সাজু   

ফরহাদ হোসেন

-‘কাল স্কুল আছে।বাবা যদি জানতে পারে স্কুল ফাঁকি দিয়ে খেলতে গেছি!তাহলে আস্ত রাখবে না।‘

সাজু সুমনকে এই বলে সিদ্ধান্তে আসে সে খেলতে যাবে না।সাজু ক্রিকেট পাগল।এই ক্রিকেটের জন্যই বাবার কাছে কতবার যে মার খেয়েছে তার হিসেব নেই।সামনে মাধ্যমিক পরিক্ষা বাবার রাগ করা স্বাভাবিক।

সাজু মনে মনে ঠিক করে নেয়,পরিক্ষার আগে দু মাস আর খেলবে না।খেলা-টেলা যা হবে পরিক্ষা পর।

স্কুল যায় আসে।পড়া শুনায় মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করে।কিন্তু বিকেল বেলা কেন জানি ঘরে মন থাকে না!

দু মাস অতিক্রান্ত।পরিক্ষা শুরু হল এবং শেষও হল।এবার সাজুর খেলার পালা।সারা দিন ক্রিকেট আর ক্রিকেট।কেউ মানা করার নেই।সাজু ভাবে এমন ভাবেই যদি দিন কাটে কত ভালো হয়।…….

চলে আসে রেজাল্টের দিন।উৎকণ্ঠায় পেটের ব‍্যথা শুরু হয় সাজুর।পাশ করে সাজু।বাবা রেজাল্ট হাতে নিয়ে বলে-

-‘ভালো করে পড়লে ৮০ শতাংশ পেতি।খেলে খেলে আর পেলি না।‘

-‘৭২ শতাংশ কি কম বাবা?’

-‘খারাপ না আবার ভালোও না।আচ্ছা তুই কি শচীন,সৌরভ হবি?এত যে খেলিস কি লাভ হয় শুনি?এবার তো মন দিয়ে পড়।‘

আবার স্কুল শুরু হয়।নূতন ছাত্র-ছাত্রী আসে অন্য স্কুলে থেকে।নূতন বন্ধু বান্ধবী হয়।একাদশ শ্রেনীতে উঠে সাজু নিজেকে বড় বড় ভাবতে লাগলো।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা গজানো গোঁফ প্রতিদিন কতটুকু বাড়ছে তা লক্ষ করে।চুল গ্রামের সেলুনে না ছেঁটে শহরের নামি সেলুনে থেকে ছেঁটে বাড়ি আসে।

-এটা কি করেছিস?

কানের দু পাসে চুল নেই।মাথার মাঝখানের চুল ছাঁটা হয়নি।

-‘নুতন ইস্টাল।‘

বাবা রেগে গিয়ে বলে-‘মাথা ন‍্যাড়া করে আয়।না হলে তোর খাওয়া দাওয়া বন্ধ‌।’সাজুর মা অনেক বুঝিয়ে বাবাকে শান্ত করে।সাজুও মনে মনে ভাবে এমন বিচ্ছিরি ভাবে চুল না ছাঁটলেই হত।

হঠাৎ কি হয় কেউ জানে না।জীবন নৌকা বেয়ে চলে আপন কিনারায়।

রুনাই সাজুর স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী।আগে সাজু রুনাইকে দেখে আনায়াসে অতিক্রম করে যেত কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে আপভাব অন্য রকম। নানা কৌশলে কথা বলার চেষ্টা করছে।একদিনো স্কুল ফাঁকি দেয় না।বাবা ভীষণ খুশি।বাবা মা দুজনেই ভাবে ছেলে এবার মনযোগী হচ্ছে।

-‘ছেলেটা মনে হয় এবার মানুষ হবে।স্কুল ফাঁকি দেয়না।‘

-‘বড় হচ্ছে না।বুঝতে পারছে পড়াশোনার কি মূল্য?’

সাজু ১০ টার সময় প্রতিদিন স্কুলে যায়।রুনাইয়ের আসার রাস্তায় বন্ধুদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।রুনাইকে কথা বলার সাহস পায়না।রুনাই আভাসে-ইঙ্গিতে অনুমান করতে পারে সাজু তার জন্যেই দাঁড়িয়ে থাকে।রুনাই প্রথমে গুরুত্ব দিত না।কিন্তু ধিরে ধিরে রুনাইও সাজুকে দেখে হাসা হাসি করার ফলে সাজুর মনে জন্ম নিলো অনেক কৌতুহলী প্রশ্ন।

সাজু স্কুলে বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় রুনাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলে রুনাই লজ্জায় ক্লাসরুমে দৌড়ে চলে যায়।সাজুর এক পাকা বন্ধু চিৎকার করে বলে উঠে-‘তোর দ্বারা হবে না বুঝলি।‘

সাজু লজ্জায় লাল হয়ে যায়।পরের দিন স্কুলে সাজু-রুনাইয়ের মুখোমুখি দেখা।সাজুই এবার সাহস করেই কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে-

-জান তো মনে হয়,আমার নাম সাজু।

-কি করে জানবো?সাজু…এটা আবার কেমন নাম!

লজ্জা পেলেও হেসে হেসেই বলে

-সাজতে ভালোবাসি,তাই মনে হয় সাজু।এমনি তো মুফতী মোহম্মদ ইসমাইল।

-ন‍্যাকামো-ও-ও।

-কিসের ন‍্যাকা?

-বোকা!আমার সময় নেই,গেলাম।

সাজু নিরাশ হয়ে ক্লাসে ফিরে আসে।সর্বক্ষণ বন্ধুদের নিয়ে দশম ক্লাসের আসে পাসেই ঘোরাঘুরি করে।রুনাইও দরজা দিয়ে চুপিচুপি সাজুকে লক্ষ্য করে।

এই ভাবে কৌশর বয়সের কোন এক টানে জড়িয়ে পরে দুটি ছোট্ট হৃদয়।শুরু হয় কাল্পনিক পথ চলা।

স্কুল দু তিন দিন কোন কারণে রুনাই আসতে পারে না।উৎকণ্ঠা ভরে যায় সাজুর হৃদয়।সাইকেল নিয়ে চলে যায় রুনাইয়ের গ্রামে।দেখা হয় না কিন্তু সেই পাড়ায় গিয়ে শান্তি খুজে পায় সাজু।এভাবেই চলতে লাগলো দিন।দুজন দুজনকে স্কুলে,টিউশন যাওয়া পথে কথা বলে।মানুষ দেখলে লুকোয়।এ যেন এক রোমান্সকর খেলা!সাজুর মনের মধ্যে উৎসাহ কমতি নেই।

একদিন সাজু সাইকেল নিয়ে রুনাইয়ের সঙ্গেই যাচ্ছে।

-‘জান,রুনাই তোমার নাম আমি প্রথম দেখেছিলাম স্কুলের দক্ষিণ দিকের কাঁঠাল গাছের পেটে।কে জানি লিখে রেখেছিল রুনাই খুব ভালো মেয়ে?আমার না মনে হয় তোমাকে আরো কেউ ভালোবাসে!‘

-‘না গো না!ওটা আমিই লিখেছিলাম।আর একটা কথা রুনাই নামে দাদুই শুধু ডাকে।স্কুলে প্লাবনী নামটা আছে।ওটাই আসল নাম।’

-‘ওহ,জানতাম না।আজ থেকে প্লাবনী বলে ডাকবো।’

-‘রুনাই নামটাই আমার বেশি প্রিয়।ওই নামেতেই ডেকো।আচ্ছা তুমি এখন বাড়ি যাও।আমার বাড়ি কাছেই।’

-‘আরেকটু যাই।’

-‘আমাদের বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি?’

-হা,সে তো আছে…

-এসো না!বাবার যা রাগ!

হাসতে হাসতে রুনাই জানায়-‘বাবার রাগ নেই।ইয়ার্কি করলাম।বাবা খুব শান্ত।’সাজু বলে-‘বাড়ি গেলে কি খেতে দেবে?’

-‘(হুম-অ-অ)খেতে দেব………….

রুনাই দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দাদাকে।সাজু সাইকেল ঘুরিয়ে বাড়ি মুখো হয়।রুনাই জোরে সাইকেল চালিয়ে দাদাকে অতিক্রম করে বাড়ি চলে আসে।

এই ভাবে চলতে থাকে দিন।……হঠাৎ রুনাই-সাজুর স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়।রুনাইয়ের দাদা বুঝতে পারে রুনাই সাজুর সাথে কথা বলে।রুনাইকে শাষন করা হয়।সাজুকে দেওয়া হয় ধমক;এই বয়স পড়াশুনার,জীবনে বড় হওয়ার প্রধান সময় এই সব জ্ঞান শুনতে হয়।

অবুঝের প্রেমের ফুল ফুটেছে ঝরতে কতক্ষণ।হঠাৎ,ঝড়ে বেসামাল হতে লাগেনি বেশিক্ষণ।

মিষ্টি প্রেমের কথা,অবসানে বিরহ গাঁথা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *