সেন সাম্রাজ্য ও বল্লাল ঢিবি  ?   // সুজন মোদক  //   বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়

1132123
R.C. sir এর অনুপ্রেরনায় এবং নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব বিভাগ ও আঞ্চলিক ব্যক্তিদের  সহযোগিতায় একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস

বাংলার ইতিহাসে পাল বংশের পরে আরও একটি গুরুত্বপৃর্ন সাম্রাজ্য ছিল,তা হল সেন সাম্রাজ্য ।সেন বংশীয় রাজারা আনুমানিক 130 বছর ধরে বাংলায় তাদের হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছিল।সামন্ত সেন এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হলেও বিজয় সেনকেই প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

 

দ্বিতীয় মমহীপালের রাজত্বকালে প্রাচীন বাংলায় সামন্তচক্রের বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে বিজয় সেন নিজ আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল,অবশেষে মদন পালের প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে নিজ স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘঘটানপ্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সেন সাম্রাজ্যের একটি তাতপর্যপূর্ন দিক হল সেন বংশীয় রাজারাই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলায় নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম  হয়েছিল ।এক্ষেথে বলা বাহুল্য যে বল্লালসেনের রাজত্বকালে সেন সাম্রাজ্য সর্বাঙ্গীন সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পেড়েছিল।

 

সেন রাজাদের আদি নিবাস নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে বিতর্ক লক্ষ্য করা যযায়তবে বেশিরভাগ ঐতিহাসিকই  সেন রাজাদের আদি নিবাস কর্নাট অঞ্চল অর্থ্যাৎ বর্তমান মহীশূর ,কর্নাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কানাড়ী ভাষাভাষী অঞ্চলকেই চিহ্নিত করেছেন।

 

এক্ষেথে গুরুত্বপৃর্ণ হল যে বিজয়সেনের দেওপাড়া প্রশস্তি অনুযায়ী চন্দ্রবংশীয় বীরসেন ও তার পরবর্তী রাজাগনের  কোনো এক সন্তান সামন্তসেন বাংলায় সেন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।আবার বল্লাল সেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে বলা হয়েছে যে সামন্তসেনের জন্মের পূর্বেই সেন বংশের কোনো এক পূর্বপুরুষ বাংলায় বসবাস করতেন।পরবরাতীকালে এদের মধ্যে থেকেই সামন্তসেন, সেন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

 

সেন বংশীয় রাজারা ব্রাক্ষ্মণ ছিল না ক্ষত্রীয় ছিল তা নিয়ে দ্বিমত ররয়েছেতবে সামন্তসেন নিজেকে ক্ষত্রিয় বলে দাবি ককরেছেনএক্ষেত্রে প্রযোজ্য আঞ্চলিক জনশ্রুতি অনুযায়ী জানা যায় যে সেন রাজারা ব্রাক্ষ্মণ ছিল। তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন যে ,নবদ্বীপের যে স্থানে সেন সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপটি রয়েছে সেই গ্রামের নাম বামন পুকুর/বামুনপুকুর অর্থ্যাৎ ব্রাক্ষ্মণদের এএলাকাআরএখানে যে সাম্রাজ্যের সংযোগ রয়েছে তা ঐতিহাসিক স্বীকৃত তাই তারা ব্রাক্ষ্মণ ছিল বলেই এই গ্রামের নাম হয়ে উঠেছে বামনপুকুর। তবে সর্বোপরি যে মতটি ঐতিহাসিকদের কাছে অধিকতর গ্রহনযোগ্য তা হল তারা প্রথমে ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন এবং পরে ক্ষত্রিয় হন।

 

নদীয়া জেলার মায়াপুর-বামুনপুকুর গ্রাম পঞ্চায়েত-1 এর অন্তর্গত বামুনপুকুর গ্রামের এক 13,000 বর্গফুট অঞ্চল জুড়ে নয় মিটার উচ্চ প্রাচীরের অভ্যন্তরে সেন সাম্রাজ্যের পুরো কাঠামোটি ধ্বংসাবশেষটি অবস্হিত।ভূগোল ও মানচিত্র অনুযায়ী এই ঢিপির অবস্হান বর্তমান নবদ্বীপের  30ডিগ্রী 27′ উত্তর অক্ষাংশে এবং 88ডিগ্রী 24′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে।এই ধ্বংশাবশেষটিই জনশ্রুতি অনুযায়ী বল্লাল সেনের ঢিবি নামে পরিচিত।তবে কেউ কেউ এটিকে বিজয়সেনের ঢিবিও বলেন আবার কেউ এটিকে বামুনপুকুর দুর্গও বলে।

 

এই ধ্বংসস্তূপ নিয়ে আঞ্চলিক জনমানসে যে কতটা কৌতূহল রয়েছে তা তাদের দ্বিমত বক্তব্য থেকেই বোঝা যায় । তবে কৌতূহল এর থেকেও বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই ঢিবিটার গুরুত্ব অঅনে বেশি তার প্রমাণস্বরুপ এখানে archaeological survey of india -র তত্ত্বাবধানে দু-দুবার খননকার্য চালানো হয়েছে।

 

Archaeological survey of india -র পূর্বাঞ্চলীয় শাখার বিমল বন্দোপাধ্যায় , এ.ঝা, জি.এন.শ্রীবাস্তব,তপনজ্যোতি চক্রবর্তী, এস.কে.ঘোষ,এস.কে.কুন্ডু, কে.শ্রীমনি,পি.সি .দাস এর সহযোগীতাি এন.সি.ঘোষের তত্ত্বাবধানে 1982-83 খ্রীষ্টাব্দ এবং 1988-89খ্রীষ্টাব্দে খননকার্য চালানো হয়। এই খননকার্য ঐতিহাসিকভাবে বাংলার সেন বংশের সাথে এই ঐতিহাসিক স্থানের অস্তিত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে।

 

এই দুই পর্যায়ের খননকার্যের ফলে এখানে পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির মানুষ ও পশু-পাখির মূর্তি,পঞ্খের মূর্তি,অসংখ্য পরিমানে তামার বাসনপত্র,পেরেক,লোহার তৈরী বিভিন্ন জিনিসপত্র । এছাড়াও পাওয়া গিয়েছে একটি বৃত্তাকার পোড়া ইটের লাইন যার শীর্ষে ব্যাস ছিল সত্তর সে:মি:এবং নীচে 50সে:মি:। মনে করা হয় এটি ধর্মীয় কোনো কাজের জন্য অগ্নির সম্মুখীন হয়েছিল।

 

কুমিরের মুখের আকৃতির মত প্রস্তর পাথর ও এই রকম আরও কিছু শৈল্পিক  পাথর উদ্ধার হয়েছে যার একটি এখনও ঢিবিতে রয়েছে ও বাকি গুলি বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিয়ামে রাখা হয়েছে। এছাড়াও আঞ্চলিক জনশ্রুতি অনুযায়ী জানা যায় সাত ফুট লম্বা একটি বাতি,প্রায় তিনশো কিলোগ্রাম ওজনের ব্যাসল্টের তৈরি বিশাল চাকা,এবং মন্দিরের মানচিত্রের সাথে খোদিত একটি অদ্ভূত পাথর।

 

বর্তমানে এই নিদর্শনটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এই ধ্বংসাবশেষটি  সম্পূর্ন পোড়ামাটির ইট দ্বারা নির্মিত এবং চারিদিকে প্রাচীর বেষ্টিত। এই পুরো নিদর্শনটি প্রধানত দুধরনের ইট দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।

 

প্রথম ধরনের ইটের মাষ ছিল লম্বায় দশ ইঞ্চি ও  চওড়ায় পাচ ইঞ্চি এবং দ্বিতীয় ধরনের ইটের মাপ ছিল লম্বায় বারো ইঞ্চি ও চওড়ায় চার ইঞ্চি। এছাড়াও অন্যান্য মাপের ইটও লক্ষ্য করা যায়। তবে বর্তমানে এই নিদর্শনটির সৌন্দর্যায়ন বৃদ্ধিতে বেশ কিছু পরিমাপের ইট দ্বারা সংস্করন করা হয়েছে। মূল নিদর্শনের মধ্য দিয়ে যে রাস্তা রয়েছে সেটি প্রায় 5ফুট চওড়া। মনে  করা হয় এটিই ছিল অন্দরমহলে প্রবেশের পথ।

 

এই নিদর্শনের সিড়ি গুলি বিমানের মত যা আপনাকে একেবারে ঢিবির সর্বোচ্চ উচুতে নিয়ে যাবে। এর বামদিকে কিছু ছোটো ছোটো কাঠামো রয়েছে কিন্তু ডান দিকে অবস্থিত বিশাল কাঠামো। উপরে রয়েছে কুমিরের মুখের আকৃতির মত প্রস্তর পাথর যার মধ্য দিয়ে বাইরে জল বের করা হত বলে মনে করা হয়।

 

তবে  মূল কাঠামোর পাসেই অপেক্ষাকৃত যে ছোটো কাঠামো রয়েছে অতীতের বন্যার সময় মাটি সরে যাওয়ার ফলে নীচের দিকে বিস্তৃত ইটের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়,এ থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায় ঐ অপেক্ষাকৃত ছোটো কাঠামোটিও হইত বড়ো প্রাসাদ ছিল তবে এটি খননকার্যের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়াও এই ঢিবির পাশেই খাল মত রয়েছে মনে করা হত ওখানেই নাকি রাজবংশীয় সদস্যগণ স্নান করত তবে এর কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই জনশ্রুতি মাত্র।

 

কোনো কোনো ঐতিহিসিকদের মতে এই কাঠামো বিজয়নগর প্রাসাদের কিছু ধ্বংশস্থান । এটি দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বিজয়নগর রাজ্যের রাজধানী ছিল অর্থ্যাৎ বিজয়সেনের রাজধানী। কেউ বলেন এটি বল্লাল নিজে স্থাপনা করেন। কেউ কেউ বলেন এটি আগে বৌদ্ধ মঠ ছিল পরে হিন্দু মন্দিরে রুপান্তরিত করা হয়েছে।

 

এক্ষেত্রে বলা যায় বৌদ্ধ মন্দির হলে চৈত্য পাওয়া যেত কিন্তু দু-দুবার খননকার্যের ফলেও কোনো চৈত্য পাওয়া যায়নি সুতরাং এটি বরাবরই হিন্দু মন্দিরই ছিল। এ ব্যপারে বিখ্যাত ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বান্বেষী শান্তিরঞ্জন দেব এর মতে “এটি  বাংলার সর্বকালের সর্ববৃহৎ ,সর্বপ্রাচীন শিব মন্দির ছিল।

 

আবার Archaeological Survey Of India র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে দ্বাদশ শতকে বল্লালসেনের রাজত্বকালে  গড়ে ওঠা একটি শিব মন্দির। তবে মূল কাঠামোই দেওয়ালের সাথে পাচটি স্বতন্ত্র দরজা বিন্যাস রয়েছে এবং উপাসনার সময় অগ্নিশিখার জন্য একটি হোমকুন্ডা স্পষ্ট রয়েছে ।এ থেকে এটিই নির্দশ করে যে মন্দিরের পাচটি প্রান্ত রয়েছে এবং হিন্দুমন্দির স্থাপত্যের পঞরথ শৈলীতে নির্মিত হ্য়েছিল। তাছাড়া সেইসময় সমগ্র ভারতে বেশিরভাগ নির্মিত  মন্দিরই  পঞ্চরথ শৈলীতে নির্মিত হয়েছিল। তাই সর্বোপরি বলাই যাই এটি একটি হিন্দু মন্দিরই ছিল।

এই নিদর্শনটির ধ্বংস কীভাবে হয়েছিল সে ব্যাপারে এতিহাসিকহলও কোশো সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় অর্থ্যাৎ বন্যা বা ভূমিকম্পের ফলেই এর ধ্রংস হয়েছিল। ঐতিহাসিকরাও এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেই ধ্বংসের কারশ হিসাবে আংশিকভাবে মেনে নিযেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: