সুন্দর অসুন্দরের মাঝে মানব

সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

অনেকেই বলেন আমার লেখাগুলোর মধ্যে বাস্তবতা
থাকলেও সুর ও প্রেমের অভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রেম
ছাড়া সাহিত্য হয় না, জীবনও তেমনি রসোত্তীর্ণ হয়না- এই যুক্তি তাদের।
আসলে থেমে থাকার পর আবার শুরু তো।এখন প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সে প্রেম একটু প্রৌঢ়ত্ব পায়। তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা,দুর্দমতা বা ভাবলেশহীন উদাসীনতা নেই সেখানে। তবুও চেষ্টা করি রসোত্তীর্ণ করার।
আমার লেখা সমাজের কঠিন দেয়ালে আঘাত করুক,ক্ষুদ্র স্বার্থ – পরতা ভেঙে মনুষ্যত্বের বিস্তীর্ণ ভূমি কর্ষণ করুক,ক্ষণিক উদ্দীপনা ভেঙে পবিত্র ভাব জাগ্রত করুক ,চিত্তের প্রসার ঘটুক, জ্ঞান সঞ্চয় করুক, হৃদয়ে হৃদয়ে প্রেমালিঙ্গন ঘটুক, অবসাদ নয় উদ্দীপনা জাগুক, বাকচাতুর্য নয় মাধুর্যতায় ভরে তুলুক আপন আপন কর্ম— এটাই কাম্য।
তাই আমার লেখায় বঞ্চনার ইতিবৃত্ত থাকলেও বঞ্চিত করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
পাঠক পাঠিকারা অশান্ত বা অধৈর্য না হয়ে শুধু আপনার স্বভাবের খানিক সময় ব্যয় করে একবার পড়ে দেখুন- জ্ঞান দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, জ্ঞাতার্থ করাই আমার আসল উদ্দেশ্য।
চব্বিশ ঘন্টা অর্থাৎ একটা গোটা দিন রাতের মধ্যে একজন মানুষ ছ’ঘণ্টা ঘুমের অধিকারী।মানে চার ভাগের একভাগ বিশ্রাম। বাকি টা কর্মমুখর থাকতে হবে।
— এটাই বিধি, এটাই জাগতিক নিয়ম। কিন্তু এর ব্যতিক্রমটাই বেশি চোখে পড়ে।
বিরামহীন কর্ম না করে বিচ্ছিন্ন আলস্যে বিলাসিতায় যৌবন নষ্ট করলে আখেরে কর্মময় জগতে বাকি কাজ করার জন্য যে সময়টুকু অবশিষ্ট থাকবে তাতে প্রেম থাকবে না। কাজের জন্য বিতৃষ্ণা জন্ম নেবে ঐ প্রৌঢ়ত্বেরই মতো।
প্রেমের অভিজ্ঞতা থাকলেও উচ্ছ্বাস হারিয়ে যাবে। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে পরমেশ্বর প্রতিটা প্রাণীর মধ্যেই কর্ম নির্দিষ্ট করে পাঠিয়েছেন। সেখানে একজন ব্যক্তি যদি তার নির্দিষ্ট কর্ম ফেলে ঘুমিয়ে কাটায় তাহলে জীবনের বাকি সময়টা তাকে নিদ্রাহীন ভাবেই কাটাতে হবে। কোন ডাক্তার ই ওষুধ দিয়ে রোগ সারাতে পারবে না। অতএব কর্ম করে যেতে হবে প্রেমাস্পদের মধ্যে দিয়ে।
কর্মহীন প্রাণী আর জড়বস্তু এক।
গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিশ্বরূপ দেখিয়ে অর্জুনকে নিরস্ত করতে চাননি, সন্ন্যাসী হতে শেখাননি, আলস্যে দিন কাটাতে পরামর্শ দেননি, কর্ম করতে উৎসাহিত করেছেন। তাই দ্বাপরযুগ হলো কর্মের যুগ।গীতার কর্মযোগের এক যোগ।
ত্রেতায় যেমন ভক্তি যোগের প্রাবল্য।দশানন রাবন স্বয়ং
শিব আরাধনায় মগ্ন। মেঘনাদ নিকূম্ভিলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞে রত। রাজা দশরথ বশিষ্ঠের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন। লোকচোক্ষে রাবণ সীতাকে অপহরণ করে সীতার সতীত্ব নষ্ট করতে চেয়েছেন মনে হলেও আসলে তিনি রামচন্দ্রের আরাধনায় সীতাকে বন্দীশালায় মাতৃ জ্ঞানে পূজা করেছেন যেমন পারাপারের মাঝিকে না পেলে নৌকায় আঘাত করা হয়।
আর তা যদি না হোত তাহলে স্বয়ং রামচন্দ্র অকাল বোধনের সময় পুরোহিতের সন্ধানে রাবণকেই পৌরহিত্যে বরণ করেছিলেন কেন? আর রাবণ নিজের বিপক্ষে সেই পূজার আয়োজন জেনেও রামেরই মঙ্গল কামনা করে নিজেকেই হোমাগ্নিতে আহুতি দিতে চেয়েছিলেন কেন? আসলে সেটা ভক্তিযোগের যুগ।
আবার সত্যযুগে লক্ষ্য করা গেছে বৈরাগ্য। কেউ কারোর
নয়, আমি বা আমার প্রাবল্য নেই।—সবকিছু ঈশ্বরময়।
নিষ্পাপ কর্ম যার প্রধান ও শ্রেষ্ঠ ধাপ।সব কিছুতেই বিরাগ বা অনুরক্ত নয় অথচ ঈশ্বরানুরক্ত সকলেই। সেজন্যই ভক্ত প্রহ্লাদের অল্প বয়সেও পাষাণের মধ্যেও নৃসিংহমূর্তিতে ভগবানকে লক্ষ্য করেছেন।
আর আমরা যে যুগে এখন বাস করছি- এযুগ আরও উদার আরও প্রেমময়।এ হোল প্রেমের যুগ। ভগবান শ্রীচৈতন্য, ঠাকুর রামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ সকলেই অকাতরে প্রেম বিলিয়েছেন। সকলেই জাতপাত নির্বিশেষে প্রেম নিবেদন করেছেন প্রত্যেকের প্রাণে।
   সত্য-ত্রেতা- দ্বাপর আসলে- প্রত্যুষ, দিবা, মধ্যাহ্ন কেটে গেছে। আমরা রয়েছি রাত্রি কালীন অবস্থায়। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই বনের পশু পাখি যেমন তাদের আস্তানায় ফেরে তেমনি মানুষও নিজ নিজ ঘরে ফিরেছে।আপন আপন পুত্র কন্যা পরিবার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব নিয়ে প্রেমালাপে মত্ত- দোর বন্ধ, জানালাও বন্ধ।দোষ কোথায়? সারাদিন খাটুনির পরে রাতের বিশ্রাম যেমন। দ্বারে কর্ম করার পর একটুখানি আরাম।
তাই যাঁরা ‘” ত্রাহি ত্রাহি” বলে চিৎকার করছেন তাদের মনে রাখা প্রয়োজন এখন রাত্রি দ্বিপ্রহর নয়তো বারোটা বেজে পাঁচ— গভীর নিদ্রায় মগ্ন মানব সভ্যতা। অচিরেই আলো ফুটবে। প্রেমের অত্যধিক চাপ কাটিয়ে মানুষ বৈরাগ্য পালন করবে।সত্যযুগের আবির্ভাব হবে।
আবার ভালোবাসা সম্বন্ধেও কিছু উপলব্ধিতে আসা যায়। ভালোবাসা প্রতিটা প্রাণীর মধ্যেই বর্তমান। যদিও অনেকে ভালোবাসার সাথে ভালোলাগাকে গুলিয়ে ফেলেন।বোধকরি ভালো লাগা আর ভালোবাসা এক নয়। একজনের কাছে গ্রীষ্মের সোনালী রোদ সুন্দরের আভিজাত্যে পড়ে ভালো লাগতে পারে কিন্তু তার সাথে ভালো বেসে মাখামাখি করতে সে কিছুতেই চায়না।
এমনোও কথা প্রচলিত আছে যাকে ভালোলাগে তাকে বিয়ে করা চলে না। বিয়ে মানেই কি একজনের একজনকে ভালোবাসা? অবশ্য এ তর্ক এখানে নয়। অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে ।
ধরে নেওয়া যায় নারী পুরুষের ভালোবাসার শেষ পরিনতি হল বিয়ে। আজকাল গ্রামে কিংবা শহরে সর্বত্রই চোখে পড়ছে স্ত্রীরা স্বামী বস্তুটিকে যৎপরোনাস্তি ফরমাস করে নাকে দড়ি দিয়ে গরু গাধা বানিয়ে চাকরের মত‌ খাটিয়ে নিজের আলস্য- বিলাসিতা উপভোগ করেন।
এবং এটাই নাকি তাদের ভালোবাসার নমুনা। আজকাল স্বামী দেবতাকে কিংবা পুত্র কন্যাকে ‘পাগল’ বলেন অনেক স্ত্রীরা।এও একপ্রকার ভালবাসা। ব্যক্তিগুণে ভালোবাসার  রূপ বদল। যেমন একটি গোলাপ ফুলকে  বিভিন্ন মানুষ নানান রকম উপায়ে ভালোবাসে। গোলাপ ফুলটির উপর সেটা অত্যাচার না আশীর্বাদ তা কেবল ঐ ফুলটিই জানে। প্রকৃতির দরবারে হয়তো নালিশও জানায়।
তবু কেউ গাছ থেকে ফুলটি ছিঁড়ে অতি সযত্নে দেবালয়ে দেবতার চরণে করেন নিবেদন, কেউবা ফুলের সৌরভের মাতাল হয়ে বারবার নিজের নাকের কাছে এনে গন্ধ শুঁকতে থাকেন, কেউ ফুলটির পাপড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে বাড়ি ফেরেন, কেউ প্রেয়সীর জন্য নিবেদন-আশায় হৃদয়ের মাঝে লুকিয়ে রাখা পছন্দ করেন, আবার কেউ অন্য ফুলের মাঝে মালায় গেঁথে মালার শ্রীবৃদ্ধি চান।
আবার কোনো কবি -মানুষ ফুলের রংয়ে রঙীন হয়ে কাব্য রচনা করে আপন মনে আপ্লুত নয়তো আঘাত প্রাপ্ত হন। সবগুলোই কিন্তু ভালোবাসা। প্রকৃতিও যেন এই ভালবাসার প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে বিচিত্র ফুলের মাঝে গোলাপটিকে ফুটিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করে। সাধারণ মানুষ কোনটাই বুঝতে পারে না। তবু তারা গোলাপকে ভালবাসে।
দ্রৌপদী পঞ্চস্বামীকে ভালবাসলেও অর্জুনের প্রতি বেশি অনুরক্ত ছিলেন।কেন?!! কোনো উত্তর নেই।
ভালোবাসায় আনন্দ।আর এই আনন্দেই পৃথিবী চলমান। ঘৃণায় ধ্বংস। তবু ভালবাসা ও ঘৃণা পরস্পর জড়িত। কেউ ভালবাসে বলেই কেউ ঘৃণা করে। ভালো বাসায় সুন্দর আর ঘৃণায় অসুন্দরের আত্মপ্রকাশ ও কুৎসিত কদর্যতা ফুটে ওঠে।
এত সত্ত্বেও সমাজে ভালবাসা ও ঘৃণার সমান কদর।এর উপলব্ধি দুর্ভেদ্য, রহস্যাবৃত অথচ কঠিন বাস্তব।
ক্ষত্রিয় বর্ষা ঋতুতে ক্ষাত্রধর্মে দীক্ষিত গুরুগুরু মেঘের দামামা, অসংখ্য তীব্র বৃষ্টির তীক্ষ্ণ তীর, দিকবিদিক আলোকিত করা বিদ্যুতের ঝলকানি বর্ষাকে আবাহন নাকি বর্ষার প্রতি ধিক্কার বা ঘৃণার প্রতিফলন! চাতক পাখির ‘ফটিক’জল কি ভালবাসার আস্তরণ নাকি ঘৃণার আর্তনাদ!!? দাদুরীর গ্যাংর গ্যাং কি ভালবাসার আনন্দোল্লাস নাকি ঘৃণার অশনি নিক্ষেপ!!?
– জানতে ইচ্ছে করে—
আবার ঋতুরাজ বসন্তের আবির্ভাব লগ্নে কোকিলের কুহু ডাক শীতের প্রতি ঘৃণায় না বসন্তের প্রতি ভালোবাসায়! নাকি শীতের বার্ধক্যকে আনন্দে ভরিয়ে দিতেই রাগিনীর শেষ রাগ ধ্বনিত করে? শুষ্ক রুক্ষ শীত ভালোবাসায় ডাকে জোরে, নাকি আসার খবর পেয়ে ঘৃণায় মুখ লূকোয়???!
আসলে ভালবাসায় জীবন আর ঘৃণায় মৃত্যু— এটা তর্কাতিত নয়।কেউ ভালবাসলে তবেই অন্যজনে ঘৃণা করে , আবার ঘৃণা আছে বলেই ভালোবাসার এত কদর। এক একটা পরিপূরক যেন- মিল্রণে সম্পূর্ণতা বা পরিপূর্ণতা আনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: