশক থেকে উৎসাহ দিয়ে যােগ্য দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

অনন্য রায়  (১৯৫৫)

সমগ্র সত্তর দশকের চালচিত্র যাঁর কবিতার দর্পণে বিম্বতি হয়েছে সেই অনন্য রায়ের নিকট হতে অনেকগুলি কবিতাগ্রন্থ পাঠক পেয়েছেন। যেমন –“দৃষ্টি’, ‘অনুভূতি ইত্যাকার প্রবাহ এবং আরাে কিছু’, ‘নৈশ বিজ্ঞপ্তি, ও ‘নীল ব্যালেরিনা।

সামাজিক বাস্তবতাকে কেউই উপেক্ষা করতে পারেনি। তাহলে শিল্পের দায় স্থলিত হয়। দায়ের তাগিদ থেকেই কবিতায় সামাজিক সমস্যাকে শিল্পের সংযমে চিত্রিত করেছেন।

সত্তরের সার্বিক মানুষের অবক্ষয় অনন্ত রায় ভােলেননি। তাৎক্ষণিক অন্ধকারকে স্বীকার করে নিয়ে বলেন “ইভনিং পুরােকায়স্থের সঙ্গে প্রতি শনিবার যাব মৃত্যুনীল নিষিদ্ধ পল্লীতে ; / নেহাৎ ছলনাবশে আত্মহত্যা করতে যাব সব পেয়েছির ইস্টিশানে  কুমারীর গর্ভকোষে।

কিন্তু এই তমসা কোনো শিল্পীই চান না। অন্য ও না। তিনি চান রূপান্তর-‘এভাবে অভ্যাসমুগ্ধ মৃত্যুযাপনের থেকে চাই রূপান্তর।

অনুরাধা মহাপাত্র    (১৯৫৭)

বয়সের দিক থেকে সত্তরের এক কনিষ্ঠা কবি অনুরাধা মহাপাত্র। সত্তরে সামান্যই লিখেছেন। আসলে আশি-ই তার কবিকর্মের যােগ্য প্রাঙ্গণ। তবু তার মধ্যে পাওয়া গেছে এক প্রতিশ্রুতি।

বাস্তরের নিষ্ঠুরতা থেকে তার হৃদয়ে দাগ রেখেছে অভিমান বােধ। তা উত্তরণের সহায়ক হতে পেরেছে। ছােট ছােট কবিতার মধ্যে গভীরতর ভাবনার ঠাঁই মিলেছে।

একটি উদাহরণ –‘আমি খুলে দেবে। শুন্য সিথি / তুমি দিও রাবনের লাবণ্য। শব্দ প্রয়ােগে তঁার দক্ষতা প্রশংসার দাবী রাখে। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ—“ছ ই ফুল স্তুপ।

‘অ’ বর্ণের অন্যান্য কবি ও কবিতাগ্রন্থ। অমিতাভ দাস। (১৯৪৩)। অরুণ সাধুখ।। (১৯৪৪)।—ঝুলে আছি জব্দ হয়ে আছি। অমিতাভ গুপ্ত। (১৯৪৭)। কবিতাগ্রন্থ – আলো এসো আমার ঘরে’, ‘এক বছরের সামান্য কবিত’, ‘ঝরা মানুষের কবিতা।

অশােক বন্দ্যোপাধ্যায়। (১৯৫১) –‘বাইনােকুলার। অরণি বসু। (১৯৫১)।—“শুভেচ্ছা সফর। অভিজিৎ সিরাজ। অমরনাথ বসু। পঁচিশ বছরের বুকে হাত রেখে’ (১৯৭৬)

অঞ্জন সেন (১৯৫২) –‘কথাবার্তা। অজয় সেন। (১৯৫৩)। অভিরূপ সরকার। (১৯৫৫)। –‘আমপাতার মুকুট। আবদুস শুকুর খান। (১৯৫৪)। কবিতাগ্রন্থ জীবনের অসমাপ্ত কবিতা।

ঈশ্বর ত্রিপাঠী

ঈশ্বর ত্রিপাঠী সত্তর দশকের এমন এক কবি যিনি গ্রাম জীবনের কথা, গ্রামীণ মানুষের কথা বড়ো বেশী করে ভেবেছেন। গণচেতনায় তাঁর শিল্পের প্রাণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সাধারণ খেটে খাওয়া পুরুষ, নারী, দারিদ্র পীড়িত কৃষক তার কবিতার বিষয়। তার কবিতার বই ‘সাপ’ (সেপ্টেম্বর ৭৭) ঈশ্বর বেদ (ডিসেম্বর ৭৭), অনন্ত মহিম (ডিসেম্বর ৭৯), ঋক অথবা শায়েরী (শ্রাবণ ১৩৮৬), পদ্য কথামৃত ( আশ্বিন ১৩৮৮)।

উজ্জ্বল সিংহ     (১৯৫৪)।

কবিতার বই –‘স্বপ্নে দুঃস্বপ্নে’।

একরাম আলি  (১৩৫৯)

সত্তরের এক পরিচিত কবি একরাম আলি। কবিতার শরীর নির্মাণে তার সমধিক নিপুণতা স্বীকার করে নিতে হয়। উদ্ভাসিত মাংসরাশি—পর্যায়ের কবিতাগুলি বিষয়ভাবনা ও গঠনগত দিক থেকে অভিনবত্বের দাবী রাখে।

দেশ, কাল, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববােধে একরাম এক নিখাদ শিল্পী। তাই যেখানে ভালবাসাহীনতা সেখানেই তার তির্যক প্রতিবাদ। কবিতার বই– ‘অতিজীবিত।

ওয়াজেদ আলি    (১৩৫৮)

ওয়াজেদ আলি সত্তরের এক উজ্জ্বল মুখ। সমকালীন লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় তাঁর কবিতার একটি গুরুত্বপুর্ণ স্থান ছিল। দেশাত্মবােধ তার কবিতাকে একটি বিশেষ আভিজাত্য দিয়েছে। কোনাে সংকটের কাছে, কোনো সংশয়াচ্ছন্নতার কাছে তাঁর নতজানুতার কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

আশাবাদ তঁার শিল্পে তুলেছে তুর্য নিনাদ—‘আমি হিম-কুয়াশার ভিতর তােমার অবয়ব দেখি  তুমি আমার দুঃখিনী মা ভারতবর্ষ    আমার বুকের রক্তে নীল নীল পতাকা ওড়াও | আমার আলাে-ছায়া দিনগুলাে। তােমাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কবিতার বই—‘প্রিয়জনের মুখ’ (১৯৭৪), ‘অন্তত একবার।

কেদার ভাদুড়ী     (১৯১৫)

কেদার ভাদুড়ী সত্তরের এক সমধিক উল্লেখযােগ্য নাম যদিও বয়সের হিসাবে তার পঞ্চাশের কবি হওয়া উচিত ছিল। শ্লীলতঅশ্লীলতার তােয়াক্কা না করে তিনি কবিতায় যথেচ্ছ নারী-শরীরের বর্ণনা দিয়েছেন।

সব ক্ষেত্রে যে এই আচরণ কবিতাকে দুর্বল করে দিয়েছে তা অবশ্য নয়। কোনাে কোনাে ক্ষেত্রে এর যথােচিত আরােপে কবিতা প্রসাদগুণ লাভে সমর্থ হয়েছে। সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষিতে সমাজের নগ্ন সত্য তিনি নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছেন।

জীবনবোধের প্রখর অনুভূতিতে তিনি স্বকীয় এবং উজ্জ্বল। তার কবিতার বই-পাথরের শ্লেট (১৯৭৪), অন্যান্যদের সঙ্গে প্রকাশিত সংকলন। ‘চার পুরুষ এক নারী (১৯৮০), ‘তিন ভুবনের প্রেম।

কার্তিক মােদক   (১৯৪৩)

ষাটের মধ্যভাগ থেকে লিখতে শুর করেছেন কার্তিক মােদক।  মূলতঃ সত্তরের কবি। কবিতার মধ্যে প্রতিশ্রুতি ও পরিচ্ছন্নতার ছাপ আছে।

সহজ শব্দের রঙতুলিতে কোনাে ছবিকে কত স্পষ্ট ও অন্তরঙ্গ করে তােলা যায় তার নমুনা– ‘সবুজ লতার মতাে ঘন মেঘ  উড়েছিল প্রজাপতি  গ্রামের মেলায় / যে কোন  পােশাক থেকে  ছুটে আসে শৈশব। বিষাদময়তার প্রতি তার কেমন যেন একটা মায়া বা মােহ আছে। এই বিষাদময়তা তার হৃদয়কে মেঘগর্ভ করে তােলে। যেকোন মুহূর্তে যেন বৃষ্টি হবে।

তিনি সাবলীল, স্বচ্ছন্দ ও অনর্গল প্রবাহকে বেছে নেন। রেখে যাবো কবিতায় তার দুঃখ, তার অনুভূতি এবং একই সঙ্গে তার উত্তরণ– ‘আমাকে তুমি যতবার আঘাত কর ততবার মৌসুমী ফুলের মত বিস্ফারিত হই। প্রথম কবিতার বই ‘ফুল ফোটার শব্দে চিঠি আসে’ ( বৈশাখ, ১৩৮৭)। পরবর্তী বই–‘সুখ দুঃখে নিঃস্ব হই।

বৃষ্ণসাধন নন্দী । (১৯৪৩)

কৃষ্ণসাধন নন্দী সত্তরের কবি। সত্তরের কবিতার ফসল— ‘ডুবে যাচ্ছি ভেসে উঠছি’–সংকলনে গ্রথিত। দুঃসময়ের বৃত্তে কৃষ্ণসাধনের অপরিহার্য পরিক্রমণ।

তা’ব’লে ক্লান্ত নন তিনি। ‘দুঃস্বপ্নের মধ্যে আলোর সংকেত খুজবাে’–তার উচ্চকণ্ঠ উচ্চারণ। আক্রমণকে প্রতিরােধ করা মহৎ কবিকর্মের লক্ষণ। কৃষ্ণসাধন। বিষয়টির প্রতি মনােযােগী। সুতরাং তার স্বতােৎসারিত কণ্ঠ ‘আমাকে তুমি কি বৃক্ষ ভেবেছ  যে নির্বিকার থাকবে। যতাে ইচ্ছে কুড়ল চালাবে।

কমল চক্রবর্তী। (১৯৪৬)

কমল চক্রবর্তীর কবিকর্মের আত্মপ্রকাশ করা দশকের নাম | সত্তর। কাব্যগ্রন্থ—চার নম্বর ও ফার্নেস চার্জড’, ‘জল, ও ‘মিথ্যে  কথা। কবিতায় নতুন নতুন শব্দ ও রূপকল্প প্রয়ােগে তিনি নূতনত্ব। দেখিয়েছেন। কিন্তু তার সেই নির্মাণ সবক্ষেত্রে যােগ্য ও শিল্পময় হয়ে ওঠেনি।

একথা ঠিক শব্দ ও উপমার ভাঙ্গাগড়। খেলতে খেলতে তিনি অনেক প্রিয় শিল্পসৌম্য কবিতাও লিখে ফেলেছেন। আসলে তিনি সম্ভবত জগৎ ও জীবনকে, নানান স্থলন, অসংগতি ইত্যাদিকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে ভালোবাসেন। সংশােধনের জন্যই তো ঐ শব্দভেদী বাণ । ভালােবাসা আন্তরিক হলে তবে এমনটা করা। যায়।

কনাদ গঙ্গোপাধ্যায়   (১৯৪৬)

কবিতার বই—‘আত্ম জ তরঙ্গগুলি।

কৃষ্ণা বসু  (১৯৪৭)

কৃষ্ণা বসু সত্তরের এক পরিচিত কবি। কাব্যগ্রন্থ—‘শব্দের শরীর’ ( আগষ্ট ৭৬) এবং জলের সারল্যে’ (১৯৮০)। সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গে পালিত কৃষ্ণ। কবিতা রচনার ক্ষেত্রে তাঁর স্বকীয় কবিব্যক্তিত্বটির পরিচয় দিতে পেরেছেন।

কবিতার সঙ্গে মগ্ন সহবাস’ তঁার। শব্দই কবিতার আত্মা। সুতরাং কবিতার আত্মিক সৌন্দর্যের স্বার্থে শব্দের শরীর পরিচর্যায় যত্নশীল হওয়া শিল্পীর প্রধানতম দায়িত্ব। বিষন্ন তাময় রােমান্টিকতা, বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বলতায় তাঁর কবিতা তীক্ষ্ণ শরের মতাে পাঠকের মনন ও হৃদয় বিদ্ধ করে।

‘আমি অকপ পঁড়িয়ে আছি রণক্ষেত্রে। কে আমাকে নেবে! কোটি ঘােড়সওয়ারের মতো অতি দ্রুত সহর্ষ অতিক্রম করে যাচ্ছে হনন প্রবণ সময়’–জাতীয় পঙক্তিগুলি কৰিসিদ্ধির চূড়ান্ত পর্যায়কে সূচিত করে। সাম্প্রতিক প্রকাশিত কাব্য — কার্ডিগানে কুসুম প্রস্তাব।

কমল সাহা    (১৯৪৯)

কাব্যগ্রন্থ –“মেঘ ময়র এবং অন্যান্য’, ‘অসীমার জন্য।

কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়   (১৯৫১)

কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় কবিতা লেখার নিজস্ব গুণেই সত্তরে পরিচিত হয়ে গেছেন। কেউ জোর করে তাকে চিনিয়ে দেয়নি। কবি আলােচিত দশকের সমস্যাবলীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

পাহাড় প্রমাণ ক্ষোভ জমে ওঠে তার ঘরে। অথচ বাইরেটায় কেমন যেন ঝকঝকে প্রসন্ন শিল্পকর্ম ফুটিয়েছেন। যন্ত্রণার আর্তিকে পুণ্যশ্লে কে উদ্ভাসিত করার যাদু জানেন কল্যাণ।

তার আশান্বিত মনন-‘বড় হলে একদিন সচ্ছলতা আমার দরজায় এসে কড়া নাড়বে। সুতরাং পরস্পরের মুখ চিনে নেবার সুস্থ মাঠ একদিন পেয়ে যাবেন কল্যাণ। কাব্যগ্রন্থ-মন্ত্রে মুখ যন্ত্রণায় পা।

গৌরশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়   (১৯৪৬)

গৌরশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই সময়ের এক কবি যার সমাজমনস্কতা বিষয়ে পাঠকের সন্দেহ থাকে না। সময় সম্পর্কে দায়িত্ববােধ, ভালােবাসা বিষয়ে গভীরতা তার কবিকর্মের মহৎ লক্ষণ। মানুষের ভালােবাসা তাকে দিয়েছে প্রচ্ছন্ন মহিমা।

কারণ ‘বুকের গভীরে হাত ডুবিয়ে’ এই ভালােবাসা তিনি চয়ন করেছেন। সত্তরের সময় পরিধি নৈরাশ্য, অবিশ্বাস, সংশয়ে আবর্তিত। সময়কে স্বীকার করে সময়ােত্তর ভাবনাই গৌরশঙ্করের মুখ্য অভিপ্রায়। ক্লান্তি তাকে থামায় না।

ক্লান্তিহীন পথে অবসন্ন অই মানুষ নত হয়ে । দেখলো অঘ্র.ণের আকাশ। প্রয়ােগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু দুর্বলতা। পাঠক-হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তােলে। কাব্যগ্রন্থ –‘আমাকে জাগিয়ে রাখে’ (১৯৮১), ভাঙছে ঝরে পড়ছে’, ‘নিকটে আমার দিন, ‘যেদিকে জীবন।

গৌতম মুখােপাধ্যায়  (১৯৪৯)

কাব্যগ্রন্থ—‘প্রভাস।

গৌতম চৌধুরী    (১৯৫১)

সত্তরের বিশেষভাবে চিহ্নিত এক কবি গৌতম চৌধুরী। আলােচিত দশকের লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত অনেক শিল্প সমৃদ্ধ কবিতার তিনি জনক।

সমকালকে, সমাজ অন্বিত জীবনকে তি; বিচিত্র অভিজ্ঞতায় দেখেছেন। অভিজ্ঞতাপুষ্ট জীবনের চালচিত্র তার কবিতা। কবিতার শরীর নির্মাণে তার সাবলীলতা উল্লেখের। দাবী রাখে। কবিতার বই -কলম্বাসের জাহাজ’, ‘হনন মেরু’, ‘পৌত্তলিক।

চির মিত্র

চির মিত্রকে সত্তরের কবি বলা অন্যায় হবে না, যদিও সত্তরের প্রথম দিকে তাঁর কোনো উল্লেখযােগ্য কবিতা পাঠকের বােধে নাড়া দেয়নি। লেখা চর্চার সময় অনুপাতে ফসল তেমন পরিণত নয়। একথা ঠিক, কবিদের সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ববােধ সম্পর্কে তার কোনাে ফঁাকি নেই।

মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারবােধ সম্পর্কে সচেতন। বক্তব্যের বিস্তৃত ব্যাখ্যা বা explanation নিটোল কবিতা রচনার অন্তরায়। এই বিষয়টির প্রতি চির মিত্রের সজাগ দৃষ্টি নেই। আলােচিত সময়সীমার মধ্যে তাঁর কোনাে কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। সম্প্রতি তাঁর একখানি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে—নাম রেখেছি রূপায়ণ’ ।

চিত্ত মণ্ডল

চিত্ত মণ্ডল সত্তর দশকের গণমুখী পত্র পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা লিখেছেন। স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক গণ আন্দোলন তার কবিতার মুখ্য প্রেরণা। সহজ ও সরল ভাষায় প্রাণবন্ত কবিতা লিখেছেন। কবির সামাজিক দায়বদ্ধতা বিষয়ে তিনি জাগরী ।

অশান্ত উচ্ছ,জাল সত্তর দশকের বীভৎসতার চিত্ত মণ্ডল হতোদ্যম নন, বরং আশাবাদী। ধ্বংসের মধ্যেই তিনি খোঁজেন গঠনের ইঙ্গিত। ‘ছড়িয়ে আছে আকাশ জুড়ে কবিতায় আশাবাদী কণ্ঠ ‘চামড়া কেটে মাংস ঘেটে লাল বরণের মুণ্ডুপাতে যতই তােমরা সানাও চাকু বুলেট গুলি গ’বেচারা তুবড়ী ছুড়ে নেভাও আলাে বুকের . মধ্যে হাড়ের নীচে / তেজী ঘােড়ার শক্তি দাপট লুকিয়ে থাকে দেয়াল ভাঙ্গার। এই দশকে প্রকাশিত তার একমাত্র কবিতার বই ‘জতুগৃহে স্বপ্নরথী।

জহর সেনগুপ্ত   (১৯৪৯)

সত্তর দশকের এক অল্প পরিচিত কবি জহর সেনগুপ্ত। যন্ত্রসভ্যতা, নিসর্গ, প্রেম ইতাদি অনুষঙ্গ তাঁর কবিতায় একটি আবেদন রেখে গেছে। একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ—দক্ষিণ বাংলার জন্ম।

এই গ্রন্থের ‘চঁদ’ কবিতায় যন্ত্রসভ্যতার প্রেক্ষাপটে নিসর্গ প্রকৃতির সহাবস্থানের দৃশ্যটি প্রতিফলিত হয়েছে। শব্দের নিটোল বুননে তার কবিতা প্রাণমুখর।

জয়তী রায়। সত্তরে বেশ ভালো কবিতা লিখেছেন জয়তী রায়। ছােট পত্রিকা এবং কিছু কিছু নেতৃস্থানীয় সাহিত্যপত্রে তার কবিতা প্রায়ই চোখে পড়ে। কোনাে বিশেষ দৃষ্টিকোণ তার কবিসত্তাকে সংকীর্ণ করতে পারেনি। বাস্তবতার স্থল প্রেক্ষাপটে রােমান্টিকতার স্বচ্ছন্দ প্রবেশাধিকার জয়তীর শিল্পায়ত্ত। কবিতার বই—‘নীল পদ্ম, তােমার সহস্র পাপড়ি।

জ্যোৎস্না কর্মকার

সত্তর দশকের পত্র পত্রিকায় জ্যোৎস্না কর্মকার লিখেছেন। কবিতা রচনায় তার স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় লক্ষণীয়। কবিতার বই ‘বেদবর্ণ মুখ’ নানা দিক থেকে স্বকীয়তার দাবী রাখতে পারে । ছােট ছােট শব্দের ফুল দিয়ে গভীর ব্যাঞ্জনাময় এক মণিহার গড়তে জ্যোৎস্নার কবিমনটি জাগরী।

এরকম একটি কবিতা – এই সময়’-এ বলেন —‘বাড়ীতে কোন চিলে কোঠা নেই | সময় নেই, সময় নেই কোন ; / চিলে কোঠাতেই কিছু কবির জন্মায় / বেঁচে থাকে, আত্মমগ্ন :  কবির ভগ্নাংশ রাস্তার মিছিলে  বড় ক্লান্ত’।

জয় গােস্বামী  (১৯৫৪)

 জয় গােস্বামী শেষ সত্তরে কবিতায় আত্মপ্রকাশ করেন এবং চমকে দেন পাঠককে। জয়ের নিরীক্ষণ,—কোটি আলােকবর্ষ ও দুর্নিরীক্ষ্য মহাকাশের পটে এই পৃথিবীর ধাতু, পাথর ও মেঘের বিদারণ, দ্রবণ ও মেঘের পুনর্জন্ম ।

এরই মধ্যে, আমাদের ভঙ্গুর স্নেহ, চন্দ্রালােকিত রূপকথা এবং ভয়াল অবসান লক্ষ্য করছে এক অমর, বিমর্ষ, জ্ঞানী প্রত্নজীব। সময়কে, সময়ের অসম্ভব নিষ্ঠুরতাকে ধরতে পেরেছেন জয়।

‘রক্ত’ কবিতায় তার রক্তক্ষরণের যন্ত্রণা- “আজ মিথ্যে হাটুর ভিতরে । মুখ গুজে রাখি আর সারারাত ধরে বসে বসে |যখনই তাকাই, দেখি, সে মেয়ে ঘটের নীচে এক হাতে শাড়ির গোছা ধরে | ছুরিতে মাখানো রক্ত পা দিয়ে তুলছে ঘষে ঘষে !

একদিকে ক্ষয়, অবক্ষয়, অন্যদিকে অন্ধকারের ওপিঠে সূর্য ওঠার সংকেত তাকে প্রাণিত করেছে। বলেন জয় – ‘জাগো, জেগে ওঠো রােধ, / •••”এসো আগুনের মধ্য থেকে আমরা টেনে তুলি আমাদের নতুন বৃন্দগান। কবিতাগ্রন্থ– ‘ক্রীস মাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ ( জানুয়ারী-৭৭ ), ‘প্রতুজীব, ‘বৃন্দগান’, আলেয়। হ্রদ ( জুলাই, ৮১, উন্মাদের পাঠক্রম।

মিল সৈয়দ    (১৯৫৬) 

সরের কবিতার বাস্তবতার নিবিড় সুরটি জমিল সৈয়দর ভাবনায় পরিফুট – কবিতা যদি কোনো বৃহত্তম উৎসবের এথম ৩ম ও শেষতম প্রমাণ অঙ্গুরী হয়, তাহলে কোনাে উৎসবই উৎসব নয় যদি তা গরিষ্ঠতম মানুষের ক্ষোভ-ক্ষুব্ধ হৃদয় বাসনার চুট:নামুখ কুঁড়িটিকে সযত্নে পরিচর্যা না করে, যদি রক্তের লাল ও সদ) কণিকাদের যুদ্ধ পারম্পর্যকে সঠিক অর্থে অনুভূতির দরােজায় এগিয়ে আসতে না দ্যাখে।

দীর্ঘ পঙক্তি দিয়ে সাজানাে পরিচ্ছন্ন চিন্তা তার কবিতার প্রাণবস্তু। নীল দেশে’ কবিতার এরকম উল্লেখযােগ্য পঙক্তি আমাদের স্মৃতিময় আশ’কে সুদূরগামী করে— চিঠি লিখে ঘরে ঘরে জানিয়েছি — নীল দেশে নেমেছে ডুবুরি, / হাসের পালকে ঝরা কবির দুঃখগুলি এইবার হেঁাবে কি কাগজ ?

তেজেশ অধিকারী   (১৯৪৫)

সত্তর দশকের এক সুপরিচিত কবিমুখ তেজেশ অধিকারী। সময়ের সংকটের কাছে মানুষের সুস্থ অস্তিত্বের প্রশ্ন একটা মুখ্য বিষয়। সমস্ত অমানিশার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয় মানুষকে। জীবনের উপল ব্যথিত গতিকে স্বীকার করে নিতে হয়।

বেঁচে থাকার প্রয়োজন আছে এই বােধ তেজেশকে প্রাণিত করে। তেজেশেরকণ্ঠ অভিমান রুদ্ধ। মানুষের দুটি পিঠ-আলাে আর অন্ধকার। সব মিলেমিশে দোষে ও গুণে, উত্থানে ও পতনে মুখর মানুষ । তেজেশ বলেন—সেখানে ছিল ঘর 

কৃষ্ণপক্ষ রাতেই। ছিল বাহার  আতসবাজি, আলাে ঝলমল | কেউ আসেনি তার | সেখানে ছিল ঘর  সবাই বলে সেও মানুষ, ব্যথাতে জর্জর ”। সম্ভবত তার নিজস্ব কোনাে কবিতাও নেই। কয়েকটি সংকলন গ্রন্থে, পত্র পত্রিকায় তাঁর কবিতাগুলি মননশীল পাঠকের উপজীব্য।

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়  (১৯৪৭)

সংগত কারণে তপন বন্দ্যোপাধ্যায় সত্তর দশকের এক স্বতন্ত্র চিহ্নিত মুখ। কয়েকটি কবিতার বই—ভাবনায় সাম্প্রতিক শব্দগুলি’, বাবা দক্ষিণ রায়ের গুলগুলি চোখ’, ‘মা বনবিবির হাজার বাহন।

লােককথা পুরাণ ভাবনা এবং আঞ্চলিক উপজাতির কথা তার কবিতায় স্থান পেয়েছে। সাওতালী কবিতার ওপর তাঁর গবেষণাধর্মী সংকলন অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। জীবনে জীবন যােগ করার নিবিড় ফলশ্রুতি গ্রামীণ রূপকল্পের যথােচিত প্রয়ােগ ও শব্দের দ্রিমিকি ধ্বনি তার কবিতার অনন্য অলঙ্কার।

দীর্ঘ কবিতা লিখতে ভালােবাসেন। ঘটনার ঘনঘটায়, শব্দের মিছিলে তিনি যে অখণ্ড সম্মেলন তৈরী করেন তার রস উপলব্ধিতে পাঠকের ক্লান্তি থাকে না। মানুষকে নিয়ে যে চলমান সমাজ সেই সমাজেব ধারাবাহিকতায় প্রকৃত সভ্যতার উন্মেষ।

তপন বলেন – ‘মানুষ সে তাে রক্তমাংসের গড়া জীব, তার কোষে কোষে | সুখ ও দুঃখের সহাবস্থান, / উত্তরাধিকার বয়ে সে যে চলে যায় দীর্ঘ মিছিলের অবশেষে পুনর্বার অন্য কারুকে উত্তরাধিকার দেবে বলে।

তুষার চৌধুরী     (১৯৪৯)

সত্তরের একজন কবি তুষার চৌধুরী। সমকালের দুঃস্বপ্ন ও অবক্ষয় তার কবিতার প্রাণসম্পদ। বলেন –“দুঃস্বপ্নে ঘঁক পাক করি : জলন্ত লােহার শলা পায়ুপথ ফুড়ে উঠে আসে।

দুঃস্বপ্ন থেকে ক্রমমুক্তি শিল্পী মাত্রেরই পাথেয়। তাই ‘সংসার ধর্মের মধ্যে প্রতিদিন সেঁদাগন্ধ টের পেয়ে যান। কবিতার বই – ‘অলীক কুকাব্য রঙ্গে’, ‘স্বপ্নলােকে কোথায় শিকারী’।

তারক ভড়

সত্তরের কবি তারক ভড়ের কবিতাগ্রন্থ – যাক না ভালবাসা নিলাম হয়ে’ (সেপ্টেম্বর ৭৭), ও ‘এখন যুদ্ধের জন্য (মার্চ ৮১)। আলােচিত দশকব্যাপী লিখেছেন অনেক। ভালোবাসার প্রতি তানুরাগ, বিরাগ, বিদ্রোহ—সব মিলিয়ে তাঁর কবিতাগুলি বখনো সার্থক, কখনাে শিল্পোকর্ষতায় অনুত্তীর্ণ !

স: য়ের ধারাবাহিকতায় কবিতা লেখার ক্ষেত্রে যে শৈল্পিক মুন্সিয়ানা তার কাছ থেকে আশা করা উচিত সেক্ষেত্রে তারক ভড় কিছুটা শ্লথ।

তুষার রায়চৌধুরী  (১৯৫১)

কাব্যগ্রন্থ—নৈর্ব্যক্তিক চিত্রলিপি’, ‘রাষ্টীয় পাদুকা।

তরুণ চৌধুরী (১৯৫১)

কাব্যগ্রন্থ—‘বাংলার কথা বলা পুতুল’ ।

তপন কর

তপন করের আত্মপ্রকাশের সময়টি সত্তর। আসলে কবিতার চেয়ে ছবি আঁকাতেই তার আন্তরিকতা বেশী। তাই কখনাে কখনাে কবিতাতে অনিবার্যতই এসে গেছে শিল্পের প্রতিভাস। তার কবিতার বই—‘অনুবিদ্ধ ঋতম্বর’।

দেবদাস আচার্য (১৯৪১) 

বয়সের দিক থেকে পরিণত হলেও আলােচিত সময়েরই কবি দেবদাস আচার্য। ভাইরাস’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে সতরের বহু তরুণ কবিকে তিনি অনেকদিন ধরে উৎসাহ দিয়ে গেছেন। কবিতার বই—‘কালক্রম ও প্রতিধ্বনি’, ‘মুৎশকট’, ‘মানুষের মুর্তি, ‘ফুটো জগন্নাথ’ ।

তাঁর ‘নিওরােন গুচ্ছ’ সিরিজের কবিতাগুলি  স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। নিসর্গের প্রেক্ষাপটে মানুষ, মানুষের তামাম প্রবৃত্তি, তার তৃষ্ণা, তার আকাঙ্ক্ষা এই সিরিজের কবিতার বিষয়বস্তু। এরকম কয়েকটি পঙক্তি

–‘আজ দেখি কি অপূর্ব গজিয়েছে ছত্রাক, ফার্ণ, পোকামাকড় আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গে আমি ক্রমশই সম্প্রসারিত হচ্ছি, সর্বত্রই ভাঙছি ও জন্মান্তরিত হচ্ছি। নতুন স্বাদের কবিতা রচনার জন্যে তাকে পাঠকের মনে থাকবে।

দীপ সাউ (১৯৪৬)  

দেবপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়   (১৯৪৭)

দেবকুমার গঙ্গোপাধ্যায়। (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থ –‘যুদ্ধে সন্ধুিতে’, ‘সুরভীলতা, ‘ভােজনপব”।

‘ভূমধ্যসাগর,

দীপক রায়   (১৯৪৮)

সত্তরের বাংলা কবিতার এক পরিচিত জনক দীপক রায়। তার কবিতার বই—এখানে যিনি থাকেন তিনি রাজা, শ্লেজগাড়ী। টুকরাে টুকরাে চিত্রকল্প দিয়ে কবিতার শরীর নির্মাণ করতে ভালোবাসেন।

সাবলীল ভাষার প্রবাহে গৃঢ় ব্যঞ্জনাকে মূর্ত করে তুলতে ভালােই পারেন দীপক। আর এইভাবেই তার কাছে ‘অনৈসগিক দৃশ্যপট স্থিতধী দৃশ্যে রূপান্তরিত হয়।

দ্বিজেন আচার্য   (১৩৫৫)

দ্বিজেন আচার্য এই সময়ের এক পরিচিত মুখ। সত্তরে তাঁর কোনাে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। একমাত্র কাব্যগ্রন্থ—‘নিজের মুখােমুখি’ (জানুয়ারী ৮২) তে সময়-সত্তরের সামগ্রিক ভাবনা ও বােধ পরিণত স্থিরতায় এসে দাড়াতে পেরেছে।

পরিণত মননে তাঁর কবিতার নিটোল বুনন একটি স্বর্যার বিষয়। বাণ’ ‘ফেরীঘাটে একা’, ‘একদিন—চিরদিন’, ‘নির্বাসন’, ‘না’, ‘প্রতি.তি’—এই রকম ভালাে কবিতার কয়েকটি নাম।

দীপক হালদার   (১৯৫০)

বুকের মধ্যে বারুদ জমিয়ে রেখেছেন দীপক হালদার। সার্বিক অন্ধকারের বিরুদ্ধে তার উচ্চকণ্ঠ চিৎকার, তার অন্ত ক্ষোভ। সময়ের যুপকাষ্ঠে আত্মাহুত মানুষকে জেনেছেন তার মৌল চেতনার ।

সমকালের সমাজ অনুশাসকদের প্রতি তার তীব্র ঘৃণার স্বরলিপি তির্যক ব্যঙ্গে ফাসির দড়িকে টেনে আমার শেষতম সময়ে ভুরু নাচিয়ে হাসছিলেন: কী দেখছ|অনিবার্য উপছে ওঠা থুতুর বেড়া ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল একটা পাথুরে শব্দ : মানুষ।

দেবাশিস বসু    (১৯৫২)

 বেশ কিছু উল্লেখযােগ্য কবিতা লিখে দেবাশিষ বস্তু সত্তর দশকে একটি চিহ্ন রেখে যেতে পেরেছেন। সত্তর দশকে সম্ভবতঃ তার কোনাে কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ হয়নি। পরিমার্জিত মন ও মজিতে তার কবিতা উৎকর্ষতার দিকে অগ্রণী হতে পেরেছে।

দীপঙ্কর চক্রবর্তী

শ্রেণী সচেতন কবি দীপঙ্কর চক্রবর্তী আলােচিত সময়ে গণমুখী পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। অচলায়তন সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ, তার বিদ্রোহ। গদ্যছন্দের সাবলীল প্রয়ােগে তার বক্তব্য সহজবােধ্য হয়েছে, তাব’লে শ্লোগানধর্মী হয়নি। মানুষের জন্যে তঁার দায়িত্ববােধ থেকে তিনি যথার্থ শিল্পীর মর্যাদা পাবেন। কবিতার বই—‘নেয়ামতকে বলেছিলাম।

দীপালি দে সরকার

দীপালী দে সরকারের কবিতা রচনার আত্মপ্রকাশের সময়টি সত্তর দশক। তার কবিতার বই-শকুনের প্রতীক্ষা’, ‘চলাে যাই নচিকেতার সন্ধানে’, ‘মনের দুয়ার খুলবে কেন। কবিতায় কোনাে উল্লেখযােগ্য নজির রাখতে পারেননি।

ধূর্জটি চন্দ   (১৯৪৫)

আলােচিত সময়ের এক কবিব্যক্তিত্ব ধূর্জ টি চন্দ। তার কাব্যগ্রন্থ—‘অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ (১৩৮৮), ‘মজার পদ্য ও অন্যান্য কবিতা’, ‘একলা যাবে দক্ষিণে না’ (১৩৯০)। খুবই মার্জিত বুদ্ধিদীপ্ত কবিতা লিখতে ভালোবাসেন ভূঁজ টি চন্দ।

বুদ্ধিদীপ্ত কবিতাগুলি কখনােই দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি। তার নিজস্ব একটি কণ্ঠস্বর আছে যাতে গতানুগতিকতার প্রবাহ থেকে তাকে আলাদা করে চিনে নেওয়া সম্ভব।

শিল্পের সঙ্গে তার আজন্ম সখ্যতা। শিল্প বেড়ে ওঠে ক্রমে ক্রমে শিরায় শিরায়। এই কারণেই যে কবিতা তিনি লিখেছিলেন তা আত্মিক ও আত্মমগ্ন হতে পেরেছে।

নির্মল বসাক   (১৯৩২)

অপেক্ষাকৃত পরিণত বয়সের কবি নির্মল বসাক। সতরেই তার আত্মপ্রকাশ। কবিতার বই–নৈঃশব্দ্যের অনুভব’ (সেপ্টেম্বর ৭৪), ‘সময়ে খেলনা’ (ডিসেম্বর ৭৮), ইন্দ্রাণীকে।

সৈনিকের ডায়েরী’-র যুগ্ম সম্পাদনার মাধ্যমে অভিজিৎ ঘােষের সঙ্গে সত্তরের কবিতা লেখালেখির আন্দোলনের অন্যতম সহযােদ্ধা হতে পেরেছেন। বিষাদঘনতা, নষ্টালজিয়া তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই নষ্টালজিয়া সত্তরের একটি সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য। নির্মল সেই বৃত্ত থেকে মুক্ত হতে পারেননি।

নন্দদুলাল আচার্য   (১৯৪৭)

গণমুখী পত্রপত্রিকার নিয়মিত কবি নন্দদুলাল আচার্যের কবিতা লেখালেখির প্রকৃত সময় হলাে সত্তর। শিল্পীর সুকঠিন দায়িত্ববােধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে তিনি জীবনমুখী কবিতা রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন। প্রাঞ্জল ভাষা, সাবলীল শব্দ, সহজবােধ্য সামগ্রিক আবেদন তার কবিতার আন্তরধর্ম। কবিতার বই—‘শিরীষ গাছের তিরিশ টাকা দাম’ (সেপ্টেম্বর ৭৮)।

নবারুণ ভট্টাচার্য   (১৯৪৮)

নবারুণ ভট্টাচার্য সত্তরের সেই সারির কবি যাঁরা শিল্পকে গণমুখী করতে সজাগ, সচেতন। বাংলার প্রগতিশীল পত্র পত্রিকায় তিনি বেশ কিছু সমাজমনস্ক কবিতা উপহার দিয়েছেন বিগত দশক জুড়ে। মানুষের জন্য শিল্প—এই বাস্তবাদবােধ তার কবিতায় স্পন্দিত।

তথাকথিত সভ্যতার নামে অন্ত্যজ শ্রেণীর প্রতি সমাজের অবিচার কবিতার পঙক্তিতে ভাস্বর হয়ে উঠেছে ‘চট, ফাটা টিন, বােতল, মদুর-নড়বড়ে ঠ্যাঙগুলাে/ঝাপ-গাজনের মেলায় গেল খঞ্জ এবং নুলাে/মেলায় মেলা মজা/জিভ কাটা এক মেয়ের মুখে আস্ত জিভে গজা।/এক পয়সার টিকিট কেটে দেখতে গেল তারা পাখীর মতাে মানুষ মারার কল।

নিশীথ ভড়   (১৯৫০) 

সত্তরের এক বুদ্ধিদীপ্ত কবি নিশীথ ভড় । সমকালের ছােটবড়াে অনেক পত্র পত্রিকায় তাঁর কবিতা পাঠককে অনুপ্রাণিত করেছে বিষয় ও রীতির নির্মাণ বৈচিত্রে।

তার কবিতার চরণমালা গুঢ় সংকেতের দ্যোতনা বহন করে—একটা মথ গাঁথব তােমার সিথির ওপর, একটা উড়বে/শরীর ঘিরে, অর্থ এমন বন্ধনেরও দীপ্তি আছে।

চাঁড়াল ঘােরে শ্মশানে, শ্মশান তবু চণ্ডালিনী হয় না/আমায় আগলে  রাখ, তােমার দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে দাও’। তঁার দুখানি কবিতা, —‘নিজের পায়ের শব্দ,’ ও ‘খেলার তুচ্ছে প্রতিমা।

নির্মল হালদার   (১৯৫৩)

আলোচিত সময়ের এক সুপরিচিত কবি নির্মল হালদার। নিজস্ব এক বােধ তার কবিতার শরীর ও মনে আভিজাত্য এনেছে । নির্জনতা চান নিমল, তাবলে প্রকাণ্ড একটা মাঠের মধ্যে শুধু একটা গাছ’ চান

তিনি। বলেন—“আমি সঙ্ঘ থেকে বহুদূরে এই দশকের কথা ঐ দশকের সিড়ি ভুলেনি জনতা চাই/নির্জনতা আমাকে লেখাবে। মানুষের ভিতর থেকে মানুষ, কেন দৌড়ে আসে রাগে। কবিতাগ্রন্থ‘অস্রের নীরবতা, ‘সীতা’, ‘পুরােনাে এ জীবন আমাদের নয়। নির্মলেন্দু ঘােষাল।

সত্তরের এক কনিষ্ঠ কবি নির্মলেন্দু ঘােষাল। শেষ সত্তর থেকে লেখা শুরু করেছেন। প্রথমে কবিতার বই—দেবী আসছেন’ (১৯৮৩)। দ্বিতীয় কবিতার বই –“তুমি কোন দলে’ (জানুয়ারী,৮৭)।

বাক প্রতিমা ও রূপকল্প নির্মাণে   তাঁর স্বচ্ছন্দ প্রবাহ। কবির বক্তব্য সুস্পষ্ট ও ঋজু। সমাজ ও রাজনীতির কপটতাকে চমৎকার তির্যকে আঁকতে পারেন –‘আরাে শক্ত করে ধরাে ধ্বজা, ধরাে গল্প বলা/ধরাে দাদা, গাছেরও তলার ধরাে শক্ত করে একটু এদিক হলে গােল একটু ওদিক হলে গােল | বলাে তুমি কোন দলে বলাে তুমি কার’

প্রদীপ রায়চৌধুরী   (১৯৪২)

 প্ৰদীপ রায়চৌধুরী সত্তরে কবিতায় আত্মপ্রকাশ করে বেশ কিছু কবিতা রচনা করেছেন। কবিতার বই—নিঃশব্দ শঙ্কা, ‘নিমগ্ন সংলাপ’ (১৩৮৩), তৃষ্ণায় সমপিৰ্ত শব্দ (১৯৭৮)। সমাজের নানা অনুষঙ্গ তাঁর কবিতায় সুস্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত হয়েছে।

দুঃখ তার  কবিতার একটি মুখ্য বিনয় বলে মনে হয়। দুঃখকে নিয়ে এক সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির ছাপ অভ্যস্ত পোশাকের নীচে| দুঃখের গেঞ্জিতে রয়ে গেছে অবীক্ষিত তাস।

প্রভাত কুমার দাস। (১৯৪৫)

সত্তরের এক স্বতন্ত্র মুখ প্রভাত কুমার দাস। তার কবিতা রচনার স্বকীয়তার ফসল এবং হিরন্ময় অনুভব’, এবং ‘বিষন্ন প্রবাস’ —কবিতাগ্রন্থ দুটি। আন্দোলনের নামে কোনাে যুদ্ধের আবিভাবে কবিহৃদয় অস্থির ও শঙ্কান্বিত হয়ে ওঠে।

ভাবেন এ যুদ্ধ ঠিক কিনা, এ আন্দোলন সময়ের প্রেক্ষাপটে স্থিতধী হতে পারবে কিনা। অবশেষে দীর্ঘ নিরীক্ষার পর উত্তর মেলে—‘বিশুদ্ধ মন্ত্রের ঢেউ/কণ্ঠের কলসীতে চলকে উঠে। বাস্তবকে স্বীকার করে নিতে হয়। তাই কবিকণ্ঠে উচ্চারণ—‘স্বপ্ন ভেঙে তাকে বাইরে টেনে আনােসঘে টেনে আনে। তাকে।

প্রদীপ চন্দ্র বসু। (১৯৪৭)

আলােচিত দশকের এক কবির নাম প্রদীপ চন্দ্র বসু। সত্তরে খুব বেশী দাগ কাটতে না পারলেও কিছু কিছু কবিতা সময়ের উত্তাল বুকে রেখে যায় এক মৌলিক ভূমিকা। জলের শব্দ’ কবিতায় জলের শব্দ আসলে জীবনেরই স্পন্দন, উত্তরণের স্পন্দন।

একখানা বুক তার ভিতরে লুকিয়ে আছে চক্ষ দুটি স্বাধীনচেতা/ একখান বুক তার ভিতরে দাসত্ববােধ অনেক দিনের/এখান থেকে যাত্রা শুরু জলের শব্দ[……একখানা বুক তার ভিতরেই দু’দুটি পথ/বস্তুবাদের অনৈশ্বর্য জড়িয়ে আছে। জীবনের গৃঢ় এষণা তঁার ললিত ভাষার কল্লোলে প্রবাহিত হয়েছে। প্রভাত মিশ্র। (১৯৪৭)

সত্তরের সমাজেতিহাসের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপটে কবি প্রভাত মিশ্র একটা চিহ্ন রেখে যাওয়ার জন্য চেষ্টার করেছেন। তাঁর সেই চিহ্নিত ফসল—“আমি ভালাে নেই’ (১৯৭৭)। অন্য কবিতাগ্রন্থ আটের দশকে প্রকাশিত—সে এবং কয়েকটি কবিতা (১৮৫)

প্রণব মাইতি। (১৯৪৮)

সত্তর দশকের বহু পত্র পত্রিকায় প্রণব মাইতি কবিতা লিখেছেন। কবিতাগ্রন্থ –‘স্বয়ং স্থপতি’ (অক্টোবর ’৭৪), “সৈকতে শেষ শিল্প’ (কার্তিক ১৩৮১), ‘ফুটতে পােট্রেট’(আগষ্ট’৭৭), ‘অসহ্য অধুনা’, ‘সময়ের সীমায় দাড়িয়ে। সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে একটু স্থির আশ্রয় খোঁজে মানুষ। সেই মানুষজনের একজন প্রণব। তঁার কণ্ঠে সমান আশা—মাথা নিচু করে ঘরের দুয়ার/ এখন পেরুতে হয়/তবু কিছু নয় চেয়েছি জীবন ঘরদোর প্রীতিময়… …’। কিংবা ‘সম্মিলিত দুঃখ দিনে নাও চিনে তােমার স্বজন। সে এখনাে বসে আছে পৈঠায় পা মেলিয়ে শ্যাওলার কাছে, খুব কাছে।

পুণ্যশ্লোক দাসগুপ্ত। (১৯৪৯)

কবিতা-সত্তরের এক চেনা মুখ পুণ্যশ্লোক দাসগুপ্ত। বিষয় ও রীতির দিক থেকে স্বকীয়তার স্বাদ তাঁর কবিতায় অনুভূত হয়েছে। কবিতার বই অনুরূপ পরামর্শ।

পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল। (১৯৪৯)

সত্তরের কবিতা পর্যালােচনায় পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল একটি মর্যাদা বিশেষ। কবিতা ভাবনায় সময়ের প্রশ্নটি অনিবার্যতই এসে যায়। এই বিষয়টির প্রতি পার্থপ্রতিমের অনীহা নেই ।

শৈল্পিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে লিখেছেন। শব্দের অভিনব প্রয়ােগ তাকে অনন্য সম্মান দিয়েছে। ……তবু দেখো, ঝরে ফের ফুটেই উঠেছে নবকুসুম জ্যোৎস্না বর্ণজোসিন/পিয়াপসন্দের এই ফাগুয়া পুনমে । অথবা প্রকৃত সাধু –একথা জানাতে| তবে কি হৃদয়ে তার আনন্দিত সাইপ্রাস সমস্ত বছর ? নির্বাচন করেছে সে রঙ গন্ধ মাখা মতিভ্রম/ভালােবেসে বিপরীত স্বর ? কবিতার বই–“দেবী’, ‘রাত্রি চতুর্দশী’, ‘টেবিল’, ‘দূরের সন্ধ্যা।

প্রবীর রায় (১৯৫০)

 প্রবীর রায়ের কবিতায় আত্মপ্রকাশের প্রকৃত সময়টি সত্তর। কবিতাগ্রন্থ—‘ম্যাজিক লণ্ঠন’, ‘খনিজ কবিতা’, ‘বরফ’, ‘নীল মাছিদের গান’। কালের কাছে উত্তীর্ণ এমন অনেক ভালাে কবিতা তিনি লিখেছেন।

প্রভাত মিশ্র। (১৯৫০)

প্রভাত মিশ্রকে সত্তরের কবি বলা যায়। ক্রুদ্ধ শব্দের বিন্যাসে তার কবিতার বজ্রনাদ। তাৎক্ষণিক বিষন্নতাকে স্বীকার করেন। এবং তাকে অতিক্রম করার স্পর্ধা রাখেন। কবিতার বই—‘হাওয়া রাতের কথা।

প্রশান্ত রায়। (১৯৫০)

সত্তর দশকের কবি প্রশান্ত রায় ‘মাঝি’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে সত্তরের কবিদের অনুপ্রাণিত করেছেন। সত্তর দশকের কবিতার ফসল—‘রং নাম্বার’ (মে’৭৭) ও ‘ফিরে দেখুন’ (মার্চ’৮০)। অন্য দুটি কবিতার বই-‘এই চোখে’, ‘হাত ধুয়ে ফেলেছি হওয়ায়’। সময়ের উত্তাল আবর্তে গতি ও মন্থরতা—দুটোই তাকে পেয়ে বসেছে। কখনাে বলেছেন –‘একটা ঝড়—আগুন হয়ে ছুঁড়ে দিক ভুকুটি। কখনাে বা বলেছেন–……কেউ ডাকলে—“রং নাম্বার’ বলে হেসে। গা এলিয়ে বেশ থাকা যায়, বেশ মজলিসে। ফলে তার কবিতার আবেদন স্থির প্রত্যয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

প্রফুল অধিকারী

সত্তরের কবি প্রফুল্ল অধিকারীর কবিতাগ্রন্থ—‘হৃৎপিণ্ডে শব্দের বেহালা’ (ডিসেম্বর’৭৭), নিঃসঙ্গ অশ্বারােহী। কবিতা রচনায় সাময়িক সময়ের জন্য একটু পরিচিতি অর্জন করলেও সেই পরিচিতিটুকু বেশীদিন ধরে রাখতে পারেননি।

প্রফুল্ল মিশ্র

আলােচিত সময়ের এক কবি-সংযোজন প্রফুল্ল মিশ্র। ঐ  সময়ে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—‘সিন্ধুসারস’ (সেপ্টেম্বর ৭৭)।

পীযুষ রাউত

সত্তরে ত্রিপুরায় বাংলা কবিতা লেখালেখিতে পীযুষ রাউতের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়ে গেছে। কলকাতা এবং তামাম পশ্চিমবাংলার কয়েকটি নেতৃস্থানীয় পত্রিকায় তিনি লিখেছেন। বলিষ্ঠ শব্দ চয়ন, উপমা ব্যবহারের চমৎকারিত্ব তার কবিতাকে উৎকর্ষতা দিয়েছে। শব্দের স্বচ্ছন্দ প্রবাহে তিনি গভীর, বলতে পারেন–‘আত্মার ভেতর সারাদিন রৌদ্র|সারা দিন রৌদ্র| আমি খুশীমতাে শ্যামলকে বলবাে সুবিমল। সত্তরে অনেক লিখলেও তার কোনাে কবিতাগ্রন্থ প্রকাশ পায়নি।

পার্থ বসু

সত্তরে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন পার্থ বসু। গণজীবন, গণজীবনের নানা দিক, তাদের সংগ্রাম, তাদের উত্তরণ তার কবিতার  মুল উপজীব্য। কবিতা লেখার কোনাে ধারাবাহিকতা না থাকায় তার কবিতাভাবনা বিষয়ে কোনাে স্থির সিদ্ধান্ত করা সমুচিত হবে না। আলােচিত সময়ে কয়েকটি পত্র পত্রিকায় প্রকাশ ছাড়া কোনাে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। সাম্প্রতিক কবিতাগ্রন্থ ‘ব্যাঙ প্রথামতাে জিবটিকে উলটিয়ে নেয়।

প্রশান্ত দাস

প্রশান্ত দাস কবিতা লেখালেখিতে খুব বেশী নাম করতে না পারলেও তার ভাবনাটি সৎ শিল্পীর চেতনানুসারী। প্রিয় সব কিছু কেই চিতায়’ কাব্যগ্রন্থে তার জবানবন্দী—‘অধিকাংশেরও বেশী মানুষ। প্রয়োজনের অনুপাতে কতটুকুই বা পেয়েছে ?

ভদ্রভাবে বাস করার মতাে বাড়ীতে ঘর নেই, যথেষ্ঠ পোশাক পরিচ্ছদ নেই, পরিমিত পুষ্টিকর খাদ্য নেই, মনস্তত্ত্বভিত্তিক শিক্ষা-দীক্ষা নেই, চরিত্র গঠনের সুযােগ নেই, কর্মসংস্থান নেই, উপযুক্ত উপাজন নেই, প্রচুর অবসর নেই, নারী পুরুষের পরস্পরকে জানবার স্বাধীনতা নেই।

এই বিক্ষুব্ধ পরিবেশে আত্মনিমগ্ন হয়ে বৃহত্তর জীবনসাধনা কিংবা সাহিত্য কাব্য শিল্পচর্চা কি সত্যিই করা যায় ? তােমার কি বৃদ্ধ শ্রমজজ’র বাবার যন্ত্রণার পাশে, উচ্চাশা ক্লিষ্ট অসুস্থ মায়ের স্বপ্নের পাশে, সুশিক্ষিতা অবিবাহিতা বােনের বেদনার পাশে, ভাই-ভ্রাতৃবধূর নির্ভীক সংসার সংগ্ৰামের নিষ্ঠার পাশে একবারও দাড়াতে ইচ্ছে যায় না ?

…… সুন্দর অনেক দূরের পথে পড়ে রয়েছে। অথচ আমি পশুর মতাে। এখনও বেঁচে আছি।’ প্রশান্ত মানুষের-আত্মঅবক্ষয় চিহ্নিত করেছেন– ‘মানুষের মাংসের গন্ধ , রক্তের রঙ’ কবিতায় প্রতিটি মানুষকেই কেন যেন অসংখ্যবার ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে ছুটতে ছুটতে ক্লান্তভাবেকশাইখানায় মাংসের দোকানে একট,

পাড়াতেই হয়, চুপিসারে মিলিয়ে নিতে হয় রক্তমাংসের অন্তর্গত রক্তমাংসকে/মানুষের মূল্য এমনই অস্বাভাবিক কমে যাচ্ছে যেশুধু অঙ্গ প্রত্যঙ্গই নয় তার আত্মাও হয়তো একদিন/অন্য অন্ত্যজ প্রাণীর প্রয়ােজনে লাগতে পারে। অন্য কাব্যগ্রন্থ—‘ক্রমশঃ ফসিলের মতাে একটা শব্দ।

প্রদীপ পাল। (১৯৫১)

আলােচিত সময়ের কবি প্রদীপ পাল। কবিতা রচনায় উল্লেখযোগ্য কোনো উৎকর্ষতার পরিচয় না রাখতে পারলেও ভাব ও ভাবনার দিক থেকে তাঁর কবিতার বই—‘জাহাজ কিংবা পাখি’ (মে ১৯৮১) বিশেষ একটি স্বাদ বহন করেছে।

প্রমােদ বসু, (১৯৫৩)

প্রমােদ বস্তু সত্তর দশকে কবিতায় আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর সংযমী কলম বেশ কিছু যথার্থ ও মার্জিত কবিতা উপহার দিয়েছে। লেখালেখিতে তিনি সম্ভবত কোনাে আন্দোলনের ধার ধারেননি। ফলে কবিতার মধ্যে মৌলিকতা অনিবার্যতই বর্তে গেছে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি রূপকলা, প্রতিটি ছন্দ নিয়ে তিনি বেশ ভাবেন। তারপর তার প্রয়ােগ করেন। এইভাবেই তার উৎকর্ষতা। কবিতার বই —“শব্দের ভিক্ষুক’ (১৯৮২), ‘বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা’ (১৯৮৩)।

পান্নালাল মল্লিক

শেষ সত্তরে কবিতা লেখা শুরু করেছেন পান্নালাল মল্লিক। বস্তুনিষ্ঠ কবিতা লিখতে উৎসাহী। দুর্বল মানুষের প্রতি সবলের অত্যাচার তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। সেই অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার কলম প্রতিবাদী ও সােচ্চার—এগিয়ে আসছে মানুষ। শপথ নিয়েছে ওরা, জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে/ছিনিয়ে নেবে তােমার সিংহাসনটা। এবং তুমি শেষ বিচারের জন্য প্রস্তুত হও। উত্তর সময়ে প্রকাশিত কবিতার বই—‘অসময়।

প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়  (১৯৫৬)

প্রান্তিক সত্তরে কবিতা লেখালেখিতে এসেছেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। তেমন কোনো সাড়া জাগাতে পারেননি। কবিতার বই—‘বালি ও তরমুজ। ব্রজ চট্টোপাধ্যায়। (১৯৪৩)

অপেক্ষাকৃত বয়স্ক কবি ব্রজ চট্টোপাধ্যায়কে সত্তরের কবি বলা অন্যায় হবে না। কারণ এই সময়েই তাকে কিছুটা চেনা গেছে। তবে তেমন কোনো উৎকর্ষতার পরিচয় রাখতে পারেননি।

তবু সেই সময়ের ইতিহাসকে যথাযথ করতে তার নাম উল্লেখ প্রয়ােজনীয় হয়ে ওঠে। কবিতার বই—‘মধ্যগগনে। বিপ্লব চন্দ। (১৯৪৪) | সত্তরের অশান্ত ঝোড়াে দিনের এক প্রশান্ত যৌবন বিপ্লব চন্দ। সমকালের পত্র পত্রিকায় বেশ কিছু নজর কেড়ে নেওয়া কবিতা লিখে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কবিতার বই-‘রৌদ্রের মলাট (বৈশাখ, ১৩৮৩)। বিষ্ণু সামন্ত। (১৯৪৯)

আলােচিত দশকের এক পরিচিত কবি বিষ্ণু সামন্ত। কবিতার বই—‘কোন পাপ নেই’, ‘শব্দ ভুলে যাই, ‘দুঃখ যখন অনিবার্য, ‘ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা’। সহজবােধ্য কবিতা লিখতে ভালােবাসেন। কবিতা রচনার ক্ষেত্রে এমন কিছু নতুন দিক তিনি চেনাতে পারেননি যা অনেক দিন তার কবিতাকে মনে রাখার সহায়ক।

বিপ্লব মাজী

সত্তর দশকের প্রগতিশীল কবিতাচর্চার ইতিহাসে এক সবিশেষ নাম বিপ্লব মাজী। প্রতিদিন যুদ্ধ করে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়।  কবিকেও। কবিকে সময় সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। এই দায়িত্ববোেধ বিপ্লবের আছে। সতরে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি পাঠককে আশান্বিত করে। বিছিন্নতার বিরুদ্ধে সংহতির শুভ্র পারাবতকে তিনি নীল আকাশে ছেড়ে দেন। বলেন—“আসুন, আমরা সম্মিলিত হই মহাকাশ নীল পতাকার নিচে আর সারা পৃথিবী ডানা ঝাপটাই যেন একজোড়া কপােত কপােতী মহাবিশ্বে কালান্তরের মহাবিস্ময়’……।

ব্রততী বিশ্বাস ( সিংহরায়) 

(১৯৫০) কাব্যগ্রন্থ—‘গুপ্তঘাতক নিসর্গ।

বুদ্ধদেব মুখােপাধ্যায়। (১৯৫১)

উল্লিখিত সময়ের অনুসন্ধিৎসু কবিতা পাঠকরা বুদ্ধদেব মুখোপাধ্যায়ের কবিতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। পরিমার্জিত বুদ্ধিদীপ্ত ভাষায় তিনি সমাজের অসঙ্গতিকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক দায় দায়িত্বে তিনি সচেতন এবং সচেতনতার সূত্রেই মুখর। তাই কোনো মহৎ শক্তি আকস্মিক বিছিন্নতার শিকার হলে তঁার স্মরণ যন্ত্রণায় আকুল হয়ে ওঠেন। হঠকারিতায় উন্মত্ত পৃথিবীর অশান্ত বুকে শক্ত পায়ে দাড়িয়ে বলেন—বিচ্ছিন্নতা আমাদের জন্য রেখে যায় কোন সে বাগান ? এসাে হাত ধুই, মগ্ন হয়ে বসি। কাব্যগ্রন্থ—‘আমরা ও এইসব কুকুরের।

বীতশােক ভট্টাচার্য। (১৯৫১)

কেমন কবিতা লিখেছেন সওরের বীতশােক ভট্টাচার্য সমকালের পত্রপত্রিকায় সে চিহ্ন রয়ে গেছে। যা বলতে চান-কবিতাতে তার সাবলীল রূপায়ণ । তাৰং দুর্নীতি ও বিশৃলতার বিরুদ্ধে তার কণ্ঠ সরব, স্পর্ধিত – এসো গাওয়া হোক নান্দী সদলবলে। করুক পুলিশ।

মেরে ধরে কুটি কুটি । সত্তরের পত্র পত্রিকায় ও কবিতার সকলনে অনেক লিখেছেন। নিজস্ব কোনাে কাব্যগ্রন্থ নেই।

বিজয় কুমার দত্ত।

উল্লিখিত সময়ের এক অন্য তর নাম বিজয় কুমার দত্ত। কবিতার গ্রন্থ—অরণ্য শীর্ষে গােধূলি’ । সহজ ভাবনাকে নির্দ্বিধায় তিনি প্রকাশ করতে পারেন। এক আশ্চর্য শক্তি ধরে তার শব্দ বাক প্রতিমায় সমর্পিত হয়। এক একটি প্রতীক নিজস্বতায় তন্নিষ্ঠ হয়ে ওঠে। যেন দূর পাহাড়ী পথের বাঁকে ঝর্ণার উদ্ভাস ফুলের পাপড়ির সাদা আভার বন্যায়/ একসঙ্গে মিশে গেল কবিতার বাক প্রতিমায়’—রূপকল্পের সার্থক নির্মাণে তিনি কুশলী শিল্পী।

বঙ্কিম চক্রবর্তী   (১৯৫৩)

সত্তরের অন্যতম কবি বঙ্কিম চক্রবর্তীর কবিতাগ্রন্থ—‘হাক। |দিচ্ছে নিলামবালা’, ‘নির্যাতিত জটায়ু’ (এপ্রিল ৮০), 5ণ্ডলের খড়ম’ (মার্চ ৮১)।

রামায়নের জটায়ু একটি মহত্তম সত্যকে পৌছে দেবার মহাদায়িত্বে নেমে নিজেকে ভেঙ্গে চুরে তচনচ করে দিয়ে রক্তাক্ত ও যন্ত্রনাত হয়েছিল। বঙ্কিম ও তার কবিতাও তা-ই। ব্যক্তিগত দুঃখের স্বরলিপি কবিতার প্রসাদগুণে ব্যষ্ঠিবােধে পল্লবিত হয়েছে।

সত্তরের মানুষ, মানুষের জটিল অবত, তার দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, চেতনা, সংগ্রাম কবির আত্মােপলব্ধিতে দানা বেঁধে এক স্থির সত্যে এসে পৌঁছেছে। ‘সত্তরের মত্যু’ কবিতায় সময়ের সঙ্গে আত্মলীন কবির মনে বেদনার রাগ ও রাগিনী—“সারারাত তােমার কাছাকাছি শুয়েছিলাম।

বাইরে নওল কিশাের জ্যোৎস্নায় জামা পাল্টালে এক এক করে কাঁধের। ব্যাগ, খদ্দর, চায়ের অজস্র ভাড়। ……এসব যন্ত্রণা নিয়ে তুমি চলে যাচ্ছে। শূন্য ঘর। তার চতুর্থ কবিতার বই—‘মৃত্যুহীন দিন’ সম্প্রতি (১৯৮৭) প্রকাশিত হয়েছে।

বিজয় মাখাল (১৯৫৪)

বিজয় মাখাল সত্তর দশকের কবি মিছিলে এক স্বতন্ত্র ঔজ্জ্বল্য। তার কবিতার মধ্যে একটি শৈল্পিক প্রজ্ঞার ছাপ অন্তরকে নাড়া দেয়। কবিতার বহুপ্রসূ জনক তিনি নন। তবে শিল্প-সন্তানের যােগ্য পরিচর্যায় তঁার দায়িত্ব কম নয়। আজ দেবার মতন কিছু নেই– কোনােদিন ছিলও কি কিছু ! যারা ছিল চারপাশে। তারা আজ বিকেলে শেষে বসন্তের কাছে বেড়াতে গিয়েছে’– জাতীয় মার্জিত পঙক্তিগুলি বিজয়ের কবিনৈপুণ্যকে চিনিয়ে দেয়। কবিতার বই —“তুমি নও, তােমার প্রতিমা’, ‘জল পাথরের গায়ে।

ব্রত চক্রবর্তী    (১৯৫৫)

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় (১৯৭৬) থেকে লিখতে শুরু করেছেন ব্রত চক্রবর্তী। তার বেশীরভাগ কবিতার মধ্যে স্থান পেয়েছে অবক্ষয়প্রসূত ব্যঙ্গ।

বেঁচে থাকতে রুটির অভাবে যে মানুষেরা মৃত্যুতে নিশ্চিহ্ন হয়, মৃত্যুর পরে তারা পায় রুটির চেয়ে মূল্যবান পুরস্কার। মরণােত্তর এই পুরস্কারকে নিয়ে ব্রত-র অন্তদ্রোহ :-‘ভাঙা চোরা বিধ্বস্ত মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতার বেদনায় আমৃত্যু প্রত্যহ মরেছে।

তবু এই মুহূর্তের ফুল, ধূপ, শােক ও সমবেদনায় যেন|সে কেমন। খুশী, তৃপ্ত, সুখী ও সার্থক।’ (সবাই যেভাবে যায়’)। দুঃখের ছবি, সুখের ছবি—আমরা প্রত্যেকেই জীবনের দুটি পিঠ পাই, পেয়ে যাই, স্মৃতি করে রাখি। এই আমাদের বেঁচে থাকার শ্রেষ্ঠতম সংগ্রাম।

ব্ৰতর বেশ কিছু কবিতায় এই মর্মটি উচ্চারিত। সহজ ভাষায় কঠিন বক্তব্যকে হৃদয়ে চুঁইয়ে দেন ব্রত। এক ধরণের নৈরাশ্যবােধ, অস্থিরতা ও দ্বিধায় তাঁর কবিতা আচ্ছন্ন কিন্তু শিল্পময়।

নিজের কবিতা নিয়ে ভাবতে গিয়ে লিখেছেন—“টানা গদ্যে এবং প্রচলিত সহজ শব্দগুলাের সাহায্যেই আমি লিখতে ভালােবাসি। প্রথম কয়েকটা লাইন মনে মনেই তৈরী হয়, তখন শনি শহরের রাস্তায় কিংবা কোনাে বাড়ীতে কিংবা কোনো ভীড়  চা-বর।

কখনও এমন হয়েছে পুরাে কবিতাটিই তৈরী হয়েছে মনে মনে এবং এর কাছ থেকে Dictation নেবার ভঙ্গীতে কাগজে লিখেছি। লেখাটা অনেকটা Sit and draw পদ্ধতিতে। এবং এ কারণে আমার প্রায় লেখাই কণ্ঠস্থ। দুটি কবিতার বই—গাজনের মেশা’ (১৯৭৯) ও জীবন দেখায়’ (১৯৮২)।

ব্রততী ঘােষ রায়

কাব্যগ্রন্থ—‘স্বর্ণলতা ছিড়ে খাক’ (নভেম্বর’ ৮০)।

বিদ্যুৎ ভৌমিক

সওর দশকের শেষ পর্যায়ে লেখা শুরু করেছেন বিদ্যুৎ ভৌমিক। কবিতার বই—“দর্পণে প্রতিবিম্বে স্বরাগম। ভাব ও বিষয়ের দিক থেকে পরিচ্ছন্ন ও শ্রীময় তার কবিতা।

ভট্টাচার্য চন্দন   (১৯৪৪)

ভট্টাচার্য চন্দনের সত্তরে প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ—সরল কর : ভালােবাসা (সেপ্টেম্বর ৭৪), ‘পরিমণ্ডল’ (সেপ্টেম্বর ৭৫), ‘ব্যাবিলনের শূন্য বাগানে। তাঁর ‘কবিসেনা’ কবিতায় নতুন আঙ্গিক আন্দোলনের মুখপত্র। প্রেম, ভালবাসা, আবেগ সর্বস্বতা ইত্যাদিতে ‘কবিসেনা’-র কবিগোষ্ঠীর মােহ নেই।

জীবনটা তাদের কাছে যন্ত্র, বিজ্ঞান সর্বস্ব। নারীও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রবিশেষ। কবিতার প্রচলিত আঙ্গিককেও তারা বর্জন করেন। কবিতার কায়া নির্মাণে নতুন জ্যামিতিক ভাবনায় তাঁরা আপ্লুত। সত্তরে তারা কিছুটা চমক সৃষ্টি করলেও ইদানীং মনে হয় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।

মোহিনী মোহন গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৪০)

মােহিনী মােহন গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের কবিতার পাতায় এক সমধিক পরিচিত নাম।

সমগ্র বাংলা থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকার অধিকাংশতেই তঁার কবিতা দেখা যায়। বহু লিখেছেন। সুতরাং কবিতার মধ্যে বিষয় ও রীতি বিষয়ক পুনরাবৃতি, একঘেয়েমী শব্দ ও রূপকল্প পাঠকহৃদয়কে ভারাক্রান্ত করা অসম্ভব নয়।

তবু তার দীর্ঘ ও বিস্তৃত কর্ষণে ভাল ফসল যে রােপিত হয়নি এমন নয়। সত্তর দশকে ‘কেতকী’ পত্রিকা সম্পাদনার সাথে সাথে কবিতা আন্দোলনের অন্যতম সহযােদ্ধা ও সহকর্মী হতে পেরেছেন। তাঁর কবিতার বই—নক্ষত্রপুরুষ’ (ডিসেম্বর ৭৯)।

প্রতিবাদী সময়ের। মুখ’, ‘অবাক পৃথিবী, ‘রাত্রির গভীর বৃন্ত থেকে’, ‘বুকের গােপনে অস্ত্রগুলি’, ‘জ্যোৎস্নার নাবিক’, ‘অর্জনের চোখ’, ‘বিষপাথর।

মনোজ নন্দী (১৯৪৭)

 নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন সত্তরের মনােজ নন্দী। তেমন কোনাে বিশেষ চিহ্ন কবিতায় রেখে যেতে পারেননি। তবু তঁার স্বচ্ছন্দ গতিময়তা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তার এক কবিতার পঙক্তি —“যে আছে নিজের শক্ত মাটিতে দাড়িয়ে তুমি তার হাত ধরাে নির্ভয়ে সে তােমাকে জীবন দেখাবে। এই আশাব্যঞ্জক ভাষণ দায়বদ্ধ কবির বােধ থেকে স্বতােৎসারিত হয়েছে। কাব্যগ্রন্থ—“মনােজ নন্দীর কবিতা’ ।

মিলনেন্দু জানা (১৯৫২)

সত্তর দশকের এক স্বল্প পরিচিত কবি মিলনেন্দু জানা। অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর আপোসহীন লড়াই। তার নিজের কথা —“শাসন-শোষণের অত্যাচার-অবিচার পীড়ন-বঞ্চনা যেখানে এই জীবনকে স্তব্ধ করে দিতে চায় অন্ধকারের গর্ভে সেখানেই জাগ্রত

রাখি আমার বিবেক –সন্মুক্ত করি আমার কলম। কবিতার বই – ‘অন্যমাটি : অন্যচোখ’, ‘বাংলা আমার দুঃখ আমার। মনােরঞ্জন খাড়া। কাব্যগ্রন্থ ‘বালক ও নেবু ফুলের গন্ধ। মলয় সিংহ। (১৯৫৪)

আলােচিত সময়ের এক সুপরিচিত কবি মলয় সিংহ। কবিতার বই—“মীরাকে আমার শেষ চিঠি । প্রেম, ভালােবাসা, বিপ্লব—সব নিয়ে এই সমাজ। এইসবের প্রেক্ষিতেই তার কলম ধর’, দাড়িয়ে থাকা। হৃদয়ের রক্ত আখরে তিনি পরিশুদ্ধ এক জীবনের কথা লিখতে চান। বলেন—‘চিমটে দিয়ে আঙার খেচাও হৃদয় তােলে। আবার/কখনশােণিত/দিয়ে হৃদয় ছিড়ে বাসন মাজো, আনন্দ পাও ? বন্দী কোরে রাখলে কেন ? দোর খুলে দাও। ভাব ও ভাবনার দিক থেকে তিনি যেমন স্পষ্ট, কবিতার শরীর নির্মাণে ও তার সমান কুশলতা ।

মৃদুল দাশগুপ্ত (১৯৫৫)

মৃদুল দাশগুপ্ত সত্তরের এক সমধিক পরিচিত নাম। যুগের সংশয় অবক্ষয়, নৈরাশ্য তাঁর কবিতায় শিল্পিত হয়েছে। তিনি বলেন –“কোনাে দৃশ্য কতোক্ষণ সহ্য করা যায় ? দুচোখ জ্ব’লায় জুড়ে বন্ধু, যতােক্ষণে অন্ধ হয়ে যাই, যন্ত্রণায় বিকল যন্ত্র, ছিড়ে যায় স্নায়ু, আমার ভেতরে আছে আমার স্বদেশ, ঘােলাটে সমাজতন্ত্র। স্বদেশের প্রতি কোনো মােহমুগ্ধতা নেই মৃদুলের। ঘােলাটে সমাজতন্ত্র তার স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে ভরিয়ে দেয়। বিকৃত সমাজতন্ত্রের যন্ত্রণাকাতর দৃশ্য তার সহ্যাতীত। পরিমিত শব্দ চয়ন, উপমার তারল্যে বক্তব্যের গভীরে মৃদুলের সাবলীল হাঁটা। কবিতাগ্রন্থ—‘ভুলি নাই’, ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’ (এপিল, ৭০), এভাবে কাঁদে না।

রথীন সেনগুপ্ত   (১৯৭২) 

সত্তরের এক মনােযােগী কবি রথীন সেনগুপ্ত। সমাজ ও সময়মনস্ক সাযুজ্য ভাবনা তার কবিতার মূল প্রেরণা। তার সমাজমনস্কতা এক রােমান্টিক মগ্নতায় নতুনতর স্বাদ বহন করে। অভিমান ও দুঃখে মগ্ন কবি, তবে আচ্ছন্ন নন। জাগরী সত্তা তাকে সর্বদাই স্পন্দিত করে তােলে। চিত্রকল্পের ব্যবহার প্রশংসনীয়। ‘সাদা মাছ ঘুরে ফিরে কেটে কেটে বসে যায় জলের শরীরে’, কিংবা ‘লঘু হরিণের পায়ে অসম্ভব দ্রুত সরে যায় চলমান ছবি’ – জাতীয় পঙক্তিগুলি বাক প্রতিমায় মূর্ত হয়ে এক শুদ্ধ শিল্পের জন্ম দেয়। সত্তরের পত্র পত্রিকায় তাঁর কবিতাগুলিই তঁার কবিসত্তার প্রকৃত উন্মােচন। কবিতার বই—‘প্রিয়তম সুখ দুঃখ।

রাখাল বিশ্বাস (১৯৪২)

সত্তর দশকে আত্মপ্রকাশ করা এক প্রতিষ্ঠিত কবি রাখাল বিশ্বাস। উল্লিখিত সময়ের পত্র পত্রিকায় তাঁর কবিতা পাঠককে উৎসাহী করে তােলে। সময় এবং তার পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে বেশ চিন্তা করেন। তিনি ।

পরিমার্জিত শব্দের সংযমী প্রয়ােগে শব্দ, ভাষা, চিত্রকল্প একটি সেতুতে এসে কবিতা প্রতিমার রূপ পায়। সংকট, সংশয়, নৈরাশ্য ভেঙ্গে একটি উত্তরণ তাকে পেয়ে বসে।

তিনি স্থিতধী হন জীবন ঘনিষ্ঠ শিল্পের সমীপে। দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো বেশ কিছু কবিতা লিখে তিনি পরিচিতি হয়েছেন, শিল্পের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার কবিতার বই—সেই ভালােবাসা চাই।

রমা ঘােষ   (১৯৪৪)

সত্তরে বেশ কিছু কবিতা লিখে চমক সৃষ্টি করেছেন রমা ঘােষ। পৃথিবী জুড়ে সংকট ও দুঃস্বপ্ন। হাওয়ায় হাওয়ায় আজ ছিড়ে খায় পৃথিবীর মাটি ঘাস বাড়ি,/ মানুষেরা ছন্নছাড়া, পাখিরাও হারিয়েছে  বাসা।

এখন কোথায় যাবাে, এতাে রাতে কে দেবে নরম রুটিকে দেবে পানীয় ! কারাে নাম মনে পড়ছে না। তবু স্মৃতিচারণার প্রয়ােজন হয়। বিবর্ণ স্মৃতিই চিনিয়ে দেবে আগামীর পথ। রমার রক্তে তার দ্রোহ। দায়িত্ব সচেতন তার কবিসত্তা। কবিতার বই —“ত্যক্ত গ্রহ’, ‘মহারাজ, আমি সমুদ্রের জলে ডুব দিয়ে।

রােকেয়া চৌধুরী।

রােকেয়া চৌধুরীর কবিতায় আত্মপ্রকাশের প্রকৃত সময়টি সত্তর দশক। বুদ্ধিদীপ্ত পরিচ্ছন্ন কবিতা লেখায় তিনি সিদ্ধহস্ত। তার মতে—শিল্প বলেই গভীরতর কথা/শিল্প বলেই গান … তার সাধনা মাটি ও শিকড় উংসে জীবিতকাল। এই অনুধ্যানেই তাঁর কবিতা শ্রী ও সুন্দর হয়। ভীষণভাবে চিনেছেন দেশ,কাল, পরিবেশ। ‘অন্ধকার ভীষণ নিশ্চপ/নষ্টযুগ ছাড়িয়ে এই অবক্ষয়। তারই মধ্যে প্রাণের স্পন্দন। আকাক্ষার রাগ ও রাগিনী –‘কতক্ষণে জ্বলে উঠবে অন্ধকারে কুড়ির আশ্বাস ? তার কবিতা পাঠককে প্রাণিত করে।

রণজিৎ দাশ   (১৯৫০)

সত্তরের রণজিৎ দাশের দুটি কবিতার বই—‘আমাদের লাজুক কবিতা’, ‘জিপসীদের তাবু’। কবিতা নিয়ে তার নিজস্ব একটি চিন্তা-ভাবনা আছে। তীর্যক ভঙ্গিতে সমাজের অসংগতিকে আঁকতে আগ্রহী।

রতনতনু ঘাটী  (১৩৫৯)

রতনতনু ঘাটী সত্তরের এক অধিক পরিচিত কবি। আলােচিত দশকে তার কোনাে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু সমগ্র দশক জুড়ে তার উজ্জ্বল উপস্থিতি পাঠকের চেতনায় একটি দীর্ঘস্থায়ী চিহ্ন রেখে যায়। সময়ের যন্ত্রণা রতনতনুর নিজেরও যন্ত্রণা।

এই যন্ত্রণা  দীর্ণ কণ্টকিত পথ থেকে পা তুলে কীভাবে হাঁটবেন রতন। পারেন না, পারা যায় না। ক্ষয়িত সমাজের স্বেদ, রক্ত, পাপ ও পুণ্য তার নখদপণে। দুঃখ থেকে দুঃখ মুক্তির প্রার্থনা তঁার কণ্ঠে সংগত ও স্বাভাবিক। রতন বলেন—এখন আমার হৃদয়ে কোন ক্ষত নেই।

ছােট ছোট দুঃখগুলো লতায় পাতায় আজাপুস্পবতী তুমি।’ নির্মল প্রসন্নতাই তাঁর কবিতায় বড়াে। তবে কখনাে কখনো সময়ের অনিবার্য অস্থিরতা, নিরুচ্চারিত অবসাদ বেদনাখঞ্জ অন্ধকারের মতো গুমরে ওঠে ।

লক্ষ্মীকান্ত ভট্টাচার্য

এই সময়ের অন্যতম কবি লক্ষ্মীকান্ত ভট্টাচার্য। একমাত্র কবিতার বই—‘নাবিক, তুমি গান গাও সমুদ্রের গান’ (আগষ্ট, ১৯৮৩)। এই গ্রন্থের বেশ কিছু কবিতা শেষ সত্তরে লেখা। সমকালের নৈরাশ্য, হতাশা কাটিয়ে এক সমাজতান্ত্রিক চিন্তা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাই উচ্চারণও উচ্চকণ্ঠ ও স্বতঃস্ফূর্ত হয়—“দিন আমাদের। সহজ সাবলীল কবিতাও বক্তব্যের গভীরতায় উত্তরিত হতে পারে। তার কবিতা সহজ, কিন্তু সবক্ষেত্রে তা গভীরতায় পেঁৗছুতে পারেনি।

শিবাজী গুপ্ত৷ (১৯৪৫)

কাব্যগ্রন্থ—এই ফুলবাগান।

শ্যামা দে   (১৯৪৬)

সত্তরে শ্যামা দে কবিতা লেখালেখিতে একটা আন্দোলন শুরু করেছিলেন। প্রবাহ’ পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রবাহ সাহিত্য মেলার মাধ্যমে তিনি সমকালীন তরুণ কবিদের একটা প্লাটফর্ম তৈরী করে গেছেন। দুটি কবিতার বই ‘সবুজের বন্দী’ (এপিল,৭৩) ও হাওয়া গাড়িতে বিকেল’। কবিতায় কোনো নিজস্বতা রাখতে পারেননি।

শুভ মুখােপাধ্যায়   (১৯৪৭)

কবিতাগ্রন্থ—প্রতিদিন প্রতি রাত্রিবেলা। বইটিতে সুস্পষ্টরূপে প্রকাশমান।

সময়ের ছাপ এই

শঙ্কর চক্রবর্তী   (১৯৪৮)

‘এক আকাশে’ (১৯৭৫) কবিতাগ্রন্থ দিয়ে সত্তরের সমাজমনস্ক কবি শঙ্কর চক্রবর্তীকে চিনে নেওয়া যায়। সত্তরের সমাজ-অর্থনীতিক পটভূমিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্থিরতা, অগ্রগমন ও অধােগতি, প্রেম ও প্রেমহীনতা ইত্যাদি চালচিত্র শঙ্করের কলমে বাষ্ময় হয়ে উঠেছে। আটের দশকের প্রথম দিকে প্রকাশিত এ অস্থির জাগরণে’– কাব্যে তারই ধারাবাহিকতা। শিল্পের শর্তকে বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন না করে। কবিতায় সমাজমনস্কতার দারুণ প্রতিভাস তিনি চিত্রিত করেছেন।

শম্ভু রক্ষিত    (১৯৪৮)

শম্ভ রক্ষিতকে সাম্প্রতিক কবি সমালােচকরা ষাটের কবি বলেন। তার প্রথম কবিতার বই ষাটে প্রকাশিত—“সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ’ (১৯৬৫)। কিন্তু তার বেশীর ভাগ কবিতার প্রেরণা সত্তর দশকের ঝক্বাক্ষুব্ধ সময়টি থেকে এসেছে। তার কবিতায় বক্তব্য অপেক্ষাকৃত দুর্বোধ্য।

এই দুর্বোধ্যতা আরােপিত বলে মনে হয়। সমকালীন অবক্ষয় তাকে পেয়ে বসেছে। অভিমানী কবিহৃদয়ের উচ্চারিত বেদনা—“তােমার বাঁকা পৃথিবীতে এসে সােজা হয়ে শেষ পর্যন্ত ঘঁটাও শেখা হল না আমার।

তার প্লাবিত অন্তক্ষোভ সংযমী শিল্পের শাসনে অনুশীলিত হয়ে অনেক ভালো কবিতার জন্ম হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ হননি এমন নয়। ঐ সময়ে যারা হাংরী ও শাস্ত্রবিরােধী আন্দোলনের সঙ্গে মেতেছিলেন শম্ভু তাদের অন্যতম।

অন্যান্য কবিতার বই—“প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না, ‘রাজনীতি’ (বৈশাখ ১৩৮৩), ‘পাঠক, অক্ষরগুলি’, ‘সঙ্গহীন যাত্রা। অন্যান্যদের নিয়ে সংকলন ‘সমসূত্র’, ‘বিদ্রোহ জন্ম নেয়’, ‘উত্তর। দক্ষিণ ।

শ্যামলকান্তি দাস   (১৯৫১)

সত্তর দশকের পত্র পত্রিকায় যাঁর অক্লান্ত লেখনী, এদেশের তরুণ কবিমহলে যাঁর অনন্য পরিচিতি তিনি শ্যামলকান্তি দাশ। সত্তর শুধুমাত্র বিদ্রোহের দশক, বিক্ষোভের দশক নয়।

বাংলা কবিতার রীতির বৈচিত্র্য সাধনে আলােচিত সময়ের একটি গুরুত্ব কাছে। শ্যামলকান্তি এই চিন্তাটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন। গ্রামীণ চিত্রকল্প, অপ্রচলিত উপমা, তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা তার।

অভিজ্ঞতার নির্যাসে নিগূঢ় হতে পেরেছে, সাধারণ হয়ে উঠেছে অসাধারণ। সময়ের আর্তি মেখে শ্যামলকান্তির উচ্চারণ—‘অন্ধকার চাই বলেই কি সারা সকাল হাটু মুড়ে বসে আছি পাচার কাছে, ভূতের কাছে লিখে দিচ্ছি দাসখত আর বাদুরের কাছে ছড়িয়ে দিতে হচ্ছে রক্ত ?

তিন টুকরাে অন্ধকার এবং এক এক টুকরাে মানুষ —এই চার টুকরাে গল্পের জন্যই কি আমার এমন আর্তনাদ। সম্ভবত কোনাে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়নি। সত্তরের ও উত্তরসময়ের। কয়েকটি কবিতা সংকলনে তার যোগ্য স্থান নির্ণীত হয়েছে।

শ্রী কান্ত পাল

সত্তরে কবিতায় আত্মপ্রকাশ করেন। দুটি কবিতার বই‘জন্মভিটার উপর দিয়ে ফিরছি’ (জানুয়ারী’৮১) ও ‘নতুন করে শুরু (১৩৮১)।

শিখা সামন্ত (১৯৫১)।

কবিতায় শিখা সামন্তর আত্মপ্রকাশের প্রধান সময়টি ছিলাে সত্তর দশক। ম্যাগাজিনের পাতায় সে-সময় তাঁর কবিতার বিষয় ও রীতি ভাবনা পাঠককে প্রাণিত করতো। অভিজ্ঞতা থেকে ভাষা ও চিত্রকল্পের প্রয়ােগ তার কবিতাকে বস্তুনিষ্ঠ করে তুলেছে।

শুচিস্মিতা দাশগুপ্ত    (১৯৫২)

সত্তরের কবিতার এক বিশেষ চমক শুচিস্মিতা দাশগুপ্ত। সমকালে লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় তাঁর কবিতার যােগ্য মর্যাদা ছিল। জীবনের সঙ্গে গভীরতর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক স্থাণিত হয়েছে তার কবিতায়। শব্দ চয়নে ও চিত্রকল্পে এক অভিব্যক্তির ছাপ প্রশংসার। পরিচায়ক। সত্তরকে বিদায় দেওয়ার এক ভাবঘন মুহূর্ত তার পঙক্তিতে মূর্ত হয়ে ওঠে—‘ওড়াে, উড়ে যাও জীর্ণ দশক, খিলানের পাশে,/রেখে যাও এক হাজার পায়রা, সােনালী চিবুক.•••••’। কবিতাগ্রন্থ—-চতুর্থজন’ (১৯৮৪)।

শান্ত রায়

(১৯৫৪) কাব্যগ্রন্থ –‘সন্ধের লােকাল ট্রেন’, ‘এই লেখাগুলি।

শৌনক লাহিড়ী   (১৯৫৮)

সত্তরের কনিষ্ঠ কবি শৌনক লাহিড়ী। প্রান্তিক সত্তরে কবিতায় তাঁর আত্মপ্রকাশ । সুতরাং মূল্যায়ণের জন্য সময় সাপেক্ষের প্রশ্নটি এসে যায়। কবিতার মধ্যে নিজস্ব একটা মর্জি লক্ষণীয়। ‘গর্জন সত্তর’, ‘সত্তরের কবিতা ইত্যাদি সংকলনে তার কবিতা নিজ গুণেই স্থান পেয়েছে।

সত্যাদেশ আচার্য   (১৯৪৪).

সত্তরের বয়স্ক কবি সত্যাদেশ আচার্য। কবিতায় বস্তুচেতনার অধিক অনুপ্রবেশ তার বৈশিষ্ট্য। ফুল, পাখি, ঈশ্বর ও নিঃসঙ্গতা নয়, দীনমজুর মানুষের আগামী উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিত তার কবিতায়

স্পষ্ট। শিল্পগত দিক থেকে বেশ কিছু ত্রুটিতে তিনি শ্লথ। কবিতার বই—এখানেই শেষ নয়।

সােমনাথ মুখােপাধ্যায়  (১৯৪৪)

সময়ের অবক্ষয়, হতাশা, নৈরাশ্য সত্তরের কবি সোমনাথ মুখােপাধ্যায়ের কবিতার প্রাণবস্তু। আলােচিত দশকের লিটল ম্যাগাজিনে তার বেশ কিছু সমাজমনস্ক কবিতা তাকে চিনিয়ে দেয়। সমাজের যে:কান অসংগতিকে তির্যক ভঙ্গিতে তিনি দেখেন, দেখতে ভালোবাসেন।

উপমা চিত্রণে তার বাস্তবঘন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক পঙক্তি –‘মেঘের কুমির খায় চঁদ, ঢেকে যায় স্নিগ্ধ আলাে/…… কুমিরের সঁতের আড়ালে চঁাদ ছটপট করে।

সত্তরে এবং উত্তর সময়েও সম্ভবত সোেমনাথের কোন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক কবিতার দুএকটি সংকলনে তাঁর কবিতার যােগ্য স্থান হয়েছে।

সুশীল পাঁজা   (১৯৪৬) 

সুশীল পাঁজা সত্তর দশকের ভাবনাকে আশির প্রথমে একটা চমক লাগাবার চেষ্টা করেছিলেন প্রেসিডেন্সী জেলে রক্তাক্ত দেহে অনির্বাণ’ (ডিসেম্বর’৮০)—কাব্যগ্রন্থখানি প্রকাশ করে। সত্তরের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন গণআন্দোলন, বিশেষ করে নকশাল আন্দোলনের প্রতি সুশীলের সম্ভবত একটি মােহমুগ্ধতা ছিল।

সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা তঁার কবিসত্তায় জাগরী ছিল। সময়ের উত্তেজনাকে শিল্পের ক্যানভাসে ধরতে চেষ্টা করেছেন— ‘উনসত্তরের কোন এক ঘুমন্ত রাতে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যায় এক ডজন সশস্ত্র পুলিশ।

সরকারী রিপাের্টে—তিনজন কন্সটেবল একজন জোতদার/এবং দুজন স্থানীয় ব্যবসায়ীর নির্মম হত্যাকারী/ অনির্বাণ । রিপাের্টাজকে শিল্প করতে গিয়ে তার ব্যর্থতা অনেকাংশে প্রকট হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ কবিতাগুলি ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছে, গভীরতা দেয়নি।

সুব্রত রুদ্র   (১৯৪৭)

সত্তর দশকের প্রথম সারির কবি সুব্রত রুদ্র। কয়েকটি কবিতার বই—“ঈশ্বরের জন্ম’, ‘গাঢ়তম ছায়া’, ‘বেঁচে থাকবে কেন, ‘স্তব্ধতার পড়াশুনাে’, ‘যমপুরীতে কবিতা। শম্ভ রক্ষিতের সঙ্গে কবিতা সংকলন—“সুব্রত রুদ্র শম্ভু রক্ষিত। নিটোল শব্দের বুননে, ভাবনার চমৎকারিত্বে তার কবিতাগুলি সমৃদ্ধ।

সুমর জোয়ারদার

সত্তরের সুমর জোয়ারদার কবিতায় গণতান্ত্রিক চেতনাকে প্রকাশ করতে আগ্রহী। মানুষের জন্য শিল্প, মানুষের জন্য কবিতা —এই বােধ তঁাকে অক্লান্ত করে তােলে। পরিশ্রমী মেধায় তিনি বেশ কিছু সৎ কবিতার জনক হতে পেরেছেন।

সুভাষ ঘােষাল    (১৯৪৮)

কাব্যগ্রন্থ—‘পৃথিবী তাে তেইশ বছর’, ‘লীনার বিমান’, ‘দেহকেই ফিরে পাওয়া।

সৈয়দ কওসর জামাল    (১৯৫০)

কাব্যগ্রন্থ—‘নষ্ট অরণ্যে ইউক্যালিপটাস’, ‘অন্য এক উপত্যকা।

সমীর দে

কাব্যগ্রন্থ –‘অস্তিত্ব মুখর।

সমরেন্দ্র দাস   (১৯৫১)

নিজস্ব কবিগুণে সমৃদ্ধ সমরেন্দ্র দাস সত্তরের এক উল্লেখযােগ্য সংযােজন। জীবন ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে শিল্পময়তার এক অভেদ সূত্রে তার কবিতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা। শব্দ ও ছন্দসচেতনতা তঁার সাফল্যের পরিপূরক হতে পেরেছে। বিষয় ও রীতি উভয় দিক থেকেই তিনি সজাগ। কবিতার বই –‘জলটুঙ্গি’ শিল্পভাবনার নানা দিক থেকে তাৎপর্যময়।

সন্তোষ মাজী

আলোচিত সময়ের লিটল ম্যাগাজিনে সন্তোষ মাজী বেশ কিছু সংখ্যক কবিতা লিখে সত্তরের কবিতা লেখালেখি আন্দোলনের একজন সহযােগী হতে পেরেছেন। দায়বদ্ধ কবি উত্তরণ চাইবেন— এটাই প্রত্যাশিত। সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছেন সন্তোষ মাজী। তাঁর কলমে সেই চিহ্ন–‘চলে এসাে চলে এসো কুশল, ন্যুজ বর্তমান দুমড়ে মুচড়ে দাও| অপ্রাকৃত পরিবেশে প্রতীক হয়ে থেকো না।।

সুরজিৎ ঘােষ  (১৯৫০)

সত্তর দশকের এক তরুণ কবি সুরজিৎ ঘোষ। সময়ের অস্থির প্রেক্ষণিকায় তিনি যােগ্য কুশীলবের মতাে শৈল্পিক দায়িত্ব পালন করেছেন। বেদনায় যত না ক্ষুব্ধ তিনি তারো বেশী অভিমানহত। তার নিজস্বতা এখানেই। কবিতার বই—‘নিষ্ঠুর কাচ’, আজ ভালাে থাকো।

সুভাষ গঙ্গোপাধ্যায়   (১৯৫১)

সুভাষ গঙ্গোপাধ্যায় সত্তরের কবিদের একজন, নিজ শিল্পোচিত কারণে অনন্য। সত্তরের রূঢ় বস্তুনিষ্ঠ কবিতার সাথে সাথে যারা রোমান্টিক প্রেমের কবিতা লিখেছেন সুভাষ তাদের একজন।

এই সময়ের প্রেমের কবিতা সময়ের প্রভাবকে স্বীকার করে নেয় বলেই তা অলীক নয়, বরং অভিজ্ঞতার নির্যাসে সঞ্জীবিত। ব্যক্তি প্রেম উত্তরিত হয়েছে স্বদেশ প্রেমে। কবিতার বই—‘রােদ উঠছে চলাে যাই’ (জানু’৮১), “জয়ে নেই অন্বেষণে আছি।

সমর বন্দ্যোপাধ্যায়   (১৯৪৮)

সত্তরের এক স্বল্প পরিচিত কবি। সত্তরের সমাজভাবনা চিহ্নিত ফসল ‘মধ্যে যুদ্ধ’ কবিতা গ্রন্থের দর্পণে তাঁকে দেখা যায়, চেনা যায়। স্বপন নন্দী। (১৯৫২) কাব্যগ্রন্থ—“অম্লান শিখা’ (জ্যৈষ্ঠ, ১৩৮০), সক্রেটিসের পেয়ালা’ (এপিল,৮৪), মঞ্জুল সময়ের প্রার্থনা’ (অক্টোবর, ৮৫)।

ঢােমক দাস   (১৯৫৩)

সত্তরের এক কবিযৌবন সোমক দাস। নিঃসন্দেহে প্রচারবিমুখ এই কবির কবিতা শিল্প কুশলতায় উত্তীর্ণ হওয়ার স্পর্ধা রাখে। সাবলীল গল্পের ছলে জীবনের নিগুঢ় তত্ত্ব তিনি অনায়াসে প্রকাশ করতে পারেন। সমাজ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের অসংগতির বিরুদ্ধে তার তির্যকময় প্রতিবাদী কণ্ঠ।

পুলিশ সম্পৰ্কীয় তার ভাবনা—“বড়াে উকিলের মতাে কোর্ট ঘরে তােমার আত্মা/শুধু ঠোট নাড়ে। তােমার এখন মাঝ দরিয়ায় ফুটো নৌকাতে/জলসেচ করা খুব দরকার। অবক্ষয় এবং উত্তরণ—দুইই আছে তার কবিতায়।

মানুষরে কাছে ত্রাস’ আবার মানুষের কাছে পরিত্রাণ’। এই ভাবনাতেই সােমকের কবিতার উৎকর্ষ। কবিতার বই—“নিরাপদ দূরত্বে থাকুন, ঘন শ্যামবাজার’, ‘বিলাপের ভাষা।

সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় 

সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় সত্তরের এক প্রচারবিমুখ কবি। বেশী লেখেননি। লিখতে চান নি বলেই বােধ হয়। তাই কবিতার শব্দ, রূপকল্প ও ভাবনা অতাে বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিমার্জিত হতে পেরেছে। পত্রপত্রিকায় লিখেছেন। কবিতার বই আছে। কবিতাগুলিতে সময়ের এবং সময়ােত্তর উত্তীর্ণতার ছাপ বিদ্যমান।

সন্দীপ দত্ত   (১৯৫৩)

সন্দীপ দত্ত সত্তর দশকে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। দশটি বছরের মধ্যে মাঝামাঝি সময় থেকে লেখা প্রকাশিত হওয়ায় তার কবিতার সংখ্যা অল্প।

প্রথম কবিতার বই ‘কোলাজ প্রকাশিত হয় ১৯৭৪-তে। তার ভাবনার বৈচিত্র্য ও সমন্বয় কবিতাগুলির মধ্যে বিধত হয়েছে। দেহজ প্রেমের প্রতি তার আসক্তির খর্য হয়ত বা সমাজবাস্তবতার সূত্রেই এসেছে।

যার ফলে তিনি অনায়াসে বলতে পারেন –‘আবরণ খুলে ফেল | তােমার নগ্ন নান্দনিক ভুবনে মিশে যাই একবার’। ‘নগ্ন’ অথচ নান্দনিক। এখানেই তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে তার ভাবনা। তিনি সত্তরে উল্লেখ্য কোনাে স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেনি।

সমীর দে রায়   (১৯৫৪)

কাব্যগ্রন্থ—‘স্থির চিত্র।

স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়   (১৯৫৪)

স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায় সত্তর দশকের কবি মিছিলে এক প্রথম সারির সম্মান। শিল্পের ক্ষেত্রে, কবিতার ক্ষেত্রে তার পরিমার্জিত ধীশক্তি প্রশংসার অপেক্ষা রাখে। আলােচিত দশকের পত্রপত্রিকায় বহু কবিতা প্রকাশ পেয়েছে।

কনটেন্ট ও ফর্মের দিক থেকে তার অনন্যতা সম্পর্কে সংশয়ের অবকাশ থাকে না। কাব্যগ্রন্থ-এ মাসের ফসল’, ‘সত্যবদ্ধ উচ্চারণ” (চৈত্র ৮২), ‘এ অরণ্য এই নির্জনে, ‘নিজের বিরুদ্ধে প্রতিদিন।

সুভদ্রা ভট্টাচার্য   (১৯৫৪)

কাব্যগ্রন্থ—‘প্রার্থিত পৃথিবী’, ‘নিরাময় শীত।

স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়    (১৯৫৫)

সত্তরের বাংলা কবিতার এক নিপুণ তীরন্দাজ স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়। কবিতার বই–‘আদিবাসী গ্রামের মাদল (অক্টোবর ৭৭), ‘প্রেমে প্রতিবাদে’ (বৈশাখ, ১৩৮৯)। রূপনির্মিতির । ক্ষেত্রে তার লেখনী ঋজু এবং প্রাঞ্জল। তার হৃদয় জুড়ে সংক্রামক ব্যাধি’ যা ‘টোটকা চিকিৎসায় সারে না কখনাে।

সুতরাং চাই প্রখর প্রতিবিধান। স্পষ্ট রােদ্দর চাই’। পিপাসার তুমুল প্রার্থনা তার আকণ্ঠ। সমাজ অন্বিষ্ট দায়িত্ববােধ থেকে পলায়নী মনােবৃত্তি তার নেই। এই সততাতেই তাকে চেনা যায়, চেনা যাবে।

সুজিত সরকার   (১৯৫৫)

সত্তরের শেষদিকে লিখতে শুরু করেছেন সুজিত সরকার। প্রথম কবিতার বই—‘ধরে রাখতে চাই’ (১৯৮১)। সাম্প্রতিক কবিতার বই ‘বড়াে আকাশের নীচে’ (জানুয়ারী ৮৭)।

সময় সঙ্কট পৃথিবীর অসুস্থতায় কবির রক্তে সুন্দরের জন্য প্রার্থনার অনুরণন শৈল্পিক দায়িত্ববােধ থেকেই আসে। সুজিতের পৃথিবীতে তাই ‘সুন্দর মরে না।

সুনীল আকাশের নীচে যে ঘৃণা, যে অপমান, যে বেদনা ছড়িয়ে আছে ধীরে ধীরে কবি সে সব অতিক্রম করে শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হতে চান। তঁার বিশ্বাস –‘সুন্দর মরে না থাকে, থেকে যায় চিরদিন। জীবনকে গভীর করে চেনার রােমান্টিক সৌন্দর্যবােধ সুজিতের কবিম’ত্রায় একটা সাফল্যের স্বাদ এনে দিয়েছে।

সুব্রত সরকার   (১৯৫৬)।

সত্তরের এক বিশেষ কবিপ্রতিম সুব্রত সরকার নিজস্ব কৃতিত্বে একটা স্থান তৈরী করে গেছেন। কবিতার বই–‘দেবদারু কলােনী, ‘তােমাদের খুব ভালােবেসেছি’, ‘গতজন্মের ঋতু।

সমসাময়িক সমস্যা সমাজ সপক্ত নানা ভাবনা তাঁকে আলােড়িত ও আন্দোলিত করে । অতি সাধারণ ছবি চিত্রকল্প রচনার সৌকর্ষে অসাধারণ হয়ে উঠেছে।

যেমন –‘শুধু সকাল ও বিকেল এই দুই ভাইবােন, রাত্রি-মা আর দুপুর মামার জন্যই সে বেঁচে আছে, অথবা আজ আড়াই প্রহরের বােকা বোকা পূর্ণিমায় সারা বাড়ীটিই ভিজে ভাত, যেন অতখানি আলুলায়িত    চাঁদ  স্বয়ং লুটিয়ে পড়েছেন।

সুবােধ সরকার   (১৯৫৭)।

সত্তরের শেষ সময়ে লেখা শুরু করেছেন সুবােধ সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কবিতার বই—ঋক মেষ কথায় পরিশীলিত বােধের পরিচয় মেলে। হরিপদ দে। (১৯৪১) | অপেক্ষাকৃত বয়স্ক কবি হরিপদ দে-র কবিতাচর্চার প্রকৃত সময়টি সত্তর। কম লিখেছেন। তবে মনে রাখার মতাে কিছু রেখে গেছেন। কবিতার বই—“অরণ্য অন্তরীণ’ । হিমাংশু জানা। (১৯৪৫) সত্তরের কবি হিমাংশু জানা কথিত সময়ের লিটল ম্যাগাজিনে একটা দাগ রেখে গেছেন। কবিতার বই—‘প্রতিশ্রুত নই’ (ডিসেম্বর ’৭৮)।

হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৫৮)

আলােচিত সময়ের এক কনিষ্ট কবি হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশ্রুতির ছাপ রেখেছেন। কাব্যগ্রন্থ।

‘নশ্বর অলীক যাতায়াত’, ‘অসমাপ্ত রূপে। সংযােজন।

অশােক মুখােপাধ্যায়।

কাব্যগ্রন্থ –‘লণ্ডীর শো-কেসে জনৈক কবি। আরতি দত্ত (১৯৪৮)। সত্তরের এক পরিচিত কবি। কবিতাগ্রন্থ—‘কলকাতার কৃষ্ণচূড়া (অক্টোবর ‘৮০) ‘পাড় ভাঙ্গা নদী’ (বৈশাখ ১৩৮১)। আবদুর রহমান। কবিতার বই –‘দুরন্ত তমসা পোহায়। উথানপদ বিজলী। কবিতাগ্রন্থ—“নগর প্রান্তর বনস্থালী। উদয়ন ভট্টাচার্য। কবিতাগ্রন্থ –‘উদাসীন পাহাড় ও পাখীগুলি’ । কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়। কাব্য গ্রন্থ “সময় দুঃসময় ।

বিপুল চক্রবর্তী।

সত্তরের তরুণ বিপুল চক্রবর্তী কবিতার বই—“তােমার মারের। পালা শেষ হলে’ (মে ১৯৮০)। উচ্ছল সমাজে প্রতিরােধী সত্তায় তিনি শিল্পের কাছে দায়বদ্ধ। বাচনভঙ্গীর মধ্যে দুর্বোধ্যতা নেই ‘ মবিনুল হক। কাব্যগ্রন্থ—“মােহন বাঁশী।

 

—শেষ–

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: