TO MORE READ,TO MORE LEARN

সঞ্জীব ধর

[১]

হেমন্তের পড়ন্ত বিকালবেলা।সুনীল আকাশে সাদা মেঘ।পশ্চিমের আকাশে সূর্যটা হেলে পড়ছে।নদীর বুকে সূর্য রশ্মির প্রতিফলন চোখে ধাঁধাঁ লাগে।পাশেই শশ্মান।মৃদু বাতাসে শশ্মানের ঘাসগুলু নুইয়ে নুইয়ে পড়ছে।পাশের এক কাটা গাছের শিকড়ে বসে আছে এক বালক।শুধু আজ নয় প্রতিদিনই তার সময় কাটে এইভাবে ।

“না;আর পারা গেল না।এবার ছেলেকে নির্বাসন দন্ড দিতেই হবে।একমাত্র ছেলে বলে তো আর প্রতিদিন দু চারটা নালিশ মীমাংসা করা যায় না?”ছেলেকে নিয়ে এমনই ভাবনায় রত এক মায়ের চমক ভাঙে তার স্বামীর ডাকে।

-হ্যাঁগো, শুনছো?ছোট ফোন করেছিল। শ্রাবণকে কাল শহরে নিয়ে যাচ্ছি।

ঘোমটা টা টেনে নিতে নিতে শ্রাবণের মা উত্তর দিল

-তুমি যা ভাল বোঝ

এই বলে তিনি ঘরের ভেতর চলে গেলেন।

সন্ধাবেলা যথারীতি ঘরে ফিরল শ্রাবণ।দুপুরের রৌদ্রের তেজ যেমন সন্ধ্যায় ম্লান গেছে মাতাপুত্রের রাগও তেমনি কমে গেছে।তাই আর বকাবকি হয়নি।তবে পিতার কাছ থেকে শুভসংবাদটি ঠিকই আদায় করে নিয়েছে সে।কাল সকালেই তারা রওনা দিবে।

[২]

শ্রাবণের কাকা কাকী নিসন্তান।তাই তারা চাইতো শ্রাবণ তাদের বাসায় থেকে লেখাপড়া করুক।আজ সেই আশা পূর্ণ হওয়াতে তারা অনেক খুশি।নিসন্তান দম্পতির শুষ্ক হৃদয়ে যেন শ্রাবণের ধারা পড়ল।এই বালকের লেখাপড়া নিয়ে অনেক তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল।অন্যদিকে শ্রাবণের পিতা তাকে কাকার বাসায় রেখে গ্রামে ফিরে গেছে।

অবহেলিত এই গ্রাম্য বালকের শিক্ষাজীবন শুরু হল রাজকীয় ঢঙে।নামকরা স্কুল তার উপর তিন তিনজন প্রাইভেট শিক্ষক নিয়ে শিক্ষার চাকা সজোরে এগিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু গেঁয়ো এই বালকের পক্ষে এত বিদ্যা গলাধকরণ সম্ভব তো?

বইয়ের ভারে নুইয়ে পড়া এই বালকটি শ্রেণিকক্ষে জানালা দিয়ে হয়তো চেয়ে থাকতো একদিকে,আনমনে।স্কুলে ডায়েরীতে প্রায়ই লেখা হতো “ক্লাসে অমনযোগী”,”হোম ওয়ার্ক করে না” আরও কত কি?

কিন্তু তার কাকী হাল ছাড়ে না।নিজে কথা দিয়ে মায়ের কাছ থেকে নিয়ে এসেছে।তাই তাকে মানুষ করতেই হবে।সামনে মিড টার্ম এক্সাম তাই স্যারদের পরামর্শে কোচিং-এ ভর্তি করে দিল শ্রাবণকে।লক্ষ্য এক্সামে অন্তত সিক্সটি পার্সেন্ট নাম্বার পাওয়া।অন্যথায় এ স্কুলে ভর্তি ক্যান্সেল হয়ে যাবে সাফ জানিয়ে দিয়েছে স্কুলের প্রিন্সিপাল।তবে কোচিং সেন্টারে গিয়ে কিছুটা আশস্ত হল তার কাকী।কাকীর কাছে মাতৃ স্নেহে বড় হতে লাগল শ্রাবণ।

[৩]

না;মিডটার্ম এক্সামে আশানূরুপ ফল আসল না।সামনে ফাইনাল এক্সাম।এবার কিছু একটা করতেই হবে থাকে।স্কুল,কোচিং,প্রাইভেট সব জায়গায় একটাই উপদেশ শুধু তার কানে বাজে সবসময়,”TO MORE READ, TO MORE LEARN”

হেমন্তের রাত।গুড়ি গুড়ি শিশিরকণা ঝরছে বাইরে।পড়ার টেবিলে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে শ্রাবণ।একবছর আগে ফেলা আসা দিনগুলি নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে সে।হটাত্‍ তার কাকীর চিত্‍কারে ঘুম ভাঙে তার।

-পড়ছিস তো, শ্রাবণ?

-হ্যা,কাকীমা

-হোমওর্য়াক সব শেষ করেছিস?

-হ্যা

ঘুমভাঙা কণ্ঠে উত্তর দেয় শ্রাবণ।

এরপরের দিনও হোমওর্য়াক না করার অভিযোগ আসে।এবার তার কাকী আর সহ্য করল না।দু’গালে দু চড় মেরে বলল,”আমাকে এত জ্বালাছিস কেন?চলে যা না তোর মা’র কাছে?”

এর পরেরদিন হতে শ্রাবণের উপর ১৪৪ ধার জারি হল।

[৪]

ফাইনাল এক্সাম শুরু হয়ে গেছে।ভীষণ জ্বর নিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে শ্রাবণ।তার উদ্যমতার কাছে যেন রোগও হার মেনেছে।কাকীর বকুনি খাওয়ার পর দিন থেকে তার মধ্যে বড় ধরণের এক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।তার কাকীরও যে তার পরিবর্তনের জন্য গর্ববোধ হচ্ছে তাই নিয়ে সন্দেহ নেই।কিন্তু দিনের পর দিন অসুখ বেড়েই চলছিল।তবু লেখাপড়া চলল ঠিকই।হয়তো কোন এক কঠিন প্রতিজ্ঞাই করেছিল সে।

জ্বর ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে।কিন্তু শেষ পরীক্ষাটা দিতেই হয় তাই কাকীর কোলে বসেই পরীক্ষা দিল।কিন্তু বাসায় ফিরা হল না আর।

ইতিমধ্যে শ্রাবণের বাবা মা ও হাসপাতালে পৌঁছেছে।চারজন ব্যক্তিই শ্রাবণের শিয়রে নিস্তব্ধভাবে বসে আছে।রাত গড়িয়ে যায়।হেমন্তের শুক্ল পক্ষের নবমীর চাঁদ ধীরে ধীরে হেলে পড়েছে।এই হয়তো শ্রাবণের শেষরাত।শ্রাবণ শুধু ইলশেগুড়ির মত মাঝে মাঝে প্রলাপ বকে যাচ্ছে.”TO MORE READ TO MORE LEARN”

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *