সত্তা // ইন্দ্রানী দলপতি 

321

(একান্তে নিজের সাথে সময় কাটালে কিছু এলোমেলো ভাবনা পেয়ে বসে আমাদের, অবচেতনের ভাবনাগুলো অবকাশ পেলেই চেতনে এসে নানা প্রশ্ন, আত্ম-দ্বন্দ্ব-কে খুঁচিয়ে দেয়, হন্যে হয়ে উওর খুঁজে বেড়ায়, নানা তর্ক-বিতর্ক পার করে অবশেষে সে তার পরিচিতি খুঁজে পায়, দলছুট হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ব্রতী হয়..) 

সামনেটা বড্ড ঝাপসা, আয়নার কাঁচটা ভিজে কাপড় দিয়ে মুছলে ঠিক এরকমই ঝাপসা হয়ে থাকে, কুয়াশা ঠেলে তবু এগিয়ে চললাম, পাহাড়ি পথ, আঁকাবাঁকা সরু সরু রাস্তা, তবু বিপরীতমুখী গাড়িদুটোর মধ্যে কি সুন্দর সমঝোতা! আমাকে পিছনে ফেলে যে গাড়িটা এগিয়ে গেল, ধীরে ধীরে তার পিছনের লাল আলোটাও ক্রমশ সাদাটে হয়ে গেল, আর হর্ণের শব্দটাও সরু হতে হতে ক্রমশ মিলিয়ে গেল, মাঝে এক যোজন কুয়াশার ব্যবধান! 

পাহাড়ি পথ হাঁটতে ক্লান্ত লাগে না, বরং পথের দুপাশে একটা একটা করে বোঝা নামাতে নামাতে এগিয়ে চলি, যত উপরে উঠতে থাকি বুকের ভিতরটা তত হালকা হতে থাকে, বড় আরাম হয়! ধীরে ধীরে মনেস্ট্রিতে এসে পৌঁছালাম, অদ্ভুত প্রশান্তি লাগে এখানে, এখানকার বাতাসে শান্তি-সুবাস মাখানো থাকে, আমার অন্তত এটাই মনে হয়, সেই সুবাসে নিজেকে ভরপুর ডুবিয়ে রেখে যখন বাইরে বেরিয়ে এলাম দুজন পাহাড়িয়া ক্ষুদের দেখা পেলাম, হঠাৎ করেই টের পেলাম ভেতরে ভেতরে এখনো কিছু সম্ভাবনা সুপ্ত হয়ে আছে, উপযুক্ত আবহাওয়া পেলেই অঙ্কুরিত হবে সেটি… 

আমরা আসলে নিজেদের ঠিক কতটা জানি, কতটুকু চিনতে চাই, যুগটা এখন নোটস্ জেরক্স করতে করতে বেলাইন করে গুঁতো মেরে ছুটে চলছে, একটু ভারসাম্য এদিক-ওদিক হলেই ল্যাং মেরে ফেলে দিচ্ছে, আর বডি যদি ফ্লেক্সিবল্ না হয়, তাহলে পুনরায় কেঁচে গন্ডূষ! ভাল করে দু-দন্ড শ্বাস নেওয়ার উপায় নেই, তাই বিকল্প ইনহেলার… মজার ব্যাপার হলো, প্রেসার কুকারেরও একটা সেফটি ভালভ্ থাকে! মহাপুরুষেরা তো অনেক আগেই বলে গেছেন, একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে আরও অনেক পথ খুলে যায়, খাঁটি কথা ! 

বিকেলটা হলদে বিবর্ণ হয়ে এসেছে, ঐ যে দূরে ঝোপের নীচে যে গাঢ় অন্ধকারেরা এসে জমা হয়েছে, আর কিছুক্ষন পরেই ওরা বেরিয়ে এসে চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে, নদীটা এখন ঝিমিয়ে পড়েছে, তার সমস্ত ক্লান্তি পাথরগুলোর গায়ে ধাক্কা খেয়ে অবসন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, নুইয়ে পড়ছে ক্রমশ, সূর্যটা একটু একটু করে লুকিয়ে পড়ছে পাহাড়ের আড়ালে, ধীরে ধীরে, দেখে বোঝা যাচ্ছে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই, কিন্তু সময় নিয়ে অত্যন্ত সচেতন! কি করে এত স্পষ্ট সময় জ্ঞান তৈরী হয়েছে ওদের?

শুধু তাই নয়, স্থান-কাল সম্পর্কেও অত্যন্ত সচেতন! এই নদীর পাড় থেকে বাংলোটাতে পৌঁছাতে বেশ খানিকটা সময় লাগে, তবে এই পাথুরে পথে চলতে চলতে সেটা গা সয়ে যায়… যতই মাল্টিটাস্কার হও না কেন, তাড়াহুড়ো আর উপভোগ-জীবনে এই দুটোর মাঝে বোঝাপড়া করাটা একেবারেই প্রায় অসম্ভব ! 

ভোররাতের দিকে ঘুমটা আচমকাই ভেঙে গেল, ঘোরটা কাটতে বুঝলাম জানলায় ঝোড়ো হাওয়ারা বারি মারছে, অগত্যা সাড়া দিতেই হল, জানলাটা একটু ফাঁক করতেই ঠান্ডা বাতাসের স্রোত ঘরে প্রবেশ করল, অভ্যাসবশত হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে ধরতে চাইলাম, কিন্তু পারলাম না, সমানে আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে গলে বেরিয়ে যাচ্ছে! আমরা আমাদের ভালো লাগার, ভালোবাসার জিনিসগুলোকে সবসময় বড্ড আঁকড়ে ধরতে চাই, ছুঁতে পারি কী ঠিক করে? জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় ফিরে এলাম, চেয়ে রইলাম আবছায়া জানলার কাঁচের দিকে যেখানে বৃষ্টি রূপকথা এঁকে যাচ্ছে ক্রমশ… 

গতকাল সকালে পাহাড়ের উপরে উঠতে যতটা বেগ পেতে হয়েছিল, আজ নামতে গিয়ে তার সিকিভাগ মাত্র পরিশ্রম করতে হচ্ছে, ফিরে আসার আগে আরো একবার নদীটার ধারে গিয়েছিলাম, বলে এলাম-পরজন্মে তোমার মত দুঃসাহসী হব, পাহাড়ের বুক চিড়ে জলপ্রপাত হয়ে ঝাপিয়ে পড়বো নীচে, ক্ষয় করবো যত্রতত্র, সৃষ্টিও করবো সযত্নে, শেষবেলায় মোহনায় মিশে পরিপূর্ণতা লাভ করব, নদী, আমি তুমি হব! 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *