স্বাধীনতা // ঋত্বিক ভট্টাচার্য,

269
শিশির মারা গেছেন, তা প্রায় তিন বছর হলো। ছেলেরও বিয়ে থা হয়ে গেছে। শিশির থাকতে বছরে একবার বেড়াতে যাওয়া হতোই হতো। এখন ছেলের ইচ্ছে হলে ওই একবার কামারপুকুর বা বেলুড় মঠ। সবসময় বলতেও কি ইচ্ছে করে? একবার সিকিম গেলেও বড্ড কড়া জাতের পাহাড়, এবয়সে হাঁফিয়ে উঠেছিল জয়া। তাছাড়া, ছেলে বৌমার জ্বালায় হাত খুলে খরচ করতে পারছিল না। সবেতেই ওরা বলে, আরে মা, আমরা থাকতে তুমি টাকা কেন দেবে। হতচ্ছাড়াদের মাতৃভক্তির চোটে না গেল ইচ্ছেমতো খরচ করা, না গেল ঠিক যেমন ভেবেছিল, তেমনি করে ঘোরা। দু’পা গেলেই- মা, সাবধানে। মা, বেশি খেয়োনা, গ্যাস হবে।
হুঁ, তাও যদি তোদের বাপের পেনশনটা না পেতাম।
     তাই ভেবেচিন্তে কণাকে ফোনটা করেই ফেলল জয়া।
“হ্যালো, বেনারস যাবি?”
কণা জয়ার বোন। কণারও অখন্ড অবসর। ছেলে বড় হয়ে গেলে যা হয় আরকি। প্রবল দাপটের সঙ্গে সংসার চালানোর পর যেমন মধ্য পঞ্চাশে প্রায় সকলেই দেখেন, কত কি জীবনে হয়ে উঠলনা, সেই দশাই হয়েছে কণার। তাই জয়ার ফোনটা পেয়ে কটা দিন অর্থবহ সময় কাটানোর লোভটা মোটেই ছাড়া গেলনা।
কিন্তু টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা, গাড়ি বুকিং, তার ওপর হিন্দি বলা? খালি উত্তম-সুচিত্রা দেখা, আর হেমন্ত-শ্যামল-সন্ধ্যা-গীতা শোনা মানুষ, এখনো টাচ ফোন জানেনা প্লাস ইংরেজি কষ্ট করে পড়ে ফেললেও, বলা তো অসম্ভব! তা হোক, ছেলেকে বললে টিকিট আর হোটেল হয়েই যাবে।
          মা যাচ্ছে শুনলে যে’কটা শয়তান খুশি হয়, কণার ছেলে তার পয়লা নম্বর। যেমন বাপ, তার তেমন ছেলে। বউ কাছে না থাকলে লোকে রাগ করে। আর বিমল ছিল উল্টো। না চেয়েছে কোনোদিন ভালো একটা রান্না খেতে, না বাপের বাড়ি গেলে ডেকেছে। মহান সাজা খালি ! তেমনি ছেলেটাও হলো। জয়ার ছেলে তো তবু চিন্তাটুকু করে জয়ার জন্যে। আমারটা তো করলোই না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেকে অফিসে ফোন করেন কণা।
           চারদিন বেনারসে থাকতে চায় মা-মাসি। সঙ্গে লখনৌ যাবে। কিন্তু হিন্দিটা ওদের আসেনা বলেই কণাকে লখনৌটা বাদ দিতে বলল ছেলে। শুধু বেনারসেরই যাওয়া আসার টিকিট হলো। বাঙালি হোটেল হলো দশাশ্বমেধ ঘাটের কাছেই।
          জয়া বাইরে বেরোলে একটু দিলদরিয়া। একশ টাকার জিনিসটা দেড়শ টাকা দিতে হলে দেবে, তবু কারোর কথা শুনবে না। কণার আবার একটু সিস্টেমে চলাই পছন্দ। একটা কাগজে লিখে রাখে কিভাবে যাবে, গাড়ি ধরবে, না অটো, কি কি দেখবে এইসব। জয়া আবার একই কথা দু চারজনকে জিজ্ঞেস করবে।
          বেনারসের যেখানে ওরা উঠেছিল, সেই হোটেলের নিয়ম হলো দুপুর আর রাতের খাওয়া ওখানে করতে হবে। কণা তাতেই খুশি। দুবেলা মুখের গোড়ায় মাছ ভাত মিললে ক্ষতি কি। কিন্তু জয়া এই ব্যবস্থায় খুশি নয়। বাইরে ঘুরে খেতে ইচ্ছে তার। তাই হোটেলে বলে একবেলা হোটেলে খাওয়ার ব্যবস্থা করে। নৌকায় দরদাম করলে শেয়ারে একশ টাকায় নিয়ে যায়, কিন্তু ওরা রিজার্ভে ৩০০ টাকায় নৌকা চাপে। এভাবেই দিন চারেক কেটে যায়। প্রয়াগে কুম্ভের মরশুমে স্নান, সারনাথ সহ বেনারস সংলগ্ন অনেক কিছুই দেখা হয়ে যায়।
            কণাকে ওর ছেলে ফোন করে বলেছিল, ফেরার সময় ট্রেনের কোচটা কোনদিকে পড়বে। কণা ছেলেকে চিন্তা করতে বারণ করে। বলে, একান্ত কোচ খুঁজে না পেলে কোনো একটায় উঠে পড়বে ঠিক। তারপর ঠিক নিজের কোচে চলে যাবে।
           জয়া বা কণা কেউই হারিয়ে যায়নি। তাতে অবশ্য জয়ার ছেলে বৌমার চিন্তা কমে যাবেনা। আরো মজা এই যে, এরা বাড়ি ফিরে দুজনেই প্রতিবেশীদের কাছে গল্প করবে, কুন্ডু বা ডলফিন বা ঐরকম কোনো ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে ঘুরে এল। দুজন মহিলা একা ঘুরে এসেছে, শক্তসমর্থ ছেলে থাকতেও – এটাই একটা বড় লজ্জার কথা যেন।
          অথচ স্বামী চলে যাওয়ার প্রাথমিক শোক পার হয়ে যে আর্থিক স্বাধীনতা পাওয়া গেল, তার চেয়েও বড় যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পাওয়া গেল, সেইটা যে এই চারদিনের বেনারস ভ্রমণের প্রাপ্তি, তা এখনো তারা বুঝছে না, বা মানছে না। একটা দিন যে ছিল, যখন নিজের ধারণা ছিলনা, হাওড়া থেকে বেনারস বেশি দূর, না হরিদ্বার; সেই ধারণা হওয়াটাও তো একটা প্রাপ্তি। বয়স্ক এবং হিন্দিতে অস্বচ্ছন্দ হওয়ায় হোটেল থেকে যে ফোন করে জিজ্ঞেস করল, আপনাদের অসুবিধে হচ্ছে কিনা রাস্তায়, সেটাও তো একটা প্রাপ্তি। আর দরদামে হারজিত যাই হোক, মহল্লা থেকে বৌমাদের জন্য দু’দুটো বেনারসী কিনে ফেরা, চাট্টিখানি কথা?
           যখন বয়স বাড়লেই কোমর, হাত পায়ে ব্যাথা বাড়ছে- তখনও নতুন রাজ্য, নতুন মানুষের সঙ্গে আলাপ, ভাষা সমস্যা কাটিয়ে ওঠা, গঙ্গাবক্ষে নৌকা চাপা, রোজকার শাড়ি ছেড়ে কুর্তি পরা, কম কি? কারোর ওপর ভরসা না রেখে, নিজে ঘোরা, আজকের ভাষায় সোলো ট্রাভেলিং- কত যে সুখের জয়া-কণা নিশ্চই বোঝে মনে মনে, স্বীকার করেনা। আরো বারকতক ঘুরে আসুক, হয়তো সংস্কার ঝেড়ে ফেলে গলা উঁচু করেই স্বীকার করবে। ভ্রমণ, তা সে যত ছোটই হোক, ঘরের বাইরে, জেলার বাইরে, রাজ্যের বাইরে- নিজের ইচ্ছেমতো কটা দিন কাটানো কি কম বড় স্বাধীনতা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: